২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শাহজালালের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা ॥ চূড়ান্ত থার্ড টার্মিনাল

শাহজালালের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা ॥ চূড়ান্ত থার্ড টার্মিনাল
  • দুই লাখ ৩ হাজার বর্গমিটার জমি নির্ধারণ;###;আনুমানিক ব্যয় ১৩ হাজার কোটি টাকা ;###;কাজ শুরুর তিন বছরের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়ন ;###;বার্ষিক ধারণক্ষমতা হবে ২ কোটি যাত্রী

আজাদ সুলায়মান ॥ আপনি শনিরআখড়া থেকে সোজা মেট্রোরেলে চলে আসবেন শাহজালাল বিমানবন্দর পয়েন্টে। এখানে নেমেই কানেক্টিং পয়েন্ট দিয়ে চলে যাবেন থার্ড টার্মিনালে। পথে কোথাও কোন যানজট বা থামাথামি নেই। এজন্য সময় লাগবে মাত্র বিশ মিনিট। আবার যদি গাজীপুর থেকেও আসেন তাহলেও বিমানবন্দরের ওভারপাস দিয়ে বাঁ দিকে চলে যাবেন সোজা থার্ড টার্মিনালে। যদি ট্রেনেও আসেন- তাহলেও রাস্তা পার হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। রেলস্টেশন থেকে নিচের টানেল দিয়েই দুই মিনিটে চলে যাবেন থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড ফ্লোরে। যেখান থেকে এসকেলটর দিয়ে ওঠে যাবেন তিন তলায় চেক ইন কাউন্টারে। অথবা নিচের আগমনী হলে। এটা স্বপ্নের মতো হলেও তাই বাস্তব হতে চলছে। শাহজালাল বিমানবন্দরের বহুল আলোচিত থার্ড টার্মিনালের গঠন প্রকৃতি, নক্সা ও অবকাঠামো এভাবেই সাজানো হয়েছে।

বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউশিন কর্পোরেশন যে সমীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করেছে, তাতে এভাবেই সাজানো হয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত থার্ড টার্মিনালের নক্সা। একই সঙ্গে এ বিমানবন্দরের জন্য আগামী ২০৩৫ সাল পর্যন্ত একটি মহাপরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হয়েছে। বিমানবন্দরের এ নক্সা, গঠন প্রকৃতি, আকৃতি ও মহাপরিকল্পনা ইতোমধ্যে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) এখন বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন। আগামী সপ্তাহেই তা অনুমোদন দিয়ে পাঠানো হবে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে। তারপর সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে এ প্রকল্প কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে, নাকি বিদেশী অনুদানে প্রকল্প ব্যয় মেটানো হবে, সে সিদ্ধান্তের পরই চূড়ান্ত দরপত্র আহ্বান করা হবে।

সমীক্ষা প্রতিবেদনে বেশ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, শাহজালাল বিমানবন্দরের বর্তমান ধারণ ক্ষমতার চেয়েও অনেক বেশি যাত্রী ও কার্গো বহন করা হচ্ছে। যে হারে যাত্রী ও কার্গো বাড়ছে তাতে আগামী ২০১৮ সালের পর পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে না। সেজন্য থার্ড টামির্নাল তৈরি অপরিহার্য। এজন্য শাহজালাল বিমানবন্দরের দক্ষিণের ভিভিআইপি লাউঞ্জ থেকে শুরু করে পদ্মা অয়েল পর্যন্ত ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার জমি নির্ধারণ করা হয়েছে থার্ড টার্মিনালের জন্য। এজন্য আনুমাণিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকা। কাজ শুরু করার তিন বছরের মধ্যেই এটা সম্পন্ন করা সম্ভব। থার্ড টামির্নাল নির্মিত হলে সেটার ধারণ ক্ষমতা থাকবে বার্ষিক ২ কোটি যাত্রী, যা দিয়ে স্বাভাবিক গতিতে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে ২০৩৫ সাল পর্র্যন্ত। তারপর একটি নতুন বিমানবন্দর করতেই হবে।

