২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যোগাযোগে ডিজিটাল এইজ

  • রেজা নওফল হায়দার

টেলিযোগাযোগ বলতে মূলত বোঝায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে দূরবর্তী কোন স্থানে সঙ্কেত তথা বার্তা পাঠানো। এই যোগাযোগ তারের মাধ্যমে অথবা তারবিহীন প্রযুক্তি ব্যবহার করেও হতে পারে। শুরুতে টেলিফোনই ছিল একমাত্র টেলিযোগাযোগ যন্ত্র। পরবর্তীতে তারবিহীন বার্তা প্রেরণ বা বেতার টেলিযোগাযোগ আবিষ্কার হয়েছে রেডিও যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বর্তমানে ইলেক্ট্রনিক ট্রান্সমিটারের ব্যবহার করে তড়িৎ চুম্বক তরঙ্গের সাহায্যে সংকেত পাঠান হলেও আগেকার যুগে ধোঁয়ার সঙ্কেত, ঢোল অথবা পতাকার মাধ্যমে সঙ্কেত পাঠানো হতো। বর্তমানে টেলিযোগাযোগ বিশ্বাব্যাপী বিস্তৃত এবং এ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত যন্ত্র যেমন টেলিফোন, রেডিও, টেলিভিশন এবং ওয়াকিটকি সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়। এসব যন্ত্রকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্ক রয়েছে। যেমন : পাবলিক টেলিফোন নেটওয়ার্ক, রেডিও নেটওয়ার্ক, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এবং টেলিভিশন নেটওয়ার্ক। ইন্টারনেটের মাধ্যমে একটি কম্পিউটারের সঙ্গে আরেকটি কম্পিউটটারের সংযোগ স্থাপনও একপ্রকার টেলিযোগাযোগ।

টেলিযোগাযোগে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ॥ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার মূল অংশগুলো হলো তিনটিÑ

এটি বার্তাকে প্রচার উপযোগী সঙ্কেতে পরিণত করে। যার মধ্য দিয়ে সঙ্কেত বা সিগনাল পাঠানো হয়। যেমন : বায়ু। এটি সঙ্কেত গ্রহণ করে এবং সঙ্কেতকে ব্যবহারযোগ্য বার্তায় পরিবর্তন করে।

উদাহারণস্বরূপ বেতার সম্প্রচারের কথা বলা যায়। এই ক্ষেত্রে, সম্প্রচার টাওয়ারটি হলো ট্রান্সমিটার, রেডিও হলো রিসিভার এবং প্রচার মাধ্যম হলো শূন্যস্থান। অনেক ক্ষেত্রেই টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা উভয়মুখী যোগাযোগ রক্ষা করে এবং একই যন্ত্র ট্রান্সমিটার ও রিসিভার হিসেবে কাজ করে। এগুলোকে বলা হয় ট্রান্সিভার। যেমন : মোবাইল ফোন একটি ট্রান্সিভার। ফোনের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগকে বলা হয় পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট যোগাযোগ, কারণ এ ক্ষেত্রে একটি মাত্র ট্রান্সমিটার ও রিসিভারের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে। বেতার সম্প্রচারের মাধ্যমে টেলিযোয়াযোগকে বলা হয় ব্রডকাস্ট (সম্প্রচার) যোগাযোগ, কারণ এ ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ট্রান্সমিটার ও অসংখ্য রিসিভারের মধ্যে সংযোগ ঘটছে।

সিগনাল এনালগ ও ডিজিটাল দু’ধরনের হতে পারে। এনালগ সিগনালের ক্ষেত্রে তথ্যের পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে সঙ্কেতের শক্তি ক্রমাগত পরিবর্তন করা হয়। ডিজিটাল সিগনালের বেলায় তথ্যকে কিছু নির্দিষ্ট মানের (যেমন, ০ এবং ১) সমন্বয়ে সঙ্কেতে পরিণত করা হয়।

পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত একগুচ্ছ ট্রান্সমিটার, রিসিভার বা ট্রান্সিভারের সমন্বয়ে গঠিত হয় নেটওয়র্ক। ডিজিটাল নেটওয়র্কে এক বা একাধিক রাউটার থাকে যার কাজ হলো একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর কাছে তথ্য পাঠানো। এনালগ নেটওয়র্কে এক বা একাধিক সুইচ থাকে যা দুই বা ততধিক ব্যবহারকারীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। দুই ধরনের নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেই বহু দূরে সিগনাল পাঠাতে রিপিটার প্রয়োজন হয় যাতে দুর্বল এনালগ সিগনালকে এম্পলিফাই করে শক্তিশালী এবং বিকৃত ডিজিটাল সিগনালকে পুনর্গঠন করা যায়। অনাকাক্সিক্ষত কোন শব্দ যাতে সিগনালকে বিকৃত করতে না পারে সেজন্য এ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

