২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডিএনডিতে নতুন পাম্প হাউস নির্মাণ না করায় জলাবদ্ধতা

  • দুর্ভোগে কয়েক লাখ বাসিন্দা

মোঃ খলিলুর রহমান, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ থেকে ॥ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ অভ্যন্তরে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার পিছনে রয়েছে নানাবিধ কারণ। স্থানীয় বাসিন্দা, অভিজ্ঞমহল, জনপ্রতিনিধি, পাউবো ও ডিএনডি পাম্প হাউসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা ব্যাপক জলাবদ্ধার নেপথ্যে কারণগুলো অবহিত করেন। তাদের মতে, ডিএনডি প্রজেক্টের অভ্যন্তরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না রেখে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের শাখা-প্রশাখা খালগুলোতে ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট করা ও খাল দখল করে দোকানপাট ও রাস্তা নির্মাণ করা, শাখা-প্রশাখা খালগুলো পুনর্খনন না করা, জায়গায় জায়গায় বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা ও অত্যাধুনিক নতুন পাম্প হাউস (স্টেশন) নির্মাণ না করাসহ নানা কারণে প্রতিবছর নিচু এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এ বছরও ডিএনডির নিচু এলাকার কয়েক লাখ বাসিন্দা গত এক মাস ধরে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতার কারণে পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। পানিবন্দী লোকজন চর্ম ও পানি বাহিত রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মধ্য ডিএনডিসহ কোমর সমান পানিতে যে সব স্থান ডুবে গেছে সে সব এলাকাগুলোতে নৌকা চলতে দেখা গেছে। অনেক এলাকায় বাড়িঘরে পানিতে পানি প্রবেশ করায় অনেকেই বাড়িঘর তালাবদ্ধ করে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।

জানা গেছে, ডিএনডি প্রজেক্টটি ১৯৬৫Ñ১৯৬৮ সালে রাজধানী ঢাকার ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, কদমতলী, ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানার প্রায় ৬ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা-৪, ঢাকা-৫ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসনের এলাকায় ডিএনডি প্রজেক্টটি পড়েছে। এ ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১নং, ২নং, ৩নং, ৭ নং, ৮নং ও ৯নং ওয়ার্ড এলাকাটিও ডিএনডির অভ্যন্তরে অবস্থিত। ডিএনডি প্রতিষ্ঠার পর এর অভ্যন্তরে শুধু ইরিগ্রেশন প্রজেক্ট ছিল। কিন্তু ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় ডিএনডি ছিল বন্যামুক্ত। ফলে এর চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। শুরু হয় ডিএনডিতে বসবাসের প্রতিযোগিতা। বর্তমানে প্রজেক্টি ইরিগ্রেশন হিসেবে ধরা হচ্ছে না। এটি একটি আবাসিক এলাকায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ডিএনডিতে আনুমানিক ২০ লাখ লোক বসবাস করছে। জানা যায়, পাম্প হাউস নির্মাণের সময় ১৪ দশমিক ৫২ কিউসেক (৫১২ কিউসেক) ক্ষমতা সম্পন্ন ৪টি পাম্প সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় বসানো হয়েছে। অথচ এ পাম্পগুলো ৫০ বছরের পুরনো। তাই পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা আগের মতো নেই বলেও খোদ কর্মকতাই অকপটে স্বীকার করেন।