এ কাজের প্রধান সমন্বয়ক সিভিল এভিয়েশনের প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দুু বিকাশ গোস্বামী জনকণ্ঠকে বলেছেন, ‘থার্ড টার্মিনাল এখন আর স্বপ্ন নয়। অতি দ্রুত বাস্তবায়ন হতে যাওয়া বর্তমান সরকারের এক অগ্রাধিকার প্রকল্প।’

জানা যায়, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিমানযাত্রী বৃদ্ধির শীর্ষ দশ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। সারাবিশ্বে বতর্মানে এক বছরে যাত্রী বাড়ছে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এ হার ৭ থেকে ৮ শতাংশ। তার মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সবার শীর্ষে ৮ থেকে ৯ শতাংশ। বর্তমানের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী পারাপার হয় বছরে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ। এসব যাত্রী সামাল দিতে গিয়ে পিক আওয়ারে প্রচ- হিমশিম খেতে হয়। ইমিগ্রেশন কাউন্টার থেকে কনভেয়ার বেল্ট পর্যন্ত বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাইরের ক্যানপী থেকে পার্কিং কাউন্টার প্রতিটি পয়েন্টে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা দেয়। যাত্রী দর্শনার্থীদের সেবা দূরের কথা, অসহনীয় পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। এক সঙ্গে ৬/৭টা ফ্লাইট নামলেই পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তখন যে চিত্র চোখে পড়ে, তাতে এটাকে সচল বিমানবন্দর বলার উপায় থাকে না।

এ সম্পর্কে প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী জানান, যে হারে যাত্রী বাড়ছে, তাতে ২০২০ সালে সেটা দাঁড়াবে প্রায় এক কোটি। আরও এক যুগ পর অর্থাৎ ২০৩২ সালে সে যাত্রীর সংখ্যা দাঁড়াবে কমপক্ষে দেড় কোটি। তখন থার্ড টার্মিনাল দিয়েও এ সব যাত্রীর সেবা দেয়া সম্ভব নয়। এ বিবেচনায় এখনই নতুন করে একটা এয়ারপোর্ট করতে হবে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট নির্মাণের কোন বিকল্প নেই।

থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের স্থান হিসেবে প্রাথমিকভাবে বর্তমানের ভিভিআইপি টার্মিনাল থেকে শুরু করে দক্ষিণদিকের হেলিপ্যাড টার্মিনাল পর্যন্ত সুবিস্তৃত জায়গা বাছাই করা হয়েছে। এজন্য হেলিকপ্টার টার্মিনাল অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য ইতোমধ্যে নোটিস দেয়া হয়েছে। থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ কাজ শুরুর আগেই সেসব স্থাপনা সরিয়ে নেয়া হবে।

এছাড়া বর্তমানের অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল সরিয়ে নেয়া হবে উত্তরদিকের কার্গো ভবনের স্থলে। কার্গো ভবন নেয়া হবে আরও উত্তরে। আর ভিভিআইপি লাউঞ্জ স্থানান্তর করা হবে সর্বদক্ষিণে।

কি থাকছে থার্ড টার্মিনালে ॥ চূড়ান্ত নক্সায় দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার জমির ওপর নির্মিত হবে থার্ড টার্মিনাল। যার ধারণ ক্ষমতা হবে বছরে কমপক্ষে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী। এ টার্মিনালের রানওয়ে হিসেবে ব্যবহার করা হবে মূল টার্মিনালের বর্তমান রানওয়ে, যা আরও সম্প্রসারণ করার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ১০৫০০ ফুট থেকে বৃদ্ধি করা হবে ১২ হাজার ফুটে। যাতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুপরিসর উড়োজাহাজ এয়ারবাস এ ৩৮০- ওঠানামা করতে পারবে।

