২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অসীমস্পর্শী মহামানব

  • পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

বলতে দ্বিধা নেই যে, শৈশব-কৈশোরে দস্যুমোহন এবং নেতাজী সুভাষকে আমি হিরো হিসেবে ভাবতাম। প্রথমজনের প্রতি আসক্তি মোহন সিরিজের বই পড়ে এবং দ্বিতীয়জনের প্রতি বাবা ও অগ্রজদের মুখে তাঁর বীরত্বগাথা শুনে। বাঙালী বীর সুভাষ বসু যুদ্ধ করে ইংরেজদের তাড়াতে চেয়েছিলেন। সত্য মিথ্যার হিসাব করবেন ইতিহাস গবেষক, তবে এটা ঠিক যে, নেতাজী সুভাষ বাঙালী মানসে একটা মিথ সৃষ্টি করেছিলেন। আমিও সেই মিথে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম। তবে বেশি দিনের জন্য নয়। মধ্য ষাটের কাছাকাছি এসে সব ছাপিয়ে আমার হিরো হয়ে উঠলেন শেখ মুজিব। সেই থেকে আজ অবধি আমার কাছে, এক নেতা এক দেশ।

ফরিদপুরে অম্বিকা হলের মাঠে প্রথম তাঁর বক্তৃতা শুনে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। পাঁচ দশক পরে আজও সেই স্মৃতি রোমন্থন করে শিহরিত হই। তারপর সাংগঠনিক কাজে কতবার তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছি, কতবার স্নেহস্পর্শ পেয়েছি। আমার মতো অতি সামান্য জনের ব্যক্তিগত স্মৃতির ঝুলিতে সে সব তো এখন অমূল্য ধন। আমি ধন্য, আমি গর্বিত। সৌভাগ্যের নহরে ভেসে চলা তরণীর আমি এক অহঙ্কারী যাত্রী। সার্থক জনম আমার। ৭ মার্চের ইতিহাসখ্যাত বক্তৃতার শেষের দিকে তিনি লাখো মানুষের জনসভায় অঙ্গীকার করেছিলেন। ‘এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ হাজার বছরের শোষণের হাত থেকে তিনি বাঙালী জাতিকে সত্যই মুক্ত করেছেন। দিয়েছেন আত্মপরিচয়ের অহঙ্কার। আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। উড়িয়েছি লাল-সবুজ পতাকার বিজয় নিশান। কণ্ঠে তুলেছি ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ আর তিনি হয়েছেন বাঙালীর প্রাণের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু তাই এক সত্তা। অভিন্ন, অবিচ্ছিন্ন। তিনি বাঙালীর পরম আশ্রয়স্থল।

ইতিহাস নেতা সৃষ্টি করে নাকি নেতা ইতিহাস সৃষ্টি করেন, এ বিষয়ে বিতর্ক হতে পারে। অনেক হয়েছে এবং হয়ও। কিন্তু ইতিহাস গবেষকরা নিশ্চয়ই এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে এই ভূখ-ে বঙ্গবন্ধু ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বাঙালী জাতি এবং এই ভূখ-ের হাজার বছরের বঞ্চনা, শোষণ, বিদ্রোহ ইত্যাদির বিশ্লেষণ করলে এবং অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নেতাদের (কারও কোন অবদানকে ছোট করে নয়) ভূমিকার হিসাব করতে গেলে স্পষ্টতই মানতে হবে যে, সর্বকালের সকল কর্মকা-ের সফল সমাপ্তি ঘটেছে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। তাই তিনি ইতিহাসের সন্তান হয়েও নিজে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। হয়েছেন বাঙালীর শ্রেষ্ঠ নেতা। মহাত্মা, দেশবন্ধু, নেতাজী, শেরেবাংলা ইত্যাদি খেতাবের মতো ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবটির সর্বকালীন স্বীকৃতি তাই যথাযথ এবং তর্কাতীতভাবে সত্য। অথচ বাঙালীর প্রিয় নেতাকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত করার পরও সমমনা সহযাত্রীদের কারও কারও কাছে ব্যাপারটি গ্রহণীয় হয়নি। যেমন গ্রহণীয় হয়নি ‘জয়বাংলা’ সেøাগান। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর আগরতলা মামলা থেকে মুক্ত হওয়ার পর রেসকোর্সের বিশাল জনসভায় নেতা মুজিবকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত করা হয়। আমার সৌভাগ্য আমি সেই জনসভায় উপস্থিত থাকতে পেরেছিলাম। ওই জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, আজ থেকে পূর্ববঙ্গের নাম আর পূর্ব পাকিস্তান নয়, এই নাম হবে বাংলাদেশ। জাতির পরিচয় হবে বাঙালী। আর কোন বাঙালী নেতার মুখ থেকে এমন সাহসী উচ্চারণ কোন দিন শোনা গেছে বলে আমার জানা নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন কি নেতার মুখে সেদিনের অপরাহ্ণেই স্পষ্ট হয়েছিল!

