২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিলয় হত্যা ॥ তদন্তে এফবিআই

নিলয় হত্যা ॥ তদন্তে এফবিআই
  • দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ;###;গ্রেফতার নেই ;###;এফবিআইকে সহায়তায় প্রস্তুত সরকার ॥ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ব্লগার নীলাদ্রি চ্যাটার্জী ওরফে নিলয় হত্যার তদন্তে বাংলাদেশ পুলিশকে সহায়তায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই)। অনুমতি পেলে এফবিআই লেখক অভিজিত রায় হত্যাকা-ের মতো নিলয় হত্যাকা-ের তদন্তেও সহায়তা করতে প্রস্তুত। আজই নিলয় হত্যাকা-ের বিষয়ে ডিবির সঙ্গে বৈঠকে বসছেন এফবিআই প্রতিনিধিরা। যদিও অভিজিত রায় হত্যাকা-ের ঘটনায় দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। একের পর এক ব্লগার হত্যাকা-ের ঘটনায় সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। শনিবার নিলয়ের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তদন্তে দেহে ধারালো অস্ত্রের বারোটি গভীর ক্ষত থাকার প্রমাণ পেয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা। হত্যাকা-ের ঘটনায় নীলের স্ত্রী আশা মনি অজ্ঞাত চার খুনীকে আসামি করে শুক্রবার রাতেই খিলগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেছেন। যদিও রাত আটটায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হত্যাকা-ের দায় স্বীকারকারী আনসার আল ইসলাম কিংবা হত্যকা-ের সঙ্গে জড়িত বা সন্দেহভাজন কেউ গ্রেফতার হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির সূত্র ধরেই হত্যাকারী গোষ্ঠীটি ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন আইএসের আদলে এসব হত্যাকা- ঘটাচ্ছে। আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই নির্মমভাবে এবং খুবই ফিল্মি কায়দায় এমন হত্যাকা- ঘটানো হচ্ছে। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ সব জঙ্গী সংগঠনের সদস্যের সমন্বয়েই নতুন কোন জঙ্গী সংগঠন হত্যাকা-ের ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। এক্ষেত্রে সন্দেহের শীর্ষে রয়েছে সদ্য নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।

এখন পর্যন্ত হত্যার শিকার হওয়া ৬ ব্লগারই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগে গড়েওঠা গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম কর্মী ছিলেন। হত্যাকারীদের হাত থেকে বেঁচে গেছেন ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনসহ দুইজন। ব্লগে লেখালেখির সূত্র ধরেই যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে জঙ্গী বা কোন উগ্র মৌলবাদী সংগঠন একের পর এক ব্লগারদের হত্যা করছে। নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হুজি, জেএমবি, হিযবুত তাহরীর, শাহাদত-ই-আল হিকমা ও আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সদস্যরাই নতুন নামে সংগঠিত হয়ে হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আনসার আল ইসলামের নামে নিলয় হত্যার যে দায় স্বীকার করা হয়েছে, সেটিও মিথ্যা কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। মূলত জঙ্গীরা কি নামে সংগঠিত হচ্ছে তা জানার চেষ্টা চলছে।

গত শুক্রবার দেড়টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন পূর্ব গোড়ানের ৮ নম্বর সড়কের ১৬৭ নম্বর পাঁচতলা বাড়ির পঞ্চম তলার নিজ বাসায় হত্যা করা হয় নিলয়কে। দুই কক্ষের বাসায় স্ত্রী আশা মনিকে (২৫) নিয়ে বসবাস করছিলেন নীল (৩০)। ঘটনার সময় ঘরে আশা মনির বোন তন্বী (২০) ছিল। আশা মনির দায়ের করা মামলায় বলা হয়, শুক্রবার দুপুর দেড়টায় বাসা ভাড়া নেয়ার কথা বলে ঘরে ঢুকে চার যুবক নিলয়কে কুপিয়ে হত্যা করে।

এদিকে নিলয় হত্যাকা-ের তদন্তে বাংলাদেশ পুলিশকে সহায়তা করতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এফবিআই। যদিও রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন যোগাযোগ হয়নি। এমন খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, এফবিআই আনঅফিসিয়ালি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। নিলয় হত্যাকা-ের খোঁজখবর নিয়েছে। এফবিআই বাংলাদেশের অনুমতি পেলে নিলয় হত্যাকা-ের তদন্তে বাংলাদেশ পুলিশকে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, অভিজিত হত্যায়ও এফবিআই সহায়তা করেছে। এফবিআই তদন্ত করতে চাইলে সহায়তা করতে প্রস্তুত আছে সরকার।