থার্ড টার্মিনালের নক্সায় রাখা হয়েছে, ২৬টি বোর্ডিং ব্রিজ। বর্তমানে মূল টার্মিনালে রয়েছে মোট আটটি বোর্ডিং ব্রিজ। বোর্ডিং ব্রিজের সঙ্গে থাকবে ১৩টি আগমনী বেল্ট। পর্যাপ্ত সংখ্যক একসেলেটর, সাবস্টেশন ও লিফট সংযুক্ত রাখা হবে। থাকবে রাডার, কন্ট্রোল টাওয়ার, অপারেশন ভবন, বহুতল কারপার্ক। তিনতলা বিশিষ্ট এই টার্মিনাল ভবনটির স্থাপত্যরীতিতে আনা হয়েছে অনন্য নান্দনিকতা। এর বহির্দৃশ্য ও ভেতরের গঠন প্রকৃতিতে থাকছে অপূর্ব ও মন জুড়ানো সব স্থাপনা।

জানা যায়, গত বছর শাহজালাল বিমানবন্দরের যাত্রী সুবিধা বৃদ্ধির জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোরিয়ার ইউশিন, সিঙ্গাপুরের সিপিজি ও বাংলাদেশের ডিডিসি জয়েন্ট ভেঞ্চারকে নিয়োগ দেয়া হয়। কোরিয়ার ইউশিন কর্পোরেশন বিশ্ব র‌্যাঙ্কিয়ে পর পর সাত বছর প্রথম হওয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইনচিয়ান বিমানবন্দর কোরিয়া নির্মাণ কাজের পরামর্শক ছিল। সিঙ্গাপুরের সিপিজি এশিয়ার হাব হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর নির্মাণ করার পরামর্শক ছিল। দেশীয় ডিডিসি শাহ আমানত বিমানবন্দর নির্মাণ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে বর্তমানে বিমানবন্দর যাত্রী ধারণ ক্ষমতা বছরে প্রায় ৮০ লাখ। বর্তমানে ৬৭ লাখ যাত্রী প্রতি বছর হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন। এটা প্রতি বছর বাড়ছে শতকরা সাড়ে ৯ দশমিক হারে। সে হিসেবে ২০১৮ সালে বিমানবন্দরের যাত্রী সংখ্যা বাড়বে ১ কোটি। এ সময়ে ওই সংখ্যক যাত্রী বর্তমান টার্মিনাল দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ফলে বাধ্য হয়েই এ সময়ের আগেই একটা থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের কোন বিকল্প নেই।

সমীক্ষায় দেখা যায়, কার্গো বৃদ্ধির পরিমাণও বেশি। বর্তমানে বছরে দুই লাখ টন কার্গো পরিবহনের সামর্থ্য থাকলেও সেটা করা হচ্ছে ২ লাখ ৩৭ টন, যা শতকরা ১৮ ভাগ বেশি। নতুন মহাপরিকল্পনায় দেখা যায়, ২০৩৫ সালে বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা দাঁড়াবে ২ কোটি ৪০ লাখ।

সমীক্ষায় থার্ড টার্মিনাল তৈরি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১.৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আইআরআর (ইন্টারনাল রেইট অব রিটার্ন) ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৮ ভাগ, যা এ জাতীয় বড় প্রকল্পে সচরাচর দেখা যায় না। পরামর্শকের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন। এদিকে থার্ড টার্মিনাল তৈরির জন্য আগাম প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। এ জন্য সিভিল এভিয়েশনের নিজস্ব প্রকৌশল বিভাগের এক ঝাঁক উদ্যমী ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে প্রয়োজনীয় ফিট-পুল। প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর নেতৃত্বে এ বিভাগের দক্ষ ও অভিজ্ঞ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম মাকসুদুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ হাবিবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী এ এইচ এম নুরুউদ্দিন চৌধুরী, প্রকৌশলী জাকারিয়া হোসেন ও নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ইতোমধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা ইতোপূর্বে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বেশ সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এছাড়া প্রকৌশলীদের এই ইউনিট শাহজালাল বিমানবন্দরের আপগ্রেডেশন প্রকল্প, রানওয়ের ওভারলে ও এপ্রোন নির্মাণেও যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।