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন, জীবনাচার, সাংগঠনিক ক্ষমতা, বক্তৃতা সাক্ষাতকার নেতৃত্বদানের দক্ষতা, সংসার পালন ইত্যাদি নিয়ে এখন তুমুল গবেষণা চলছে। প্রকাশিত হচ্ছে অনেক গ্রন্থ। আমি এসব গ্রন্থের একজন আগ্রহী পাঠক। খোঁজ পেলেই সংগ্রহ করে পড়ি। পড়ি আর ভাবি, কী বিশাল মহাসমুদ্রে আমি অবগাহন করতে নেমেছি। অজস্র মণি মুক্তার ঔজ্জ্বল্যে বহুমাত্রিক চরিত্রের মানুষটিকে আর মানুষ মনে হয় না। মনে হয় মানুষের চেয়েও মানুষ। মনে হয় টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেয়া ভূমিপুত্র শেখ মুজিব ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ‘জাতির পিতা’ খেতাবের সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠেন অসীমস্পর্শী মহামানব।

দেশী-বিদেশী গবেষকদের গবেষণায় যে সত্যটি প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা হলো শেখ মুজিব ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালী। ‘চেহারায়, রক্তে-বর্ণে, চরিত্রে শেখ মুজিবের চাইতে প্রকৃত বাঙালী নেতা তাঁর দেশে দ্বিতীয় কেউ নেই। এই দীর্ঘ শ্যামবর্ণের সুদর্শন মানুষটি বজ্রকণ্ঠের অধিকারী। তিনি জনতাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পরিচালনা করতে জানেন।’ পদ্মা, মেঘনা যমুনার তীর ঘেঁষা জনপদের হাজার বছরের ঐতিহ্যিক সং¯ৃ‹তিকে তিনি ধারণ করেছিলেন নিজ চরিত্রে। এই সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা। একজন মুসলমান হিসেবে যথার্থ ধর্মবিশ্বাসী হয়ে তিনি ছিলেন সবধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। পাকিস্তানী শাসকদের প্ররোচনায় সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে তিনি চৌষট্টি সালে যে কঠোর ভূমিকা নিয়েছিলেন তা শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। মুসলমান ও বাঙালী এই পরিচয়কে যেভাবে তিনি সমন্বয় করেছিলেন তা ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আছে বলে মনে হয় না। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে পাকিস্তানীদের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন স্বদেশে ফিরে এসে রেসকোর্সে দেয়া নেতার ভাষণের কথা। সেদিনও রেসকোর্সে ঢল নেমেছিল লাখো বাঙালীর। রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু মুজিব সেদিন বলেছিলেন ‘আমি মুসলমান। আমি জানি মুসলমান মাত্র একবারই মরে। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালী, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ নেতা আরও বলেছিলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোন ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এ দেশের কৃষক শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সুখে থাকবে শান্তিতে থাকবে।’ লাখো জনতার ভেতর দাঁড়িয়ে সেদিন আবেগে আন্দোলিত হয়েছি। কিন্তু আজ বিদগ্ধ গবেষকদের বিশ্লেষণে বুঝতে চেষ্টা করি সেদিনের সেই ভাষণের ইন বিটুইন লাইনসের গূঢ় অর্থ। কোথায় সীমা কোথায় শেষ! অপার তার রহস্য! তবে এই সত্যটুকু অন্তত বুঝি যে বঙ্গবন্ধু সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। হাজার বছরের ইতিহাস ধারণ করে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন শাশ্বত বাংলা শাশ্বত সভ্যতা-সংস্কৃতির যার ভিত্তি হবে লোকায়ত। পূর্ব বাংলার মনীষী কাজি আবদুল ওদুদের লেখায় এই শাশ্বত-সভ্যতার লোকায়ত বাংলার উল্লেখ আছে। দেখতে দেখতে চল্লিশ বছর হয়ে গেল। এসেছে শোকের মাস আগস্ট। পঁচাত্তর সালের পনেরোই আগস্ট রাতে ঘাতক বুলেটে কেড়ে নিয়েছিল বাঙালী জাতির প্রাণপুরুষের জীবন। পাষ- ঘাতকের আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রাণভিক্ষা চাননি, ভীরু কাপুরুষের মতো পালিয়ে বাঁচতে চাননি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে ঘাতক দল হত্যা করতে চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে, বাঙালী জাতিকে। সে এক ঘোর অমানিশার কাল।

অমানিশা এখন ধীরে ধীরে দূর হচ্ছে। ফুটে উঠছে আলো। কিন্তু ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। চক্রান্ত আজও চলছে। প্রার্থনা করি সব বাধা দূর করে হেসে উঠবে বাংলাদেশ। মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বাঙালী জাতি। বঙ্গবন্ধুর বুকের রক্তে লেখা হবে ষড়যন্ত্রকারীদের চরম সর্বনাশ। পূরণ হবে মহামানবের প্রত্যাশা। সফল হবে তাঁর সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন। জয়বাংলা।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও কলামিস্ট