শনিবার নিলয়ের ময়নাতদন্ত করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক মোহাম্মদ হোসেন। পরে ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হাবিবুজ্জামান চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, গলার ও থুতনির আটটি এবং শরীরে ৪টি গভীর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। গলা ও থুতনির নিচের ৮টি গভীর আঘাতের কারণেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নীলয়ের দ্রুত মৃত্যু হয়। এর আগে যেভাবে ব্লগারদের হত্যা করা হয়েছে, নীলের হত্যার ধরন একই। এর আগে ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন, বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা আরিফ রায়হান দ্বীপ, লেখক অভিজিত রায় ও ওয়াশিকুর রহমান বাবু এবং সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। হামলাকারীরা মাথা, গলা ও ঘাড়ে কুপিয়ে সবাইকে হত্যা করে। এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে নিলয়ের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।

তদন্তকারী সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি-জামায়াত-শিবির আর যুদ্ধাপরাধীদের প্রত্যক্ষ মদদ আর সহযোগিতায় হুজি, হুজিবি, জেএমবি, জেএমজেবি, শাহাদত-ই-আল হিকমা ও হিযবুত তাহরীরের মতো জঙ্গী সংগঠন বাসা বাঁধে এদেশে। এসব জঙ্গী সংগঠন নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই একত্রিত হচ্ছিল। তারা সম্মিলিতভাবে আনসারুল্লাহ বাংলাটিম নামের নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনের জন্ম দেয়। সংগঠনটিতে ছোট ছোট সিøপার সেল সৃষ্টি করে হত্যাকা-ের ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সঙ্গে ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন আইএসের (ইসলামিক স্টেট) যোগাযোগ আছে।

সম্প্রতি ঢাকা থেকে আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অন্যতম সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অনারারি ক্যাপ্টেন ও জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা কারাবন্দী জেএমবির আমির মুফতি মাওলানা সাইদুর রহমান জাফরের দুই মেয়ের জামাই সাখাওয়াতুল কবির ও তার ভায়রা ইজাজ ওরফে কারগিল। কবির আইএসআইয়ের কাছ থেকে অর্থ ও মারাত্মক অস্ত্র সংগ্রহ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিল। ইজাজ পাকিস্তানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হন। ইজাজ আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন। তিনি আইএসের জন্য বাংলাদেশের কর্মী সংগ্রহ করছিলেন।

ডিবি সূত্র বলছে, ইতোমধ্যেই তিন আনসারুল্লাহ সদস্য বাংলাদেশ থেকে সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দিয়েছে। আরও অন্তত ২০ জন যোগদানের অপেক্ষায় । এছাড়া গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে সামিউন রহমান ইবনে হামদান (২৪) নামে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এক ব্রিটিশ নাগরিক ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়। তিনি আইএসের সদস্য সংগ্রহের কাজ করছিলেন। হামদান বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে আল কায়েদা নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং বাংলাদেশে ইসলামী শরীয়াভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালুর করার লক্ষ্যে কাজ করছিলেন।

গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টন এলাকা থেকে মোঃ হিফজুর রহমান (২২) নামে একজনকে গ্রেফতার করে ডিবি। হিফজুর নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবির সদস্য। তার তথ্যমতে সেগুনবাগিচা ও রমনা এলাকা থেকে মোঃ আসিফ আদনান (২৬) ও মোঃ ফজলে এলাহী তানজিল (২৪) নামের দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ দু’জন আইএসে যোগ দেয়ার পরিকল্পনা করছিল। আসিফ ও তানজিল জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সদস্য। আদনান সুপ্রীমকোর্টের এক সাবেক বিচারকের ছেলে। আর তানজিলের মা ওএসডি থাকা এক যুগ্ম সচিবের ছেলে।

এদিকে ব্লগার নিলয়ের হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে জাতীয় শ্রমিক জোট, সম্মিলিত সাংস্কৃতি জোট, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল(জাসদ)সহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন।