২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাজার দখল করেছে চাষের মাছ

নদী ও খালের অঞ্চল বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে প্রাচীণকাল থেকেই দেশী প্রজাতির মৎস্য ভা-ার হিসেবে খ্যাতি ছিল। কিন্তু সময়ের ঘূর্ণিপাকে আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে। মানুষ বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছের প্রজননকাল চৈত্র-বৈশাখ মাসে পুকুর-জলাশয় সেচ করে ডিমওয়ালা মাছসহ সকল মাছ শিকারের মহোৎসব, বিদেশী মাছের চাষ, পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি, জলাশয় পুকুর ভরাট ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিভিন্ন জলাশয় থেকে আজ একের পর এক দেশী প্রজাতির মাছ বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে। ফলে দিনে দিনে মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত গোটা দক্ষিণাঞ্চলে দেশী মাছের আকাল দেখা দিয়েছে।

এককালের চিরচেনা শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, পুঁটি, দারকিনা, পাবদা, বোয়াল, চিতল, রিঠা, বাইন, শোল, গজার, নিন্দাল, টাকি, ডানকিনে, খৈলশে, বাটা, কালিবাউশ, ঢেলা, আইড়, টেংরা, শালবাইন, কানিপাবদা, মধুপাবদা, পাবদা, চেকা, তিতপুঁটি, আইড়, তারাবাইন, ফলি, বামোশ, টাটকিনি, কাজুলি, গাং মাগুর, লাউয়া, নামাচান্দা, ঘাউড়া, পাঙ্গাশ, নান্দিনা, টিলাশোল, সরপুঁটি, মহাশোল, চান্দা, চেলা, ইচা, মেনিসহ অন্যান্য মাছ বংশবিস্তার করতে পারছে না। বর্ষাকালে নির্বিচারে যত্রতত্র জেলেরা ডিমওয়ালা মাছ ধরার ফলেও মাছের বংশবিস্তারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া জমিতে রাসায়নিক সার ও অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, শিল্প কারখানার বর্জ্যতে পানি দূষণ, প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে একাধিক খাল, বিল, পুকুর, ডোবা-নালা সেচের মাধ্যমে ডিমওয়ালা মাছসহ বিভিন্ন প্রকারের মাছ শিকার করা হয়। যে কারণে বংশ বিস্তার করতে না পারায় গোটা দক্ষিণাঞ্চল থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে দেশী প্রজাতির মাছ।

দক্ষিণাঞ্চলে মেঘনা, কালাবদর, জয়ন্তী, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, পয়সারহাট, পালরদী, নয়াভাঙ্গনী, মাছকাটা, লতা, আইরখালী, পায়রা, ভাসানচর, বাগরজা, শিন্নিরচর, তেঁতুলিয়া, বাকেরগঞ্জের তুলাতলা, তা-ব, খয়রাবাদ, বেবাজ, কাতিভাঙ্গা, রাঙ্গামাটি তুলাতলী নদীসহ সর্বত্র অসংখ্য পুকুর, ডোবা-নালা ও খালবিল থাকলেও তাতে আগের মতো দেখা মিলছে না দেশী প্রজাতির মাছ।

বিলুপ্ত দেশী মাছ : দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ২৬০ থেকে ২৭০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। এর মধ্যে সুস্বাদু অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক মাছ বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ৫৪ প্রজাতির দেশী মাছ চরম বিপন্ন। সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে ১২০ প্রজাতির মাছ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগৃহীত তথ্য ও গবেষণা মতে, বিপন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা আরও বেশি। এর সংখ্যা শতাধিক হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা ৫৪ প্রজাতির মাছকে বিপন্ন ঘোষণা করেছে। বিপন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে ডানকিনে, চিতল, টিলা, খোলশে, বাটা, কালিবাউশ, ঢেলা, আইড়, টেংরা, শালবাইন, কানিপাবদা, মধুপাবদা, পাবদা, চেকা, কৈ, গজার, তিতপুঁটি, আইড়, তারাবাইন, ফলি, বামোশ, টাটকিনি, কাজুলি, গাং মাগুর, মেনি, টাকি, লাউয়া, নামাচান্দা প্রভৃতি। এছাড়া চরম বিপন্ন প্রজাতি মাছের মধ্যে রয়েছে, রিঠা, ঘাউড়া, পাঙ্গাশ, বাটা, নান্দিনা, টিলাশোল, সরপুঁটি, মহাশোল, চান্দা, চেলা প্রভৃতি।

চাষের মাছে বাজার দখল : নগরীর পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির নামে কৈ, তেলাপিয়া, মাগুর, পাঙ্গাশ, কোরাল এমনকি রিঠা মাছও উৎপাদন হচ্ছে। কোন স্বাদ না থাকলেও এখন মানুষ এসব মাছ খেতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এ মাছের নামের পূর্বে যুক্ত হয়েছে চাষের মাছ। চাষের কৈ মাছ থেকে শুরু করে চাষের পাঙ্গাশ মাছ পর্যন্ত এ অঞ্চলের মানুষের নিয়মিত খাদ্য তালিকায় এখন স্থান করে নিয়েছে। সূত্রে আরও জানা গেছে, একসময় দক্ষিণাঞ্চলবাসীর চাহিদা মিটিয়ে মিঠা পানির সুস্বাধু মাছ ট্রাক ভর্তি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। এখন সেখানে মাছের চাহিদা পূরণ করতে প্রতিদিন ময়মনসিংহ ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাষের মাছ এখানকার বাজারে বিক্রির জন্য ট্রাকভর্তি করে আনা হচ্ছে।

-খোকন আহম্মেদ হীরা

বরিশাল থেকে