২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের সাড়া নেই

  • বাংলাদেশের প্রস্তুতি চূড়ান্ত

তৌহিদুর রহমান ॥ প্রায় আড়াই হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিলেও মিয়ানমারের কোন সাড়া নেই। দেশটি রোহিঙ্গা নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতির পর প্রায় এক বছর হতে চলল অথচ এখনও কোন উদ্যোগ নেয়নি। এদিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ অব্যাহত রয়েছে। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য জানায়।

সূত্র জানায়, গত বছর ৩১ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের অষ্টম বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে দুই হাজার ৪১৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় মিয়ানমার। তখন উভয় দেশের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল দুই মাসের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। তবে দুই মাসের মধ্যে যৌথ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনেকটাই পিছিয়ে যায়। এরপর গত বছর নবেম্বর মাসে বাংলাদেশ সরকার থেকে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। বাংলাদেশের কমিটির চূড়ান্ত তালিকা মিয়ানমার সরকারের নিকট পাঠানো হয়। বাংলাদেশ থেকে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরে মিয়ানমারের জবাবের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এখনও কোন সাড়া দেয়নি।

রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ ১০ সদস্যের কমিটির একটি গঠন করে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে প্রধান করে বাংলাদেশ অংশের এ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির তালিকা মিয়ানমার সরকারের নিকট পাঠানো হয়। এরপর মিয়ানমার সরকার থেকেও একটি কমিটির তালিকা পাঠানোর কথা। মিয়ানমারের কমিটির তালিকা পাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে যৌথ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। দুই দেশের যৌথ কার্যনির্বাহী কমিটি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম ধাপে কক্সবাজারের কুতুপালং ও নোয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত দুই হাজার ৪১৫ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার। তবে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে দুইটি দেশের পক্ষ থেকে পৃথক পৃথকভাবে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দুই দেশের কমিটি থেকে একটি যৌথ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। এ কমিটিই বাংলাদেশ থেকে এই আড়াই হাজার রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নেয়ার জন্য কার্যক্রম শুরু করবে। সে অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিটির প্রধানকে (আরআরআরসি) নিয়ে বাংলাদেশ অংশের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির তালিকা মিয়ানমারকে পাঠানোর পরে দেশটি আর কোন সাড়া দেয়নি। তাই কবে নাগাদ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনই কেউ বলতে পারছেন না।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা থেকে বাংলাদেশী নাগরিক উদ্ধারের পর বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো ও বিজিবি নায়েক আবদুর রাজ্জাককে আটকের ঘটনায় মিয়ানমার-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়। মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা থেকে অনেক রোহিঙ্গা নাগরিক উদ্ধারের পর তাদেরকেও বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে অভিহিত করে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশকে চাপ দেয় মিয়ানমার। তবে বাংলাদেশ সরকার থেকে বলা হয়, বাংলাদেশী নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পরেই তাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে। সে অনুযায়ী ধাপে ধাপে বাংলাদেশী নাগরিকদের ফিরিয়েও আনে সরকার। এছাড়া বিজিবি নায়েক আবদুর রাজ্জাককে আটকের ঘটনায় বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি চাপা পড়ে যাচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি এবং তাদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ দিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনকে তাগিদ দিয়ে আসছেন। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওবামা রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের আচরণের কড়া সমালোচনাও করেছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে কয়েকবার মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের প্রতি চাপ অব্যাহত রেখেছে। এদিকে বর্তমানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জোর করে বাঙালী হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য করা হচ্ছে। যারা স্বীকার করছেন না, তাদের আটক ও নির্যাতন করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের নাগরিকদের রোহিঙ্গার পরিবর্তে মিয়ানমার নাগরিক বলে সম্বোধনের সুপারিশ করেছে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সঙ্গে এ বাহিনীর সকল ক্যাম্প, সংস্থা, কমিটির ইত্যাদিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার নাগরিক হিসেবে লেখার সুপারিশ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এ প্রস্তাব দেয় বিজিবি।