চ্যানেল হলো এক ধরনের প্রচারমাধ্যম যার মধ্য দিয়ে একই সময়ে একাধিক তথ্য প্রবাহ পাঠানো যায়। যেমন : একটি বেতার কেন্দ্র ৯৬ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গে, আবার আরেকটি বেতার কেন্দ্র একই সময়ে ৯৪.৫ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মাধ্যমকে তরঙ্গ কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি অনুসারে বিভক্ত করা হয়েছে এবং এক একটি বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য এক একটি ফ্রিকোয়েন্সি নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আবার সম্প্রচারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করেও একটি চ্যানেল নির্দিষ্ট করা যায়।

তথ্য বা ইনফরমেশন পাঠানোর উদ্দেশে সিগনালের আকার পরিবর্তন করার পদ্ধতিকে বলা হয় মডুলেশন (উপযোজন)। মডুলেশন হলো টেলিযোগাযোগ ব্যাবস্থার প্রাণ। একটি সিগনালে উপস্থিত তথ্য আরেকটি সিগনালের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য সর্বদাই মডুলেশন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। মডুলেশন ব্যবহার করা হয় সিগনালের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানোর জন্য। কারণ বায়ু মাধ্যমে নিম্ন কম্পাঙ্কর সিগনাল খুব বেশি দূরে পাঠানো সম্ভব নয়। তাই সিগনাল পাঠানোর পূর্বে একে উচ্চ কম্পাঙ্কের আরেকটি সিগনালের ওপর স্থাপন করা হয়। এটি করা হয় মূল সিগনালে বা ইনফরমেশন সিগনালে অবস্থিত তথ্য অনুসারে উচ্চ কম্পাঙ্কের সিগনালের কম্পাঙ্ক, বিস্তার অথবা দিক পরিবর্তনের মাধ্যমে। সাধারণত মূল সিগনালের বিস্তারের পরিবর্তনের মধ্যে তথ্য উপস্থিত থাকে। উচ্চ কম্পাঙ্কের সিগনালটিকে বলা হয় বাহক সিগনাল বা ক্যারিয়ার সিগনাল। মিশ্র সিগনালটিকে বলে মডুলেটেড সিগনাল।

মডুলেশন এনালগ ও ডিজিটাল দুই প্রকার হতে পারে। ইনফরমেশন সিগনাল অনুসারে বাহক সিগনালের কোন বৈশিষ্ট্যটি পরিবর্তিত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে এনালগ মডুলেশন কয়েক প্রকার হতে পারে।

মূল সিগনালের বিস্তারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি বাহক সিগনালের বিস্তার পরিবর্তিত হয়।

সিগনালের বিস্তার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাহক সিগনালের কম্পাঙ্ক পরিবর্তিত হয়ে যায়।

সিগনালের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাহক সিগনালের দিক পরিবর্তিত হয়। এটিও এক প্রকার কম্পাঙ্ক উপযোজন পদ্ধতি।

তিনটি মডুলেশন প্রক্রিয়াই এনালগ সিগনালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদি একটি মূল এনালগ সিগনাল থেকে নির্দিষ্ট সময় পর পর নমুনা সংগ্রহ করা হয় এবং সেই নমুনায় সিগনালের বিস্তারের মাত্রাকে ডিজিটাল সংখ্যায় রূপান্তর করা হয় তবে তাকে ডিজিটাল সিগনাল বলা হয়।ডিজিটাল তথ্যকে এনালগ তরঙ্গ আকারে উপস্থাপন করতে মডুলেশন করা হয়। একে বলা হয় ‘কিয়িং’। বিভিন্ন ধরনের কিয়িং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, যেমন- ফেজ শিফ্ট কিয়িং, এম্পলিচ্যুড শিফ্ট কিয়িং, মিনিমাম শিফ্ট কিয়িং। ব্লুটুথ প্রযুক্তিতে দুটি যন্ত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে ফেজ শিফ্ট কিয়িং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়।মানুষের কণ্ঠস্বরের ওপর উপযোজন করা হয় কম্পাঙ্ক সাধারণত ৩০০-৩৪০০ ঐু-এর মাঝে। এই কম্পাঙ্কের শব্দ খুব বেশি দূরে থেকে শুনতে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যদি মানুষের এই কম্পাঙ্কের কথা একটি ৯৬ মেগাহার্টজ কম্পাঙ্কের বাহক সিগনালের তবে তা দূরে প্রেরণ করা সম্ভব হয়। এভাবেই বেতার সম্প্রচার করা হয়ে থাকে।