২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাতের আঁধারে চলছে লেক দখলের প্রতিযোগিতা

  • একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে গুলশান লেক

আনোয়ার রোজেন ॥ গুলশান ৩২ নম্বর সড়কের লেক পাড়। নক্সা অনুযায়ী লেকের পাড় ঘেঁষে ওয়াক ওয়ে (হেঁটে চলার পথ) থাকার কথা। অথচ স্তূপীকৃত ময়লা-আবর্জনার দরুন সেখানে দু দ- দাঁড়ানোর উপায়ই নেই! সামনেই লেকের আরেকটি অংশে ফেলা হয়েছে ভারি বস্তা। বস্তাগুলো লেকের ভেতর কেন ফেলা হয়েছে এবং কে বা কারা কখন তা ফেলেছে স্থানীয় বাসিন্দারা তা জানেন না। তবে জানা গেছে, ‘দখল প্রক্রিয়ার’ অংশ হিসেবে রাতের আঁধারে লেকের মধ্যে বস্তা ও ময়লা আবর্জনা ফেলা হয়। আর এভাবেই দখলে-দূষণে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে গুলশান লেক। প্রতিদিনই টনে টনে ময়লা পড়ছে লেকের জলে। অন্যদিকে রাতের আঁধারে চলছে লেক দখলের প্রতিযোগিতা। মাঝে-মধ্যে উদ্ধার কাজ চললেও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না দখল ও দূষণের তা-ব। লেকটির দেখভালের দায়িত্ব রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। তবে লেক সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলা, লেকের উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, নিজস্ব কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও জনবল সঙ্কটের কারণে সংস্থাটিও যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। প্রায় ২,৮০০ একর আয়তনের লেকের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন মাত্র ১২ জন! নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, লেকের দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নক্শা অনুযায়ী স্থায়ী ওয়াক ওয়ে নির্মাণ করা না হলে এক সময় অস্তিত্ব হারাবে গুলশান লেক।

