২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিলুপ্তির পথে মিঠা পানির ॥ ৫৪ প্রজাতির মাছ

  • রফতানিতে মাছ এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত

এ্যালং মাছের তেলানি, দাড়কে মাছের গাবানি, বউ মাছের ফুটানি, ভ্যাদা মাছের বিতলামি, চ্যাঙ মাছের লাফানি, কাঁকলে মাছের ঠাঁটানি, ট্যাপা মাছের ঘুরানি... মিঠা ও স্বাদু পানির এসব মাছ নিয়ে কত যে ছন্দ তৈরি করা হতো। সেই মাছ আর চোখে পড়ে না। মাছে ভাতে বাঙালীর পরিচয়ের সঙ্গে মানুষের শারীরিক ও আত্মপ্রকাশের বিষয়গুলো কখনও মাছের সঙ্গে তুলনা করা হতো। যেমন হালকা পাতালা গড়নের কাউকে দেখলে বলা হতো পাতাসি। ঘুমের ঝিমুনি ভাব দেখলে পিন করা হতো ট্যাংরা মারছে। বোকার মতো হা-করে তাকিয়ে থাকা দেখলে সম্বিত ফেরানো হতো বেদা ডাক দিয়ে। কারও অস্থিরতার সময় উপমায় আসত মাগুর মাছ। কেউ প্যাঁচ দিয়ে কথা বললে কটাক্ষ করে গচি মাছকে টেনে আনা হতো। বোয়াল মাছকে নিয়ে প্রবাদ আছে শুদ্ধির। গজার ও শোল মাছের চোখ দেখে বলা হতো ভয়ের মাছ, কেউ বলত জিন-ভূত। মাছ নিয়ে গল্পকথার শেষ নেই। চিরচেনা সেসব মাছের বেশিরভাগই আর চোখে পড়ে না।

মাঝনদীতে জেলেদের জালে বিপন্ন ও বিলুপ্ত মাছের কিছু কালেভদ্রে ধরা পড়ে। বাজারে এসব মাছের দামও চড়ে ওঠে। এরই মধ্যে এবারের মৎস্য সপ্তাহে সরকারের মৎস্য বিভাগ একটি খুশির খবর দিয়েছে তা হলোÑ বিপন্ন হয়ে অবলুপ্তির পথে যাওয়া মিঠা বা স্বাদু পানির ৫৪ প্রজাতির মাছের মধ্যে বর্ষা ও প্রজনন মৌসুমে উন্মুক্ত মৌসুমী জলাশয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে ৩২ প্রজাতির মাছকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এবারের বর্ষা মৌসুমে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সরপুঁটি, কৈ, গুজি, বাইন, পুঁটি, গোলসা, বউ, চেলা, বেলে, ফলি, পাবদা, কানছ (শিং) মাগুর, বেদামাছ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। ট্যাংরা, খোকশা, কালাবাটা, ঢেলা, মওয়া, লটা, শোল, বাইন, চান্দা, তিলপুঁটি, ফলই, কালবাউশ, গুইজা, একঠোটা ঘাউরা ইত্যাদি মাছের অনেক জাত আর নেই। বড় মাছের মধ্যে রুই, কাতলা, পাঙ্গাশ, বোয়াল, মৃগেল, আইড়, চিতল শোল, গজার, বাঘাইর মাছগুলোর দেশী জাতের চাষ হচ্ছে। এর সঙ্গে বিদেশ থেকে আসা জাতগুলোর মধ্যে আছে সিলভারকার্প, গোল্ডকাপর্, মিররকার্প, গ্লাসকার্প, বিগহেড, নাইলোটিকা, থাই কৈ, ভিয়েতনামী কৈ, তেলাপুয়ে, ব্লাককার্প কমনকার্প জাতের মাছগুলো বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করে অল্পসময়ে অধিক উৎপাদন মেলে। এর বাইরে একক প্রজাতির মাছের মধ্যে ইলিশের উৎপাদনের আলাদা হিসাব আছে। বিশেষায়িত