থার্ড টার্মিনালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে সুধেন্দুু বিকাশ গোস্বামী জনকণ্ঠকে বলেন, যে ডিজাইনটা চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে, সেটা বাস্তবায়ন হলে গোটা শাহজালালের চেহারা পরিবর্তন হয়ে যাবে। এটা হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নান্দনিক স্থাপত্যকীর্তি। বিশ্বমানের অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ যাত্রী সেবা ও নিরাপত্তায় আসবে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। বিশেষ করে শাহজালাল বিমানবন্দর সামনের মহাসড়কের নির্মাণাধীন যাতায়াত প্রকল্প উড়াল সেতু, মেট্রোরেল, গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত র‌্যাপিড বাস ট্রানজিট পয়েন্টের সঙ্গে থার্ড টার্মিনালের স্বতন্ত্র সংযোগ দেয়া হবে। যাতে উত্তর-পশ্চিম-পূর্ব-দক্ষিণ দেশের যে প্রান্ত থাকেই যাত্রী আসুক, তারা বিমানবন্দর গোল চক্কর থেকে স্বতন্ত্র সংযোগ দিয়েই অনায়াসে চোখের পলকেই চলে যেতে পারবে থার্ড টার্মিনালে। এ নিয়ে আর কোনদিন যানজটের বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না কোন যাত্রীকে। বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ হলে এর আয় বেড়ে যাবে বর্তমানের চেয়ে আট গুণ বেশি। সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী এ প্রকল্পের ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (আইআরআর) সাড়ে ৮ এরও বেশি, যা সচরাচর এ ধরনের প্রকল্পসমূহে দেখা যায় না। এর আয় দিয়েই ৬/৭ বছরের মধ্যে নির্মাণ ব্যয় ওঠে আসবে। এদিক থেকে বলা চলে থার্ড টার্মিনাল হবে চরম সম্ভাবনাময় একটি প্রকল্প।

সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্পর্কে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চরম আগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে থার্ড টার্মিনালের চূড়ান্ত ড্রয়িং ডিজাইন উপস্থাপন করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে সেটা দেখার পর চরম সন্তুষ্টি প্রকাশ করে যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্প বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। এ জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়ারও আশ্বাস দেন তিনি। কাজেই এখন এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই।

এদিকে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা থার্ড টার্মিনালের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করলেও বর্তমান নির্ধারিত স্থানে নির্মাণ করাটা বেশ জটিলতা দেখা দিতে পারে। বর্তমান শাহজালালের পাশে থার্ড টার্মিনালের পরিবেশগত প্রতিকূলতার উদাহরণ টেনে বলেন- এমনিতেই এ এয়ারপোর্টের চারপাশে রয়েছে আবাসিক এলাকা। উড়োজাহাজের টেক অব ও ল্যান্ডিং করাটাও জনস্বাস্থ্যের প্রতি চরম হুমকিস্বরূপ। এ সব বিবেচনায় বর্তমান শাহজালালের পরিধি ও আয়তন না বাড়িয়ে বরং অন্যত্র একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণকে যৌক্তিক মনে করেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আগামী একশ বছরের চিন্তা মাথায় রেখে এখনই একটি অত্যাধুনিক মানের বিমানবন্দর তৈরির বাস্তবসম্মত প্রকল্প হাতে নিতে হবে।

এ বিষয়ে সিভিল এভিয়েশনের একজন পরিচালক জানান, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ করলেও সেটা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে বড়জোর দশ বছর। তারপর কি হবে? সেটা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে ২০৩২ সাল পর্যন্ত। যখন যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে কমপক্ষে দেড় কোটি। তখন কিভাবে এসব যাত্রী মোকাবিলা করা হবে? তখন তো থার্ড টার্মিনাল দিয়েও সামাল দেয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে নতুন করে একটা বিশাল বিমানবন্দর নির্মাণ করতে হবে, যা করতে সময় লাগবে, কমপক্ষে দশ বছর থেকে বার বছর। এ বাস্তবতায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে নতুন একটি বিমানবন্দর নির্মাণের। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্প নিয়ে ঢিলেমি করারও কোন অবকাশ নেই। যে কোন মূল্যে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট নির্মাণের।

