১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এ্যাসিডদগ্ধ লালবানুর বার্ন ইউনিটে সন্তান প্রসব

এ্যাসিডদগ্ধ লালবানুর বার্ন ইউনিটে সন্তান প্রসব
  • সর্বাঙ্গ ব্যান্ডেজে জড়ানো মা প্রিয় শিশুকে কোলে নিতে পারছেন না

শর্মী চক্রবর্তী ॥ মাতৃজঠরে গুলিবিদ্ধ নাজমা বেগম অবশেষে শিশু সুরাইয়াকে নিজে কোলে তুলে নিয়েছেন। পান করিয়েছেন মাতৃদুগ্ধ। মায়ের মনে শান্তি ফিরেছে। আনন্দে ভরেছে মাতৃহৃদয়। কিন্তু গর্ভবতী লালবানুর আনন্দে ছাই পড়েছে। তার এমন সাধ্য নেই নবজাতক সন্তানকে কোলে তুলে নেয়। তার জন্য কাল হয়েছে সর্বনাশা এসিড। অর্ধাঙ্গে ব্যান্ডেজ জড়ানো মা লালবানু মঙ্গলবার সকালে বার্ন ইউনিটের বেডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জন্ম দেন কন্যা শিশুর। শিশুটি ঢাকা মেডিক্যালের (ঢামেক) নবজাতক বিভাগে আর লালবানু একই হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের তৃতীয় তলায় চিকিৎসাধীন। জন্মের একঘণ্টা পর সন্তানকে কাছে পেয়েছিলেন। এরপর আর সন্তানের মুখ দেখতে পারেননি মা।

গত ২১ জুলাই রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় নিজগৃহ সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ থানার তেলিজান গ্রামে তাকে এসিডে দগ্ধ করা হয়। তার কোমর থেকে মুখম-লের একপাশসহ দেহের ২২ শতাংশ এসিডে ঝলসে গেছে। এছাড়া তার স্বামীও কিছুটা আহত হয়েছেন এই এসিডে। এই ঘটনার পর তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে পাঠিয়ে দেন। তখন লালবানু ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ৪ আগস্ট ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন মা লালবানুর গর্ভের সন্তান ভূমিষ্ট হয়। জন্মের পর ১ ঘণ্টা শিশুটি মায়ের কাছে ছিল। শিশুটির অবস্থা একটু খারাপ থাকায় তাকে নবজাতক ওয়ার্ডে নেয়া হয়।

তার স্বামী রেজাউল ইসলাম এক বছর আগে বিয়ে করেন লালবানুকে। এটি রেজাউলের দ্বিতীয় বিয়ে। অভিযোগÑ এটি সহ্য করতে না পেরে প্রথম স্ত্রী সন্তানসহ ওই পক্ষের লোকেরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

রেজাউল ও লালবানু জানান, গত ঈদ-উল-ফিতরের তিন দিন আগেও বাড়িতে এসিড নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু সৌভাগ্যবশত সে রাতে পারিবারিক কাজে বাড়ির বাইরে থাকায় অক্ষত ছিলেন। কিন্তু তার বিছানায় শুয়ে থাকা তার মামাত বোন সামান্য দগ্ধ হন। প্রতিবেশীদের থেকে পরে জানতে পারেন তার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর পক্ষ থেকে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ২১ জুলাই রাতে তিনি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় রড কেটে সেই স্ত্রীর ছেলেসহ কয়েকজন তার ঘরে প্রবেশ করে এসিড নিক্ষেপ করে। এ সময় সঙ্গে থাকা তার স্বামীর দেহের নানা স্থানে হালকা এসিড পড়ে। ঘটনার পরপরই রায়গঞ্জ থানায় লালবানুর মা বাদী হয়ে ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। এর মধ্যে রেজাউলের প্রথম স্ত্রী ওহিদাকে গ্রেফতার করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে ২২ জুলাই আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান। অন্য আসামিরা হলো ওহিদার বাবা, মা, ভাই, ছেলে, চাচাশ্বশুর।

লালবানু জানান, সতীনের সংসারে যেতে বা খরচপাতি দিতে স্বামীকে কখনও বাধা দেননি তিনি। অথবা তাদের থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করার কোনো পরিকল্পনাও করেননি। তবে কেন তাকে ও তার স্বামীকে এসিড ছোড়া হলো? Ñ প্রশ্ন তার।

রেজাউল স্বীকার করেন তিনি প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তিনি বলেন, সে আমাকে সবসময় সন্দেহ করত। কিছু না করলেও আমার ওপর তা চাপিয়ে দিত, এ কারণেই আমি তাকে না জানিয়ে বিয়ে করেছি। কিন্তু এখন যে সে এসিড মারল এতে কি সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে?

জন্মের পর নবজাতক শিশুটিকে এনআইসিইউতে রাখা হয়েছে। নবজাতক ও সার্জারি বিভাগের দু’জন চিকিৎসকের কাছে শিশুটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুটির কান্নার শব্দ অস্বাভাবিক ছিল। তাছাড়া সে জš§গ্রহণ করেছে অসময়ে। সেজন্য সঠিক যতœ নিতেই নিওনেটাল কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) নেয়া হয়েছে। এসিডের কোন প্রভাব নবজাতকের ওপর পড়েনি। স্যালাইনের মাধ্যমে তার খাবারের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে।

আবেগঘন স্বরে লালবানু বলেন, আমার কলিজার টুকরাটারে নিয়া সবচেয়ে চিন্তা করছিলাম। পেট থেইক্কা বাইর হওনের পরে ওরে দেখছিলাম। এরপর আমার জ্ঞান চইলা যায়। আর দেখি নাই সোনামণিরে। তিনি বলেন, আমার প্রথম সন্তান, তারে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল। আশা ছিল জন্মের পর আমি তারে দুচোখ ভইরা দেখব। কোলে তুলে আদর করব কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। না পারছি বাচ্চাকে কোলে নিতে, না পারছি তাকে বুকের দুধ খাওয়াতে। এখন ওরে কোলে তুইলা দুধ না খাওয়ানি পর্যন্ত আমার মনে শান্তি পামু না।

এ বিষয়ে বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বলেন, লালবানুর অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটা ভালর দিকে। আশা করছি সে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে। তার শিশুটিরও চিকিৎসা চলছে নবজাতক ওয়ার্ডে। তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব সহায়তা হাসপাতাল থেকে দেয়া হচ্ছে।

পেশায় রাজমিস্থি লালবানুর স্বামী রেজাউল জানান, আমরা ভালভাবেই সংসার করছিলাম। কিন্তু সেটা আমার বড় বউয়ের সহ্য হয়নি বলেই সে এ কাজ করছে। বর্তমানে তার কাজ বন্ধ। চিকিৎসার বেশিরভাগ জিনিস হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে পেলেও কিছু ওষুধ আনুষঙ্গিক খরচ হয় প্রতিদিনই। যা চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ ধার নিচ্ছেন। তার পক্ষে সবকিছুই খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে।