২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের স্মৃতিধন্য শহর বরিশাল

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ কংগ্রেস নেতা মহাত্মা গান্ধী ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যাতায়াত ছিল বরিশাল শহরে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একবার বরিশাল এসেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন বহুবার। কবি নজরুল এই শহরের রূপ-সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আখ্যা দিয়েছিলেন প্রাচ্যের ভেনিস। তিনি মৃত্যুক্ষুধা নাকটটি লিখেছিলেন বরিশালকে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চন্দ্রদ্বীপের (বরিশালের আদি নাম) রাজা রামচন্দ্র রায়ের স্ত্রী বিভাবতীকে (বিমলা) নিয়ে ‘বৌ-ঠাকুরানীরহাট’ নামের একটি উপন্যাস রচনা করেছেন। আর মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার জন্য এ শহরে যাতায়াত করতেন। সর্বশেষ তিনি ১৯০৬ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিতে বরিশালে এসেছিলেন।

সূত্রমতে, তৎকালীন উপমহাদেশের মধ্যে মহাত্মা উপাধি পাওয়া অপরজন বরিশালের কৃতী সন্তান মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের বাড়িতেই মহাত্মা গান্ধী এসে থাকতেন। কংগ্রেসের ওই অধিবেশনে অশ্বিনী কুমার দত্ত সভাপতি ছিলেন। তবে মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক রজনীকান্ত সেন ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা চারণ কবি মুকুন্দ দাসের কালীবাড়িতেও যাতায়াত করতেন। রজনীকান্ত দাস এখানের মিউনিসিপলিটির আজীবন চেয়ারম্যান ছিলেন।

রত্মগর্ভা এই নগরীতে পা পড়েছিল নোবেল বিজয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। বরিশালের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি চিঠি থেকে জানা গেছে, ‘রবীন্দ্র হইয়া মোকাম পরিদর্শক নগেন্দ্রকে পাঠাইয়াছি। বরিশালের দুষ্টু লোকেরা আখ মাড়াই, কড়াই আত্মসাত করিয়াছে। স্থানীয় কর্মচারীর সঠিক হিসাব দেখায়নি।’ বরিশালে কবিগুরু তার মেয়ে মীরা দেবীকে বিয়ে দিয়ে এবং আখের কল স্থাপন করে চরম খেসারত দিয়েছিলেন বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। চিঠির সূত্র ধরে ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা গেছে, রবীন্দ্রনাথের বরিশালের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক আরও অনেক ছিল। লাকুটিয়ার জমিদার রাখাল চন্দ্র রায়ের একমাত্র পুত্র ছিল দেবকুমার রায়। তার দু’কন্যা সুশীলা ও শীলা ছিল খুবই সুন্দরী ও জ্ঞানী। ওই দু’বোনকে বিয়ে করেছিল রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দু’পুত্র দীপেন্দ্রনাথ ও অরুণেন্দ্রনাথ। শুধু ভাইয়ের ছেলে নয়, রবীন্দ্রনাথ তার ১৪ বছর বয়স্কা কনিষ্ঠ কন্যা মীরা দেবীকে বিয়ে দিয়েছিলেন নগরীর হাসপাতাল রোডের ব্রাহ্মণ সমাজের নেতা শ্রী বামুন দাশ গঙ্গুলীর পুত্র নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর সঙ্গে। ১৯০৭ সালের জুন মাসে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। জামাইবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ বেড়াতে এসে এক সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন। তখন বরিশালের স্থানীয় গুণীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি একটি সাহিত্য পরিষদ খোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ওই বছরেরই ২৮ জুন রবীন্দ্রনাথের জামাতা নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় চলে যান। ১৯৬৯ সালে মীরা দেবীর মৃত্যু হয়। তাদের সংসার জীবন তেমন সুখের ছিল না। তাই রবীন্দ্রনাথ দুঃখ করে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ওর জীবনের প্রথম দ- তো আমিই দিয়েছি। ভাল করে না ভেবে না বুঝেই আমি ওর বিয়ে দিয়েছি...।’

বরিশালের ইদিলপুর পরগনায় কলকাতার ঠাকুর স্টেটের জমিদারি ছিল। ওই জমিদারিতে অংশ ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। বরিশালের সঙ্গে কবিগুরুর রক্তের সম্পর্ক ছিল। এখানকার সুসাহিত্যিক দেবকুমার রায় ছিলেন কবির একান্ত ভক্ত। ১৯০৬ সালের ১৫ এপ্রিল বরিশালে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন তিনি আগরতলায় অবস্থান করতেন। ওই বছরের ৮ এপ্রিল বরিশালে পাঠানো এক চিঠিতে কবি লিখেছিলেন, ‘ঘুরিয়া মরিতেছি, সম্প্রতি আগরতলায় আটকা পড়িয়া গিয়াছি। বরিশালে যাইতে হইবে...।’ আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কত সালে কী উদ্দেশ্যে বরিশাল এসেছিলেন তার সঠিক কোন তথ্য জানা না গেলেও কবির আগমন নিয়ে তারই লেখালেখিতে বরিশালে আসার বর্ণনা তুলে ধরেছেন।