২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অনন্য প্রযোজনা অঙ্গীকারের ‘একতারা’

সাজু আহমেদ ॥ শিল্পের জন্য শিল্প নয়। শিল্পীর জন্যও শিল্প নয়। শিল্প সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভোক্তা বা দর্শক শ্রোতার ভাবানুভূতিকে সক্রিয় করা। যার মাধ্যমে ভোক্তার সুক্ষ্ম মানবিক বোধগুলো জেগে ওঠে সামাজিক বাস্তবতায় সচেতন করে তোলে। শিল্প সৃষ্টি বা তার নান্দনিকতার বহিপ্রকাশ ভোক্তার অভিব্যক্তিতে ফুটে ওঠে। শিল্পের অন্যতম সমৃদ্ধ মাধ্যম নাটক বিশেষ করে মঞ্চনাটক। কারণ এখানে তুলে ধরা হয় সমাজ সচেতনতায় অন্যতম শিল্পরূপ। দেশের সাম্প্রতিক সময়ে তারুণ্যনির্ভর নাট্যদলগুলো তাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রযোজনার মাধ্যম শিল্পের নান্দনিক রূপ তুলে ধরে সমাজের চলমান সমকালীন চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করে। এমনি একটি তারুণ্য নির্ভর নাট্যদল অঙ্গীকার। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত এ দল ইতোমধ্যে একাধিক প্রযোজনা মঞ্চে এনেছে। দলের কর্মী এবং উজ্জীবিত সদস্যরা তারুণ্যের মেধার প্রতিদান দেয়া চেষ্টা করে যাচ্ছে। দলের বেশ কয়েকটি প্রযোজনার আঙ্গিক ও শিল্পমান এমনকি অভিনয় নিয়ে তাদের নীরিক্ষা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ‘কন্যাপন’, ‘গ্যালিভরের সফর’, কিংবা ‘টিউমার’ নামের নাটকগুলোতে দর্শকদের প্রত্যাশা অনুযায়ি গল্পের ছলে হাস্যরস ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে দলের নাট্য প্রযোজনার মান প্রত্যাশা অনুযায়ী দর্শকদের টানতে পারেনি। সম্ভাবনাময় এই দলের সৃষ্টিশীল কাজের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি মঞ্চে এসেছে নতুন নাটক ‘একতারা’। সুমনা কাঞ্জিলালের রচনায় নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন তরুণ নির্দেশক রাজীব রেজা। নাটকটি সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রধান মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয়েছে। নাটক শুরুর আগে স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে দলের নতুন প্রযোজনার জন্য আশির্বাণী দেন দেশের বিশিষ্ট নাট্যজনেরা। বক্তব্যের পর শুরু হয় নাটক।

নাটকের গল্পে দেখা যায় সত্তর দশকের একটি বিখ্যাত পত্রিকার দুই রিপোর্টার বিশ শতকের শুরুর দিকে এক বিখ্যাত অভিনেত্রীর সাক্ষাৎকার নিতে যায়। পতিতাপল্লী থেকে উঠে আসা সেই অভিনেত্রী তুলে ধরেন তার জীবনের এক একটি পাতা। যে পাতায় বেরিয়ে আসে তখনকার সমাজের সাম্রাজ্য, বারবণিতার জীবন, তার ওপর শারীরিক মানসিক অত্যাচার এবং তার প্রেম। অভিনেত্রী তারাময়ী কি করে অন্ধকার থেকে আলো এবং প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে আবার সেই অন্ধকারে হারিয়ে যায় নাটকে তাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে নাটশিল্পী তারাময়ীর জীবন কাহিনী হিসেবে নাটকের নাম হওয়া উচিত ছিল ‘একজন তারাময়ী’। তা না হয়ে নাটকের নাম একতারা কেন রাখা হলো তা স্পষ্ট হয়। নাটকের নাম শুনে অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন হয়তো বাদযন্ত্র একতারা নিয়ে নাটকের গল্প। কিন্ত না, নামের ক্ষেত্রে দর্শকদের চমকে দেয়ার চেষ্টা ততটা ফলপ্রসু হয়নি। তবে

উপস্থাপনার আঙ্গিকে নতুত্বের কারণে অঙ্গীকার নাট্যদলের এই নতুন এ নাটকটি দলের জন্য অনেকটাই সম্ভাবনার কথা জানান দেয়। যদিও নাটকের অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বেশিরভাগই অপরিপক্বতা পরিলক্ষিত হয়েছে। নাটকের নির্দেশক একজন মিডিয়াকর্মী। সেই সুবাদে কলকাতায় একাধিকবার মঞ্চস্থ নাটকটি নতুনরূপে মঞ্চায়নের সাহস করেছেন সে জন্য বাহবা পেতেই পারেন। তবে প্রচলিত এবং অধিক জনপ্রিয় একটি প্রযোজনা নতুন করে মঞ্চে আনার আগে নানা গবেষণা বা নিরীক্ষা প্রয়োজন। সে সময় নির্দেশক বা দলের সদস্যরা পেয়েছেন বলে মনে হয়নি। নাটক মঞ্চায়ন শেষে নাটকের বিভিন্ন দুর্বল দিক এবং সম্ভাবনাময় বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। তবে সে সময়েও ক্ষুদে শিল্পীর মতো আচরণ করতে দেখা গেছে অভিনয় শিল্পীদের। অভিনেতা অভিনেত্রীরা পারস্পরিক কথা বলায় পুরো নাটকেই শিশুসুলভ আচরণ স্পষ্ট হয়েছে। নাটক শেষ হওয়ার আগেই দর্শকদের বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছিলেন দলের এক সদস্য। যিনি কথা বলার জন্য এতটাই উদগ্রীব ছিলেন যে নাটক শেষ হওয়ার আগেই তিনি মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চে চলে আসেন। অবশ্য নাটকের নির্দেশক এবং অভিনেতা তাকে থামিয়ে দিয়ে নাটক শেষ করেন। এ ধরনের অপেশাদর আচরণ এবং নাটক চলাকালীন বসে থাকা অভিনেতা অভিনেত্রীদের সাইড টক নাটকের মান অনেকটাই ক্ষুণœ করেছে। এছাড়া ‘একতারা’ নাটকের আঙ্গিক পোশাক নির্বাচনে ত্রুটি থাকলেও ঢাকার মঞ্চে একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। প্রযোজনাকে সফল করতে নাট্যশিল্পী নির্বাচনে নির্দেশককে আরও যতœশীল হওয়া প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আরও বেশি বেশি মহড়া করা যেতে পারে। কিছু কিছু চরিত্র যেমন তারার বৃদ্ধ বয়সী অভিনেত্রীকে আরও ম্যাচিউরড করতে হবে। অভিনয়ে দুর্বলতা একটি নাটকের গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। দর্শকদের বিরক্তির কারণ হয়। সেক্ষেত্রে চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতা অভিনেত্রীর দৈহিক গড়ন, বাচনভঙ্গিকে প্রাধান্য দেয়া নির্দেশকের কর্তব্য। সেক্ষেত্রে নির্দেশক অনেকটাই অবহেলা করেছেন বলে মনে হয়েছে। নাটকে বিসমিল্লাহ চরিত্রে রূপদানকারী এবং তারাময়ীর অভিনয় প্রশিক্ষককে কিছুটা সাবলীল মনে হয়েছে। অন্যদের ভাল করার চেষ্টায় দুর্বলতা ছিল। তবে কর্মী সঙ্কটের কারণে ছোট দলগুলো যে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বে¡ও ভাল কাজ করতে পারে না এক্ষেত্রে তা বলাই বাহুল্য। সম্ভাবনাময় ‘একতারা’ নাটকের নির্দেশক নিজে অভিনয় করেছেন বলে অন্যান্য চরিত্রের মতো ভবানী বাবুর মতো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি অবহেলার শিকার হয়েছে। এ কারণে অন্য চরিত্রগুলো নিয়ে ঘষামাজার সুযোগ পেলেও নিজের চরিত্র নিয়ে সেটার সুযোগ খুবই কম। নির্দেশক যখন একই নাটকের অভিনেতা হন তখন সেই চরিত্রের নান্দনিকতা প্রয়োজনীয় অভিনয়শৈলী প্রদর্শনে অনেকাংশেই ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। যার প্রভাব পড়ে পুরো প্রযোজনায়। আমাদের দেশের এমন শিল্পী খুব কম আছে যিনি নির্দেশনার পাশাপাশি অভিনয়েও সফল। কারণ এক সঙ্গে দুটো করতে গেলে একটা না একটাতে ঘাটতি হবেই তা বলাই বাহুল্য।

নাটকে সঙ্গীত পরিচালনা ও কণ্ঠদানে মঞ্জু সাহা ও তারেক ভাল করেছেন। এটা তবে লাইভ হলে নাটকের প্রাণস্পন্দনে আরও গতি পেত। শামিমা আক্তার মুক্তার পোশাক নির্বাচন নতুনত্ব না থাকলেও প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে, আলো নিয়ে সরফরাস আরও ভাবতে পারেন। নাটকের সেট নিয়েও ভাবতে পারেন নির্দেশক। পাশাপাশি নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে রূপদানকারী রাজীব রেজা, মনিরা মনি, আইরিন শ্রাবণী, সঞ্চিতা, কবির, শামিমা আক্তার মুক্তা, রাইমা, রূপক, সাইফ, আপন, হৃদয়, আপন, সবুজ, আলভী প্রমুখ অভিনয়শিল্পীরা অভিনয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ করে উচ্চারণ এবং অভিনয়ের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে আরও যতœশীল হওয়ার সুযোগ রয়েছে। মোটের ওপর প্রথম প্রদর্শনী হিসেবে ‘একতারা’ নাটকটি অঙ্গীকারের নাট্যচর্চায় অন্যমাত্রা যোগ করেছে। সে জন্য দলের কর্মী এবং নির্দেশক প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। বিশেষ করে নাটকের গল্পের কারণে বাংলাদেশের সংস্কৃতি কর্মীদের জন্য এটি একটি অনন্য প্রযোজনা হতে পারে। ভবিষ্যতে ভুলত্রুটি সংশোধন করলে নাটকটি একটি মাইলফলক প্রযোজনা হিসেবে পরিগণিত হবে সেই প্রত্যাশা।