১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যমুনার পাঙ্গাশ এখন আর বাজারে ওঠে না

যমুনার পাঙ্গাশ আর চলনবিলের কৈ, মাগুর শোল, গজার ও পাবদা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে কলকাতার বাবুদেরও রসনা মিটিয়েছে। একদা মাছের গুঁতোয় যেখানে নৌকা ডুবত, সেই চলনবিলে এখন মাছের আকাল, অনেক প্রজাতির মাছই এখন বিলুপ্তির পথে। সেই পাঙ্গাশ এখন আর পাওয়া যায় না। মাছের অভয়াশ্রমও কমে গেছে। যমুনার পাঙ্গাশ এখন শুধুই স্মৃতি। চলনবিল এবং যমুনা নদীর ৫২ প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্ত। ৮০ প্রজাতির মাছ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বিপন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যেরয়েছে- ঢেলা, মলা, দারিকা, শবন, খরকি, বৌ, সাকোজ, গজার, শোল, মহাশোল, পুঁটি ও সরপুটি। বিলুপ্ত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে- চ্যাং, ঘুটেটেংরা, নন্দই, শিলং, বাচা ও ফলিসহ পঞ্চাশ প্রজাতির মাছ। জেলা মৎস্য অফিসসহ বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

মাছে ভাতে বাঙালীর সেই প্রবাদ এখন আর খাটে না। নদী-নালা, খাল-বিল বছরের বেশিরভাগ সময়ই পানিশূন্য থাকায় প্রকৃতিগতভাবে মাছ উৎপাদন কমে গেছে। যমুনার পাঙ্গাশ বলে যে মাছের জৌলুস ছিল তা প্রায় ১৫ বছর আগেই হারিযেছে। যমুনা ও পদ্মার মিলনস্থল সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার শেষ সীমানায় যমুনা নদীতে বিশাল আকারে কোল বা মাছের অভয়াশ্রম ছিল। সেই অভয়াশ্রমে প্রতিবছর চৈত্র মাসে একবার ঘেরজাল দিয়ে মাছ ধরা হতো। সেই মাছ ধরে জেলার সরকারী-বেসরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং জেলার বাইরে অবস্থানরত আত্মীয়-স্বজনের রসনা তৃপ্ত হয়েছে। কলকাতায় চালান হয়েছে। এখন সেই অভয়াশ্রমে আর মাছ পাওয়া যায় না। কারণ পানি নেই। প্রকৃতিগতভাবেই উৎপাদন কমেছে। একই অবস্থা বৃহত্তর চলনবিলেরও। সিরাজগঞ্জ, পাবনা এবং নাটোর জেলার ৯ উপজেলা সমন্বয়ে বৃহত্তর চলনবিলের অবস্থান। এই চলনবিলের মাছ এক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও কলকাতায় চালান হতো। এজন্য ব্রিটিশ আমলেই সিরাজগঞ্জ-ঈশ্বরদী রেলপথেরে উল্লাপাড়া, লাহিড়ী মোহনপুর, বিলপাশার শরঃনগর ও ভাঙ্গুড়ায় রেলওয়ে স্টেশন স্থাপন করা হয়। চলনবিলের এই তাজা মাছ সকালে এসব স্টেশন থেকে চালান হয়ে রাতে পৌঁছাত কলকাতায়। সেই মাছ দিয়ে কলকাতার সাহেবরা রাতের খাবার খেয়েছেন। তবে এখন সেই রেওযাজের উল্টো পথ সৃষ্টি হয়েছে। এখন আর কলকাতায় নয়- এখন মাছ চালান হয় সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল- বনপাড়া-নাটোর মহাসড়কের তাড়াশ সীমানার মহিষলুটি থেকে। উত্তরের পাবনা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নাটোর জেলার যাত্রীরা যারা ভোরে কিংবা সন্ধ্যায় এই সড়ক দিয়ে বাসে বা কোচে চলাচল করেন, তারা মাছ কিনে নিয়ে যান, তাদের গন্তব্য, ঢাকা অথবা চট্টগ্রামে কিংবা সিলেটে। বর্ষায় ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা চলাচল ছিল দুরূহ। কারণ রুই, কাতলা, বোয়াল, চিতল, গজার শোল মাছের ঝাঁকের সামনে নৌকা পড়লেই সেই নৌকা ডুবে যেত। সেই চলনবিল এবং যমুনা প্রায় পানিশূন্য।

বর্ষা এলেই চলনবিল অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ডিমওয়ালা মা মাছ নিধন শুরু হয়। খাল-বিলে মা মাছ নিধন করলেও দেখার কেউ নেই। এ বছরও বর্ষার শুরুতেই দেশীয় মাছের জন্য বিখ্যাত মিঠা পানির সুস্বাদু মাছ উৎপাদনের জলাভূমি বৃহত্তর চলনবিলে ইতোমধ্যে মা মাছ ধরা শুরু হয়েছে। এ বছর বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় খাল, বিল, ডোবা, নালা ভরে গেছে। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস মাছের প্রজননকাল। বর্তমান চলনবিলে দেশী প্রজাতির ডিমওয়ালা মাছ বোয়াল, শোল, কই, মাগুর, পুঁটি, টাকি, টেংরা,বাতাসি, গুচি, বাইন, চিংড়িসহ প্রায় ৫০ প্রজাতির দেশী মাছের পেটে ডিম ভরা। আর এ সময় অসাধু কিছু মাছ শিকারি চলনবিলের খাল, বিল, ডোবা, নালায় বাদাইজাল, জালি, হেসী, খরা, বাসন, ধুন্ধি, কইজাল, মইজাল, এমন কি নিষিদ্ধ কারেন্টজাল দিয়েও ডিমওয়ালা মা মাছ নির্বিচারে নিধন করছে।

-বাবু ইসলাম, সিরাজগঞ্জ থেকে