এ বিষয়ে সাবেক বিমানমন্ত্রী কর্নেল ফারুক খানও জনকণ্ঠকে বলেন- থার্ড টার্মিনালের চাইতেও বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট নির্মাণের ওপর বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত। বিগত সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট প্রকল্পের কাজ অনেকটাই অগ্রসর হয়েছিল। আমি নিজে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে আশ্বাস আদায় করেছিলাম, তারা পৃথিবীর সেরা ইনচেন এয়ারপোর্টের মতো বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট তৈরি করে দিবে। বিওটি পদ্ধতিতে তারা অর্থায়নেও আগ্রহী ছিল। তারপর কেন সেটা হচ্ছে না তা আমার বোধগম্য নয়। তবে পদ্মা সেতুর মতোই গুরুত্ব দিয়ে এখনই বঙ্গবন্ধু এয়ারপোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

এদিকে এত সম্ভাবনার মাঝেও কিছু জটিলতা থেকেই যাচ্ছে, যা মোকাবিলা করা সিভিল এভিয়েশনের জন্য কঠিন বলে আশঙ্কা করছেন এভিয়েশন মহল। যেমন যে স্থানে থার্ড টার্মিনাল করার জন্য প্রাথমিকভাবে বাছাই বা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, সেখানে রয়েছে বিপুলসংখ্যক সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। আছে বিমানের সদর দফতর বলাকা, ভিভিআইপি টার্মিনাল, পদ্মা অয়েল ডিপো, দীর্ঘ ৫০ বছরের পুরনো ফ্লাইং ক্লাব, বেসরকারী এয়ারলাইন্স আরিরাং, হেলিকপ্টার সার্ভিসেস আর এ্যান্ড আর এভিয়েশন, পারটেক্স এভিয়েশন, বাংলা এয়ার, স্কয়ার এয়ার, বিআরবি এয়ার, মেঘনা এয়ার, পিএইচপি ও আর্মি এভিয়েশন। আরও আছে সেমসূ, আর্মড পুলিশের কোয়ার্টার, পুকুর, জলাশয় ও বাগান। এতগুলো প্রতিষ্ঠান রেখে কিভাবে এখানে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে সে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন- এটা অবাস্তব ও অযৌক্তিক। যেমন পদ্মা অয়েলের ডিপো বহাল তবিয়তে রেখে কিছুতেই সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত স্থানে থার্ড টার্মিনাল তৈরি করা যাবে না। নিরাপত্তার বিষয়ে এটা খুবই জটিল।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতগুলো স্থাপনা রেখে যেমন ওখানে থার্ড টার্মিনাল তৈরি করা যাবে না। তেমনি এসব প্রভাবশালীদের রাতারাতি উচ্ছেদ করাও সহজ কাজ হবে না। সিভিল এভিয়েশন মাত্র দু-তিন বছর আগে এসব প্রাইভেট এয়ারলাইন্সকে হ্যাঙ্গার তৈরির অনুমোদন দিয়েছে। এতে কোম্পানিগুলো শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ করে। এখন আবার তাদের রাতারাতি সরানোর উদ্যোগও অযৌক্তিক ও অন্যায্য। এদের কেউ যদি আদালতের আশ্রয় নেয়, তাহলেই পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। আসলে এদের স্থাপনা তৈরির অনুমোদন দেয়ার আগে সিভিল এভিয়েশনের উচিত ছিল বিষয়টি ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

তবে সিভিল এভিয়েশন এটাকে খুব জটিল হিসেবে বিবেচনা করছে না। একজন পরিচালক জানান, থার্ড টার্মিনালের কাজ শুরু করতে করতেও সময় লেগে যাবে এক বছর। তারপর উত্তর দিক থেকে কাজ শুরু করে দক্ষিণের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন করতেও তো তিন বছর সময় লাগবে। ততদিন পর্যন্ত প্রাইভেট হেলিকপ্টার ও এয়ারলাইন্সগুলো এখানে থাকার সুযোগ পাবে। এ সময়ের মধ্যে ওদের সঙ্গে একটা সমঝোতা হয়ে যাবে।