ঢাকার ডেমরা থানার সারুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ সহিদুল ইসলাম বলেন, ২০০৭ সালে ডিএনডি থেকে জলাবদ্ধতা নিরসন কল্পে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। সেই প্রস্তাবনায় ঢাকার শ্যামপুরে ও সিদ্ধিরগঞ্জের নয়াআটি রসুলবাগে নতুন দু’টি পাম্প স্টেশন নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি জানান, ডিএনডির লাখ লাখ লোক পানিবন্দী অবস্থায় আছে অথচ হাইকমান্ড ডিএনডির বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ রয়েছে। তিনি জানান, তার ইউনিয়নের প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগই এলাকা এখন প্রবল বর্ষণে জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে। জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানিতে বহু গাছ মরে গেছে। এমনকি ডিএনডির বহু সবজি ক্ষেতেরও ক্ষতি হয়েছে। স্টাফ কোয়ার্টার থেকে পূর্বডগাইর পর্যন্ত নিষ্কাশন খালটি নামমাত্র খনন করা হয়েছে। কোন অবৈধ স্থাপনা ও দোকান পাট উচ্ছেদ করা হয়নি। তিনি ডিএনডি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের দাবি জানান। সারুলিয়ার পূর্বডগাইর এলাকার বাসিন্দা আজাদ জানায়, কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণের পানিতে তাদের চলাচলের রাস্তাটি কোমর সমান পানিতে ডুবে আছে। এভাবে ডিএনডির নিচু এলাকার রাস্তাঘাট, বাড়িঘরসহ নানা স্থাপনা বর্ষণের পানিতে এখনও ডুবে আছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিএনডি প্রজেক্টের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সরকার নজরুল ইসলাম জানায়, ডিএনডি থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ২৩৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ২টি পাম্প হাউস (স্টেশন) ও ৩টি পাম্পিং স্টেশন নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল। সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। এটি বাস্তবায়িত হলে ডিএনডিতে আর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। তিনি আরও জানান, এ বছর প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২২Ñ২৩টি খাল পুনর্খনন, সংস্কার, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবোর) ঢাকা যান্ত্রিক পাম্প হাউস বিভাগের (শিমরাইল ডিএনডি পাম্প হাউস) নির্বাহী প্রকৌশলী এম গোলাম সারওয়ার জানান, ডিএনডি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করতে হলে ৮৮ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন আরও নতুন ৪টি পাম্প হাউস নির্মাণ করতে হবে। তাহলে ডিএনডিবাসী জলাবদ্ধতার কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে। তিনি আরও জানান, যদি আর বৃষ্টিপাত না হয় তবে আরও ১৫ দিন পানি নিষ্কাশন করলে ডিএনডি থেকে জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব হবে।

অপরদিকে শিমরাইলের ডিএনডি পাম্প হাউসের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল জব্বার জানান, প্রধান নিষ্কাশন খালের ডিএনডির পাম্প হাউসের মুখে প্রতিনিয়তই পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, লেপ-তোষক, বাজার ও বাড়িঘরের ময়লা-আবর্জনা ও মরা গরুসহ বিভিন্ন মরা পশুপাখির ভেসে আসছে। এতে পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে শ্রমিক নামিয়ে সেই ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, পাম্প হাউসের ৫১২ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন ৪টি পাম্পই ৫০ বছরের পুরনো। পাম্পগুলো আগের মতো কার্যক্ষমতা নেই। তিনি দাবি করেন, ওই পাম্পগুলো এখন শতকরা ৫০ ভাগ থেকে ৭০ ভাগ পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা রয়েছে।

ডিএনডি সূত্রে জানা যায়, ডিএনডি থেকে সুষ্ঠুভাবে সেচ কার্য পরিচালনা করা এবং পানি নিষ্কাশন করার জন্য ৯টি সেচ খাল, ৯টি ডিটিও খাল, ২১০টি আউট লেক খাল, ৮৫টি চকবন্দী খাল অনুসারে ১০টি নিষ্কাশন খাল রয়েছে। এ ছাড়াও এক কিলোমিটার দীর্ঘ ইনটেক খাল, ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ মেইন ক্যানেল টার্ন আউট খাল রয়েছে। এর মধ্যে চ্যানেল-১ খালের র্দৈঘ্য ৭ দশমিক ৯০ কিলোমিটার, চ্যানেল-২ এর দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার, পাগলা খাল ৩ কিলোমিটার, জালকুড়ি খাল ২ দশমিক ১০ কিলোমিটার, শ্যামপুর খাল ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার, ফতুল্লা খাল ১ দশমিক ৮০ কিলোমিটার ও সেকেন্ডারি চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটার। এ সকল খালগুলোর অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে বলে পানিবন্দী লোকজন অভিযোগ করেন। তারা জানান, খালগুলো দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট, ক্লাব ঘরসহ বিভিন্ন অফিস। পাউবোর কর্মকর্তারা জানায়, প্রধান নিষ্কাশন খালসহ শাখা-প্রশাখা খালগুলোতে স্থানীয় লোকজন বাড়িঘরের পলিথিন, রান্না-বান্নার ময়লা আবর্জনা ফেলছে। এতে খালগুলো প্রতিবছরই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষণের পানি পাম্প হাউসের পাম্পের মুখে দ্রুত না আসতে পারায় শীতলক্ষ্যা নদীতে পানিও দ্রুত নিষ্কাশন করা যায় না। ফলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ডিএনডি পাম্প হাউসের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার কাজে নিয়োজিত কর্মচারী রুবেল জানায়, প্রধান নিষ্কাশন খালের পাম্প হাউসের মুখে নেটে (লোহার জাল) প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে ময়লা-আবর্জনা ভেসে আসছে। কোন কোন সময় ১ ট্রাক থেকে ২ ট্রাকও ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। ময়লা আবর্জনার কারণেও দ্রুত পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।