২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাছের রাজা ইলিশের ভিন্নতা স্বাদে

জাতীয় মাছ ইলিশ। অনাদিকাল থেকে ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। যে কয়েক’টি মাছ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে ইলিশ তার অন্যতম। এর অর্থনৈতিক অবদানও নিঃসন্দেহে অনেক। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে গড়ে প্রায় চার লাখ টন ইলিশ আহরণ হয়ে আসছে। যার সর্বনিম্ন বাজার দর ১৭ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা। দেশের মোট মৎস্য সম্পদের মাঝে ইলিশ শতকরা ১১ ভাগ স্থান দখল করে আছে। ইলিশ আহরণের সঙ্গে দেশের ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। পরোক্ষভাবে জড়িত মানুষের সংখ্যাও নিহায়েত কম নয়।

ইলিশ মূলত সমুদ্রের মাছ। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে এর বিচরণ। পৃথিবীর ৬০ ভাগেরও বেশি ইলিশ আহরণ হয় বঙ্গোপসাগর থেকে। বাকি ইলিশ আহরিত হয় ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারসহ অন্যান্য দেশ থেকে। মাছের রাজা ইলিশ স্বাদের দিক থেকে অনন্য হলেও সব মাছে একই ধরনের স্বাদ মেলে না। লোনাপানি ছেড়ে মিঠাপানিতে বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে যখন আসে, তখন তা স্বাদে ভরপুর হয়ে ওঠে। আবার সব নদ-নদীর মাছ একই স্বাদের নয়। এরও আছে রকমফের। যেমন পদ্মার ইলিশের সুখ্যাতি পৃথিবী জোড়া। মেঘনা, বুড়াগৌরাঙ্গ, যমুনা, পায়রা, আন্ধারমানিক, তেঁতুলিয়া, রামনাবাদ, কীর্তনখোলাসহ আরও কয়েকটি নদ-নদীর মাছের স্বাদও একেবারে কম নয়। আবার গোত্র ভেদেও ইলিশ স্বাদের ভিন্নতা আছে। মাৎস্য বিজ্ঞানীরা এর আকার-আয়তন, বিচরণ, খাদ্য গ্রহণ ও স্বাদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র বিবেচনা করে ইলিশকে কয়েকটি গোত্রে ভাগ করেছেন। যেমন এর শীর্ষে আছে পদ্মা ইলিশ। মূলত পদ্মা ইলিশই বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এটি স্থানীয়ভাবে ইলিশ, ইলসা, হিলসা ও জাতি ইলসাসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত। এটি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। বঙ্গোপসাগর, ভিয়েতনামের উপকূল ও পশ্চিমে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত এর বিচরণ। বর্তমানে পদ্মা ইলিশ নদী ও মোহনাগুলোতে প্রচুর মিলছে। এর ওজন সর্বোচ্চ আড়াই কেজি, লম্বায় সাধারণত ৩০ থেকে ৩৬ সেন্টিমিটার হয়। এ মাছের পিঠের দিক নীল। দু’পাশ ও পেট রুপালি রঙের। পার্শ্বদেশে অনেকগুলো কালচে ডোরা থাকে তবে আকারে বড় হলে তা মিলিয়ে যায়। এর পায়ু পাখনার রঙ হলদে। স্বাদে অপূর্ব।

ইলিশের আরেকটি গোত্র হচ্ছে চন্দনা ইলিশ। এর স্থানীয় নাম ইলসা ও উলি ইলিশ। এর দেহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ এটি লম্বায় অনেক বড় হয়। গভীরতার তুলনায় সাড়ে তিনগুণ পর্যন্ত লম্বা হয়। মাথার সামনের দিক কিছুটা সরু। এটি চেনার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে এর আঁশ বড় এবং সারি দিয়ে সাজানো। এর আবাস উত্তরে হংকং পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মোহনায় সবচেয়ে বেশি মেলে। এর স্বাদ পদ্মা ইলিশের তুলনায় অনেক কম। গুর্তা ইলিশ স্থানীয়ভাবে কানাগুর্তা বা কাটা ইলিশ হিসেবে পরিচিত। এটি চেনার সহজ উপায় হচ্ছে দেহ অত্যন্ত চাপা এবং বেশ মোটা। উপরের চোয়াল নিচের চোয়ালের চেয়ে লম্বা। এর আঁশ বেশ শক্ত। পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত এর দেখা মেলে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদীসহ উপকূলের মোহনাগুলোতে এর বিচরণ সবচেয়ে বেশি। এটি গ্রীষ্মকালেও মেলে। এর স্বাদ ও গন্ধ অনন্য।

ইলিশের রকমফের যেমনই হোক-পিয়াজ ইলিশ, ভাপা ইলিশ, সরষে ইলিশ, ইলিশ পাতুরি, কড়কড়ে ইলিশ ভাজা, ইলিশ পোলাও- হরেক পদের রান্না, হরেক রকম স্বাদ। এক পদের তুলনা হয় না অন্য পদের সঙ্গে। সব পদই স্বাদে গুণে অসাধারণ। অন্য কোন মাছ ইলিশের কাছে পাত্তাই পায় না। ইলিশের সুঘ্রাণ শুধু বাঙালীকে নয়, ‘ভূত’কেও নাকি পাগল করে দেয়। তাইতো এখনও সূর্য ডোবার পরে গাঁয়ের নির্জন রাস্তায় অনেকেই ইলিশ নিয়ে ফিরতে ভয় পায়; রাতে বাড়ি ফেরার পর ইলিশের গায়ে কুপির আগুন ছুঁইয়ে ‘আছর’ দূর করার রীতি এখনও বহাল আছে। ইলিশ ছাড়া জামাইষষ্ঠী ভাবাই যায় না। অতিথি আপ্যায়নে ইলিশের তুলনা মেলা ভার। আর এসব কারণেই ইলিশ শুধু মাছের রাজা নয় মহারাজা।

-শংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে