২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এ পর্যন্ত ছয় ব্লগার খুন হয়েছেন

রশিদ মামুন ॥ রাজিব, দ্বীপ, অভিজিত, ওয়াশিকুর, অনন্ত, নিলয়... এর পর কে? একের পর এক মুক্তমনা ব্লগার লেখকদের হত্যাকা-ের পর এই প্রশ্নটি সকলের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিগত ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ছয় ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। নির্মমভাবে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে আসিফ মহিউদ্দিন এবং অভিজিতের স্ত্রী নাফিজা আহমেদকে। খোদ সরকারের কাছে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে ব্লগারদের যে তালিকা দেয়া হয়েছিল তা ধরেই এই হত্যাকা- চালানো হচ্ছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হত্যাকা- থামাতে যেমন ব্যর্থ হচ্ছে তেমনি ব্লগারদের নিরাপত্তাও দিতে পারছে না। ফলে ক্রমেই মুক্তমনা লেখকদের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে দেশের পরিবেশ।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশের তরুণ সমাজের সোচ্চার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে ধর্মীয় রঙ দেয় জামায়াত-শিবির। ওই সময় দেশের সকল ব্লগারকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে আন্দোলন শুরু করে হেফাজতে ইসলাম। পরবর্তী সময়ে উগ্র ইসলামী ভাবধারায় পরিচালিত আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের এক নেতার কাছে একটি তালিকা পাওয়া যায়। পাশাপাশি সময়ে আনজুমানে আল বাইয়্যিনাত নামে একটি সংগঠন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্লগারদের একটি তালিকা জমা দেয়। চলতি বছর খুন হওয়া ব্লগারদের মধ্যে তিনজনই সেই তালিকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি সংগঠন তালিকা জমা দিয়েছে। এখন সেই তালিকা ধরে একের পর এক ব্লগার হত্যা হচ্ছে অথচ এর মূল পরিকল্পনাকারীরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

হত্যাকা-ের সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৩ সালে ব্লগারদের ওপর মোট তিনটি বড় ধরনের হামলা হয়েছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন দু’জন। একজন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ঐ বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি আহমেদ রাজিব হায়দারকে হত্যা করা হয়। একই বছর ৯ এপ্রিল বুয়েটের ছাত্র ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপের ওপর হামলা করা হয়। ওই সময় গুরুতর আহত দ্বীপ একই বছরের ২ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। বছরের শুরুতে ১৪ জানুয়ারি হত্যাকা-ের উদ্দেশ্যে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর হামলা করলেও সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। এখন মহিউদ্দিন দেশের বাইরে রয়েছেন।

বিগত ২০১৩ সালে ব্লগার হত্যাকা- শুরু হলেও চলতি বছর তা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে চার ব্লগারকে। এদের মধ্যে একজন ফেসবুকের ফ্যানপেজে লেখালেখি করতেন। দেখা যায়, ২৬ ফেব্রুয়ারি লেখক অভিজিত রায় এবং তার স্ত্রী নাফিজা আহমেদকে বইমেলার বাইরে কুপিয়ে আহত করা হয়। এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে গেলে অভিজিত রায়কে মৃত ঘোষণা করা হয়। ফেব্রুয়ারির পর মার্চে বিরতি দিয়ে ৩০ এপ্রিল হত্যা করা হয় অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমানকে। এই হত্যাকা-ের এক মাস না পেরোতেই সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ খুন হন। আর শুক্রবার সর্বশেষ বাসায় প্রবেশ করে নিলয় চক্রবর্তী নীলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

সর্বক্ষেত্রেই দেখা গেছে উগ্র মৌলবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠী এই হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত। সবগুলো খুনের ধরনও একই।

অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অভিজিত রায়, ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দার, সিলেটের অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকা-ের ক্ষেত্রেও গলার উপরের অংশ, মুখ ও মাথা ছিল হামলাকারীদের লক্ষ্যবস্তু। এর আগে অধ্যাপক একেএম শফিউল ইসলাম লিলন, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ ও ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের ওপরও হামলা হয়েছিল একই কায়দায়। এদের মধ্যে কেবল আসিফই পরনে ভারি কাপড় চোপড় থাকায় বেঁচে যান। ওয়াশিকুর হত্যাকা-ের পর ঘটনাস্থল থেকে দুই মাদ্রাসাছাত্রকে ধরে পুলিশে দেয় জনতা। আর কোন ঘটনাতেই হামলার স্থলে থাকা কাউকে পুলিশ কখনও গ্রেফতার করতে পারেনি। ওয়াশিকুর হত্যার তদন্তে থাকা গোয়েন্দারা বলেছিলেন, জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ‘সিøপার সেলের’ পরিকল্পনাতেই তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে ওই হামলা হয়।

অভিজিত হত্যাকা-ের পর পরই ‘আনসার বাংলা সেভেন’ নামে একটি টুইটার এ্যাকাউন্ট থেকে দায় স্বীকার করে বার্তা দেয়া হয়েছিল। পুলিশের দাবি, ওই বার্তা আসলে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের। হত্যাকা-ের প্রায় দেড় মাস পর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) এক বিবৃতিতে অভিজিতকে হত্যার দায় স্বীকার করা হয়। বাংলাদেশে আল কায়েদার কোন সক্রিয় তৎপরতার খবর পাওয়া না গেলেও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠনটিকে অনুসরণ করে বলে পুলিশ মনে করছে।

গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের নাস্তিক আখ্যায়িত করে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের মার্চে ব্লগারদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। ওই বছরের অক্টোবরে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীকে গ্রেফতারের পর ঢাকার মোহাম্মদপুরে তার কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে ৮৪ জনের নামের একটি তালিকা পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ, যাতে হেফাজতের তালিকার অনেক ব্লগারের নামই ছিল। পুলিশের ধারণা, হত্যার উদ্দেশ্যেই ওই তালিকা তৈরি করে আনসারুল্লাহ। পরে মুফতি জসীমকে ব্লগার রাজিব হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ইতোমধ্যে এ মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। আসিফ মহিউদ্দিন, রাজিব হায়দার ও অভিজিত রায়ের সঙ্গে অনন্ত বিজয়ের নামও ছিল ওই তালিকায়।

অন্যদিকে দেখা যায়, জামায়াত-শিবির পরিচালিত একটি ফেসবুক গ্রুপ ‘বাঁশের কেল্লা’য় ৮৪ ব্লগারের একটি তালিকা প্রকাশ করে। তালিকা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কমিটি ১০ জনের প্রথম তালিকাটি করেছিল। তালিকা তৈরি করে চার ব্লগারকে গ্রেফতারের পরও হেফাজতে ইসলাম পূর্বনির্ধারিত ঢাকা অবরোধ কর্মসূচী ডেকে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পরে সরকারও তা শক্ত হাতে দমন করে। এতে হেফাজতের সঙ্গে সরকারের আর দরকষাকষির প্রয়োজন হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেয়া সংগঠন আনজুমানে আল বাইয়্যিনাতের তালিকায় রাজিব হায়দারের নাম ছিল। ওই তালিকা দেয়ার আগেই ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে হত্যা করা হয়। এরও আগে একই বছরের ১৪ জানুয়ারি তালিকায় নাম থাকা আরেক ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এরপর চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি তালিকায় থাকা মার্কিন প্রবাসী অভিজিত রায়কে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, যাদের নামও ছিল আনজুমানে আল বাইয়্যিনাতের তালিকায়।

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকার ব্লগার নীল হত্যাকা-ের পর বলেন, এখনও পর্যন্ত কোন ব্লগার হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। বিচার না হওয়ায় খুনীরা উৎসাহিত হচ্ছে। খুনের ধরন এবং যারা ব্লগারদের তালিকা দিয়েছে তারা সকলে পরিচিত, অথচ সকলে থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে কোন মূল্যে ব্লগারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। জানতে চাইলে বাংলাদেশ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ফোরামের সভাপতি কবীর চৌধুরী বলেন, একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ব্লগার হত্যাকা- ঘটাচ্ছে। অধিকাংশ ব্লগারের নীরবতা, অনৈক্য এবং বিলম্বিত বিচার ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে। বর্বর ধর্মান্ধ মহলকে কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি।