১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাদ্রাসা শিক্ষার আড়ালে জঙ্গী প্রশিক্ষক মুফতি ইজহার

মাদ্রাসা শিক্ষার আড়ালে জঙ্গী প্রশিক্ষক মুফতি ইজহার

মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ অবশেষে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর সেই লালখান বাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হলো মুফতি ইজহারকে। শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ পড়াসহ বৈঠকের উদ্দেশেই এ মাদ্রাসায় পা রেখেছিলেন জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ইজহার। তবে মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার নামে বোমার কারিগর বানানোর ঘটনা একমাত্র চট্টগ্রামেই ঘটেছে। দেশে বিভিন্ন আন্দোলনের সময় জামায়াত-বিএনপিসহ এ ধরনের রাজনীতির ছত্রছায়ায় থাকারা বোমার সরবরাহ নিয়েছে এই মাদ্রাসা থেকে।

পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি এক্ষেত্রে মোটেও কাজ করেনি। একমাত্র বোমা বিস্ফোরণের কারণে মুফতি ইজহারের পরিচালিত লালখান বাজারে জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার এ ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একজন অধ্যক্ষের বেশে মুফতি ইজহার ও তার ছেলে মুফতি হারুন ইজহার মাদ্রাসার ছাত্রদের ধর্মীয় শিক্ষার নামে বোমার কারিগর বানানোর অপচেষ্টা চালায়। পাশাপাশি এ বোমা নিক্ষেপে ও সাধারণ মানুষকে আঘাত করতে জঙ্গী প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে এ মাদ্রাসায়।

চট্টগ্রাম পাহাড়ের শহর হিসেবে খ্যাত। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সৃষ্টিকর্তা পাহাড় ও সাগর তৈরি করেছেন। কিন্তু চট্টগ্রামসহ কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে জঙ্গী প্রশিক্ষণের আস্তানা বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা খুঁজে পেয়েছে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে র‌্যাবের অভিযানে জঙ্গী আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায় পাহাড়ের উপর। মুফতি ইজহারের মাদ্রাসাটিও চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়কেন্দ্রিক এলাকা লালখান বাজারে অবস্থিত। এখানে রয়েছে মতিঝর্নায় ওয়াসার টাঙ্কির পাহাড়, টাইগার পাসের বাটালি হিল ও বাগঘোনার পাহাড়ে মুফতি ইজহার পরিচালিত মাদ্রাসাটি।

শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লালখান বাজারের মাদ্রাসা থেকে মুফতি ইজহারুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে। বিকেল ৫টায় গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেস ব্রিফিং হয়নি। তবে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে মুফতি ইজহার বলেন, মনে রাখবেন ছবি তোলার মধ্যে শেষ নয়। আমি ২০ দলীয় জোটের নেতা।

ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বাগঘোনার শেষ সীমান্তে সড়ক উঠে গেছে উঁচু পাহাড়ের দিকে। রয়েছে সুবিশাল ফটক। এ ফটকের ভেতরেই মাদ্রাসার কয়েকটি ভবন রয়েছে। তবে এসব ভবন সুউচ্চ নয়। একতলা কিংবা দোতলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ ফটকের ভেতরে বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। অভিভাবকরা তার সন্তানদের সঙ্গে অথবা শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে এলে ফটকের পার্শ্ববর্তী একটি কামরায় দেখা করার সুযোগ মেলে। ভেতরে কি হচ্ছে তা নিয়ে কোন ধরনের প্রশ্ন হচ্ছে কিনা তা শোনার জন্য প্রত্যক্ষভাবে একজনকে দাঁড় করিয়ে রাখা হত। সবকিছু মিলে ওই মাদ্রাসা ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। ফলে জঙ্গী প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে বোমা বানানো ও নিক্ষেপের প্রশিক্ষণও চলত সেখানে। তবে সেক্ষেত্রে প্রকৃত বোমা বাদ দিয়ে নকল বোমা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হত।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ওই মাদ্রাসায় বোমা বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বোমা তৈরির কারিগরসহ ৩ জন নিহত হয়। আহত হয় আরও বেশ কয়েকজন। কিন্তু মিডিয়াকে আড়াল করতে দ্রুতগতিতে অনেককেই সরিয়ে ফেলা হয়। চিকিৎসা দেয়া হয় জামায়াত পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে। ফলে মিডিয়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আহতদের হন্যে হয়ে খুঁজেও পায়নি। এদিকে, ওইদিন সকালে বোমা বিস্ফোরণের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখান থেকে তাজা বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে। এ ঘটনায় খুলশী থানায় তিনটি মামলা দায়ের হয়। এসব মামলায় মুফতি ইজহার ছাড়াও তার ছেলে হারুন ইজহার আসামি ছিলেন। হারুন ইজহারকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও পালিয়ে ছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম।

গোয়েন্দা বিভাগের তদন্তে উঠে এসেছে এ মাদ্রাসা ঘিরে গড়ে উঠেছিল আন্তঃদেশীয় জঙ্গীদের প্রশিক্ষণ ঘাঁটি। ফলে ২০০৯ সালের শেষদিকে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনে হামলার নীলনক্সা তৈরি করা হয়েছিল। এ হামলার পরিকল্পনা করেছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা। লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে ইজহারের ছেলে হারুন ইজহারের সম্পৃক্ততা ছিল। ফলে ওই মাদ্রাসায় পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে জঙ্গী হামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর আগে মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশন থেকে ভিসা নেয়ার নামে র‌্যাকি করেছিল জঙ্গীরা। মুফতি ইজহারসহ বেশ কয়েকজনের সম্পৃক্ত থাকার তথ্যটি প্রকাশ পাওয়ার পর ভারতীয় জঙ্গী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য ও ভারতীয় নাগরিক শহিদুল, সুজন, সালাম, আল আমিন ওরফে মইফুলকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা বিভাগ।

গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা লালখান বাজারের ওই মাদ্রাসায় অভিযানকালে ২০০৯ সালে হারুন ইজহারের কক্ষ থেকে একটি ল্যাপটপ জব্ধ করে। ওই ল্যাপটপেই ছিল বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের তথ্য উপাত্ত। শুধু তাই নয়, মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনের র‌্যাকি করে যেসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল তাও উদ্ধার করা হয় ওই ল্যাপটপ থেকে। লস্কর-ই-তৈয়বার অন্যতম শীর্ষ নেতা নাছির ও সরফরাজ গোয়েন্দা অভিযানের আগেই পালিয়ে যায় সেখান থেকে। ভারতের এই দুই মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গীকে গ্রেফতারে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হয়। অবশেষে ওই বছরের ৬ নবেম্বর ভারতীয় এই দুই জঙ্গী কুমিরা সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় সে দেশের সীমান্তরক্ষীর হাতে ধরাও পড়ে। উল্লেখ্য, এই দুই জঙ্গী ভারতের ব্যাঙ্গালুরু কম্পিউটার সিটিতে বোমাহামলাসহ বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। পরে তারা দুবাই হয়ে বাংলাদেশে চলে আসে। লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য মুফতি ইজহারের ছেলে হারুন ইজহারের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় থাকায় তারা অবস্থান নেয় লালখান বাজারের ওই মাদ্রাসায়। মুফতি ইজহারুল ইসলাম পরিচালিত এ মাদ্রাসা পাহাড়ের চূড়ায় হওয়ায় অনেকটা লোক চক্ষুর আড়ালে রয়েছে। জঙ্গী প্রশিক্ষণের জন্য এ মাদ্রাসা অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদার্পণও নেই ওই এলাকায়। ফলে দিনের পর দিন মাদ্রাসা শিক্ষার নামে চলেছে জঙ্গী প্রশিক্ষণ। এর আগে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান রাবার বাগানএলাকার গোদারপাড়ের পাহাড়ের চূড়ায় হরকাতুল জিহাদ (হুজি) প্রশিক্ষণকালে অভিযান চালিয়ে জিহাদী বই ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে র‌্যাব। এ ঘটনায় বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলায় মুফতি ইজাহারুল ইসলাম চৌধুরীসহ মোট আটজন আসামি ছিল।

এদিকে, ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগের র‌্যাব-৭-এর হাতে দুই সহযোগীসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। হরকাতুল জিহাদের (হুজি) তৎকালীন আমির মাওলানা ইয়াহিয়া ওরফে বদ্দা (৪৬) এবং তার দ্ইু সহযোগী মোঃ বাহাউদ্দিন (২২) ও ইয়ার মোহাম্মদ (৫০) কে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গ্রেফতারকৃত ইয়াহিয়ার দেয়া তথ্যে বেরিয়ে আসে বৃহত্তর চট্টগ্রামে হুজি প্রশিক্ষণের আরেকটি সেন্টার। এ সেন্টারটি লালখান বাজার মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত। আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজারের এই মাদ্রাসায় সাংগঠনিক অফিস খুলে। এমনকি মুফতি ইজহারই এই মাদ্রাসার দায়িত্বে থেকে তার ছেলে হারুন ইজহারকে সঙ্গে রেখে অন্যান্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণে প্রলুব্ধ করেন। উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে কবি শামসুর রাহমানের প্রাণনাশের চেষ্টা করায় মুফতি ইজহারকে আটক করা হয়। তবে ওই সময় গ্রেফতারকৃত জঙ্গীরা বলেছিল কবি শামসুর রাহমানকে হত্যার ট্রেনিং নেয়া হয়েছিল এই মাদ্রাসা থেকেই।