রাজধানীর যে কটি লেকের অস্তিত্ব এখনও টিকে আছে তার মধ্যে গুলশান লেক অন্যতম। এ লেক রক্ষায় নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হলেও দখলদারদের থাবা বন্ধ করা যাচ্ছে না। গত পাঁচ দশকে লেকের দুই পাড়ের অনেকাংশই বেদখল হয়ে গেছে। এক যুগেরও বেশি সময় আগে রাজধানীর গুলশান লেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা ছিল। কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বাধীন ততকালীন জোট সরকারের আমলে লেক রক্ষার প্রতি এক ধরনের অবহেলা এবং বর্তমান সরকারের আমলে কিছু মামলার কারণে প্রকল্পের কাজে কাক্সিক্ষত গতি সঞ্চার হয়নি। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, লেক উন্নয়নে ২০০২ সালে ১০০ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিকল্পনা নেয়া হয়। গুলশান-বারিধারা-বনানী লেক ছাড়াও উত্তরা লেক উন্নয়নের বিষয়টিও প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়। কিন্তু পরে ‘তহবিল সঙ্কট’ দেখিয়ে কাটছাঁট করে প্রকল্পটি নামিয়ে আনা হয় ৩২ কোটি টাকায়। তবে গুলশান লেক এলাকায় কিছু ওয়াক ওয়ে তৈরি করা ছাড়া আর কোন কাজই হয়নি। রাজউকের সূত্রমতে, ওই সময়ে রাজউকের বিতর্কিত এক কর্মকর্তাকে প্রকল্পের পরিচালক করা হয়েছিল। ওই কর্মকর্তা লেকের মধ্যেই ১২ তলা একটি ভবনের অনুমোদন দেন। এ নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। পরে প্রকল্পের কাজ আর এগোয়নি। এর মধ্যেই বাঁশের খুঁটি গেঁড়ে, ঘর বানিয়ে লেকের বিভিন্ন স্থান দখল হয়েছে প্রতিনিয়ত। পরবর্তীতে ২০১১ সালে প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫০০ কোটি টাকার হিসাব করে নতুন করে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু প্রকল্প হাতে নেয়ার পর মামলাসহ নানা বাধা আসে। অধিগ্রহণ করা অনেক জায়গাও বেদখল হয়ে যায়। গুলশান-বনানী-মহাখালী লেক অংশের ৬৯ দশমিক ১৪৪ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ এখনও শুরুই করা যায়নি। তবে রাজউক সূত্রে জানা গেছে, লেক সংক্রান্ত সব প্রকল্পকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সংশোধিত এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। তবে এটি এখনও প্রয়োজনীয় অনুমোদন পায়নি। এ প্রসঙ্গে রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও গুলশান লেক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোঃ মনোয়ার হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জোর চেষ্টা চলছে। তবে বাধাও আছে অনেক। লেকের দখল ও দূষণ প্রতিরোধে আমাদের নিজস্ব লোকবল সঙ্কট আছে। গোটা লেকের জন্য নিরাপত্তা প্রহরী আছে মাত্র ১২ জন। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে লেকের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত হবে। তবে লেকের অস্তিত্ব রক্ষায় রাজউকের উদ্যোগে প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও তার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি-না সে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সম্প্রতি মহাখালী গাউসুল আজম মসজিদ-সংলগ্ন এলাকা থেকে বনানী ব্রিজ পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গুলশান লেকের কড়াইল বউবাজার অংশে দখলদাররা রীতিমতো দখলযজ্ঞ চালাচ্ছে। লেকের নতুন জায়গাসহ উচ্ছেদকৃত অংশে বাঁশের খুঁটি গেঁড়ে টিনের ছাউনি দিয়ে দুই শতাধিক ঘর তোলা হয়েছে। কড়াইল অংশের ২৮ নম্বর নৌ পারাপার রুটের পাশে দুই দিক থেকে সুরম্য ভবন আর টিনের ঘর দিয়ে দৃশ্যত চেপে ধরা হয়েছে লেকের ‘গলা’। ৩০ নম্বর রুটে লেকের ভেতরে মাটি ফেলে বানানো হয়েছে গোয়াল ঘর! আবার প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় গুলশান-বাড্ডা শুটিং ক্লাব থেকে মরিয়ম টাওয়ার-২ পর্যন্ত ৪০ ফুট চওড়া সড়ক নির্মাণের কথা রয়েছে। কিন্তু সড়কটির বাস্তবায়ন বিঘিœত হচ্ছে লেকের পাড় দখলকারীদের দৌরাত্ম্যে।

রাজউকের হিসাব অনুযায়ী, এই লেক এলাকায় প্রায় দুই শ’ অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া জোট সরকারের আমলে বিতর্কিতভাবে বরাদ্দ দেয়া প্লটে তৈরি স্থাপনা উচ্ছেদের কথা থাকলেও তা হয়নি। যেগুলোর অনেক অংশ লেকের জায়গায় পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে কিছু স্থাপনা অপসারণ করা হলেও বেশির ভাগ আবারও গড়ে ওঠে। অথচ ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই এই লেক রক্ষার ব্যাপারে উচ্চ আদালত নির্দেশনা দেন। ওই নির্দেশনা অনুসারে লেকের সীমানা জরিপ করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, লেকের দুই পাড়ে ওয়াক ওয়ে নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা। কিন্তু সাধারণ গুলশানবাসীর দুর্ভাগ্যÑ একই দখল-দূষণের কারণে উচ্চ আদালতকে আরও কয়েকবার রুল জারি করতে হয়েছে। সর্বশেষ গত ২২ জুন লেকের শাহজাদপুর অংশে ভরাট, দখল ও স্থাপনা নির্মাণে জড়িতদের বিরুদ্ধে জলাধার সংরক্ষণ আইনে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত। এ বিষয়ে মোঃ মনোয়ার হোসেন বলেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ একটি চলমান প্রক্রিয়া। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো যায় না। তবে জলাধার সংরক্ষণ আইন ও রাজউকের ইমারত বিধিমালা আইন অনুসারে বিভিন্ন সময় রাজউক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে থাকে। সর্বশেষ গত ৬ জুন মরিয়ম টাওয়ার ও গুদারাঘাট এলাকার বেশকিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।