মাছের মধ্যে চিংড়ির দুই জাত বাগদা ও গলদা হিমায়িত প্যাকেটজাত হয়ে রফতানির সিঁড়িতে অনেক আগেই উঠেছে। সূত্র জানায় প্রবাসী বাঙালীদের দাবির মুখে বর্তমানে চিংড়ি ও ইলিশসহ সকল জাতের মাছই রফতানি হচ্ছে। দেশে রফতানির খাতে গার্মেন্টের পরই মাছ এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত। এবারের মৎস্য সপ্তাহে ঘোষণা দেয়া হয় ২০২১ সালের মধ্যে দেশে মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে মাছের চাহিদা সম্পূর্ণ মিটিয়ে বাড়তি মাছ চলমান প্রক্রিয়ায় বিদেশে রফতানি হবে। মৎস্য অধিদফতরের বিভাগীয় উপ-পরিচালক এ এস এম রাশেদুল হক জানান, দেশে মাছের উৎপাদন বছরে ৩৬ লাখ টন। একক প্রজাতির ইলিশের উৎপাদন সাড়ে তিন লাখ টন। ইলিশ চিংড়ি কাঁকড়া এবং স্বাদু পানির কিছু মাছ মিলিয়ে ৭৭ হাজার তিন শ’ ২৮ টন মাছ রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রায় পাওয়া গেছে ৪ হাজার আট শ’ ৯৮ কোটি টাকা। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আয় হয়েছে ৪ হাজার তিন শ’ ৫০ কোটি টাকা। মাছ রফতানি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, ইটালি, মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরব, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোতে। দেশে মিঠা পানির মাছের প্রজাতি ২৬০টি। সামুদ্রিক প্রজাতি চার শ’ ৭৫টি। তবে স্বাদু পানির মাছের অভয়ারণ্য যেভাবে তৈরি করা গেছে সামুদ্রিক জলাশয় সেভাবে তৈরি হয়নি। আশা করা হয়েছে আগামী দু’ বছরের মধ্যে ২৪ প্রজাতির সামুদ্রিক চিংড়িসহ সামুদ্রিক মাছের অনেক প্রজাতির উৎপাদন বাড়ানো যাবে। এই লক্ষ্যে সমুদ্রে মাছ চাষের গবেষণার জন্য বিশেষ ধরের জাহাজ ও ট্রলার আমদানি করা হচ্ছে। মাছের চাহিদা বছরে প্রতিজনের চাহিদা ২১ দশমিক ৯০ কেজি করে। সেখানে বর্তমানে প্রতিজনে মিলছে ১৯ দশমিক ৩০ কেজি করে। ক্রমান্বয়ে এই ঘাটতি মিলিয়ে ২০২১ সালের মধ্যে উৎপাদন ৪৫ দশমিক ৫৬ লাখ টনে পৌঁছবে। ওই সময়ে বাড়তি জনসংখ্যার চাহিদা সম্পূর্ণ মিটিয়ে বড় একটি অংশ রফতানি করা যাবে। প্রচলিত মাছের রফতানি কমিয়ে অপ্রচলিত মাছ যেমন কাঁকড়া, কুঁচা গজার চ্যাং ইত্যাদি মাছগুলো রফতানির তালিকায় বেশি যোগ হবে। মৎস্য বিভাগ জানায় দেশী মাছ কমে যাওয়ার কারণগুলো উদ্ঘাটিত হয়েছে। বদ্ধ জলাশয়, আধাবদ্ধ জলাশয় উন্মুক্ত জলাশয় ও সামুদ্রিক জলাশয় এই চার শ্রেণীর জলাশয়কে কয়েক ভাগে ভাগ করে মাছ চাষে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। মৎস্য বিভাগর হিসাবে দেশে বদ্ধ জলাশয় বা পুকুরের পরিমাণ তিন লাখ ৭১ হাজার তিন শ’ ৯ হেক্টর। মৌসুমী জলাশয় এক লাখ ৩০ হাজার চার শ’ ৮৮ হেক্টর, বাঁওড় পাঁচ হাজার চার শ’ ৮৮ হেক্টর, চিংড়ির খামার দুই লাখ ৭৫ হাজার দুই শ’ ৭৪ হেক্টর, প্লাবণ ভূমি ৬ হাজার সাত শ’ ৭৫ হেক্টর। এর সঙ্গে সামুদ্রিক হিসাব রয়েছে। দেশের চলনবিল এক সময় ছিল মাছের বড় আঁধার। বর্তমানে চলনবিলের অনেকটা শুকিয়ে গেছে। চলনবিলকে দেখে মনে হতো এ যেন বড় কোন নদী। চলনবিলের আয়তন ছিল এক হাজার দুই শ’ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে বিল শুকিয়ে প্রায় তিন শ’ বর্গকিলোমিটারে ঠেকেছে। এই বিলের অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করেছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের থাবায় বড় ও মাঝারি নদীগুলো শুকিয়ে খাঁ খাঁ হয়ে যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র যমুনা বাঙালী নদীর মাছের স্বাদই আলাদা। মাছের রাজা পদ্মার ইলিশের স্বাদ একেবারে রাজকীয়। পদ্মার ইলিশের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এতটাই জনপ্রিয় যে এই মাছ খেয়ে তারা গর্ববোধ করে। দেশের বাজারেও যারা একবার পদ্মার ইলিশ রান্না করেছে তারা মেঘনার ইলিশের স্বাদ তুলনা করে। পদ্মা হোক মেঘনা হোক ইলিশের দাম দিনে দিনে গগনচুম্বি হচ্ছে। কেবল ইলিশের মৌসুমে দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। বর্তমানে ইলিশের বাচ্চা (জাটকা) নিধন কঠিনভাবে দমন করা হয়েছে। ফলে সাধারণের পাতে ইলিশের টুকরো পড়ছে। সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে ছোট মাছ প্রাপ্তি। একটা সময় বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বেড়ে গেলে স্রোতের অনুকূলে চাঁই বা দাড়কি বসিয়ে ছোট মাছ ধরা হতো। কখনও নৌকায় লতাপাতাসহ গাছের ডাল ভরে রাতভর ডুবিয়ে রেখে পরদিন তুলে নানা জাতের মাছ মিলত। তউরা জাল ও খেয়াজালেও মাছ ধরা হতো। পানি কমে গেলে দলবেঁধে পলো দিয়ে মাছ ধরার আনন্দ ছিল আলাদা। অনেক সময় পলোর মধ্যে হাত ঢুকিয়ে মাছ বের করার সময় বাইন মাছ মনে করে ঢোঁড়া সাপও উঠে আসত। বড় মাছের তরকারির চেয়ে ছোট মাছের চর্চরির স্বাদই ছিল মজার। একজন মৎস্যজীবী জানালেন চিংড়ি মাছকে মাছ বলা হয় ঠিকই তবে তা পানির এক ধরনের পোকা। আবার কাঁকড়া মাছের শ্রেণীভুক্ত। বিদেশে কাঁকড়া মাছ হিসেবেই রান্না হয়। আবার গালফোলা ট্যাপা মাছ খাওয়া হয় না। এই ট্যাপা মাছের কদর বিদেশে আছে। গায়ে নানা রঙের ডোড়াকাটা মাছ দেখে কে যে কখন বউমাছ নাম দিয়েছে তা আজও বউ মাছ হয়েই আছে। ছেলেবেলায় এই মাছ খাওয়ার জন্য ভাইবোনে যে কত বাগবিত-া হতো যা দেখে মা বেকায়দায় পড়ে যেতেন। আজ যারা প্রবীণ তারা এমন বউমাছ কালেভদ্রে দেখলে নস্টালজিক হয়ে পড়েন।

-সমুদ্র হক, বগুড়া থেকে