২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে শৈল্পিক উচ্চারণ ‘মেরাজ ফকিরের মা’

গৌতম পাণ্ডে ॥ কোন এক সময়ে যাত্রার দলের অভিনেতা মোজাহের ম-ল, ভুলতে পারে না তার অতীত স্বভাব। তাই ৩৯ বছর পরেও তার কথা ও চলনে থাকে যাত্রা পালার ডায়লগ ও গান। গাইতে থাকে ‘নিশিথে যাইও ফুল বনে রে ভ্রমরা’ গানটি। নিজের স্ত্রী আলো বিবির সঙ্গে যাত্রাপালার ঢংয়ে কথাবার্তা দিয়েই শুরু হয় নাটক ‘মেরাজ ফকিরের মা’। নাটকের কাহিনী গড়ে উঠেছে ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে। এক মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়ে একজন মানুষ বেড়ে উঠেছে একটি নামে। দীর্ঘ ৩৯ বছর পর আকস্মিকভাবে সে জানতে পারে তার গর্ভধারিণী মায়ের ধর্ম আর তার ধর্ম এক নয়। ধর্ম পরিচয়ে যে ফারাক রচিত হয় তা কি মা-ছেলের সম্পর্ককে ফারাক করে দিতে পারে? ধর্মের ভিন্নতার কারণে ছেলে কি অস্বীকার করতে পারে তার মাকে? মানবিক সম্পর্ক আর বাহ্যিক আচার সর্বস্ব সম্পর্ক-দুইয়ের মধ্যে কোনটির রয়েছে নাড়ি ছেঁড়া টান? এমনি সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এবং মানবের স্বরূপ প্রকাশের চেষ্টা হয়েছে নাটকটিতে।

নাটকের মানুষ আবদুল্লাহ আল মামুনের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী ছিল ১২ জুলাই। কিন্তু সে সময় রমজান মাস থাকায় কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেনি তার হাতেগড়া নাট্যদল ‘থিয়েটার’। তার পরিবর্তে ৭ আগস্ট শুক্রবার ‘আবদুল্লাহ আল মামুন জন্মবার্ষিকী’র অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সংগঠনটি। এ উপলক্ষে মঞ্চস্থ হলো তাঁরই লেখা ও নির্দেশিত নাটক ‘মেরাজ ফকিরের মা’।

সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনে নাটক শুরুর আগে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন থিয়েটারের কর্ণধার নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। তিনি বলেন, ‘মেরাজ ফকিরের মা’ নাটকটি আবদুল্লাহ আল মামুনের এক বিখ্যাত নাটক। আজ নাটকটির ১৮৫তম প্রদর্শনী। নাটকটির প্রেক্ষাপট ধর্মীয় এক অনুভূতিকে কেন্দ্র করে।

আমাদের দেশে এখনও এ ধরনের ধর্মীয় গোড়ামি বিদ্যমান। আমরা এর অবসান চাই। আমরা এমন এক সমাজ চাই সে সমাজে আমাদের যেন আর এই নাটক মঞ্চায়ন করতে না হয়। এছাড়া এদিন নাটক শুরুর আগে একাডেমির সেমিনার কক্ষে বিকেলে ‘আবদুল্লাহ আল-মামুন ও আমাদের সময়ের নাটক’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা করেন শিক্ষাবিদ ও লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

নাটকে মা আলো বিবির সন্তান মেরাজ ফকির ধর্ম ব্যবসায়ীদের একজন। সংসারের সবাইকে ধর্মীয় গোড়ামির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে বদ্ধপরিকর। এমনকি তার জন্মদাত্রী মাতাও এর বাইরে নয়। পলাশপুর গ্রামের গেদা ফকিরের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে ব্যবসার ক্ষেত্রে চলতে থাকে বিবাদ। ধর্মকে পুঁজি করে, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে এক অন্ধকারে নিয়ে যেতে থাকে তারা। গেদা ফকিরের আস্তানায় মেয়ের খোঁজে হাজির হয় অসুস্থ ধীরেন্দ্রলাল। তার কাছ থেকে গেদা ফকির মেরাজ ফকিরের জন্ম পরিচয় জানতে পেরে, এক সুযোগ নেয়। মেরাজ ফকিরের মা একজন হিন্দু ঘরের সন্তান। যাত্রা দলের মালিক ধীরেন্দ্রলালের মেয়ে আলোর সঙ্গে ৩৯ বছর আগে মুসলমান ধর্ম মতে বিয়ে হয় মেরাজের বাবা মোজাহের ম-লের। নাম হয় আলো বিবি। একজন হিন্দুর ঘরের মেয়ের পেটে মেরাজের জন্ম জানতে পেরে সে মাকে খুন করতে যায়। কিন্তু বিবেকের তাড়নায় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এভাবেই নাটকের কাহিনী আবর্তিত হয়। নাটকে উঠে এসেছে আজকের বাংলাদেশের ঘটমান কিছু বাস্তবতা। ধর্ম ব্যবসাকে পুঁজি করে, ধর্মের অপব্যাখ্যা করে এক শ্রেণীর স্বার্থলোভী অসৎ মানুষ সমাজের প্রগতিকে ঠেকিয়ে রাখার যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে দেশজুড়ে, তার প্রতিও বিশেষভাবে আলো ফেলা হয়েছে এ নাটকে। নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন-রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, ত্রপা মজুমদার, মজিবর রহমান জুয়েল, তানজুম আরা পল্লী, মারুফ কবির, সাইফ জোয়ারদার, আব্দুল কাদের, তোফা হোসেন প্রমুখ। মঞ্চ পরিকল্পনায়-হাসান আহমেদ, আলোক পরিকল্পনায় ঠা-ু রায়হান এবয় আবহ সঙ্গীতে ছিলেন প্রদীপ কুমার নাগ।