২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্মের নামে রক্তপাত চলতে দেয়া হবে না ॥ প্রধানমন্ত্রী

ধর্মের নামে রক্তপাত চলতে দেয়া হবে না ॥ প্রধানমন্ত্রী
  • ‘শিশু নির্যাতন ও হত্যাকারীকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে’

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে ধর্মের নামে সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদী কর্মকা- চলতে দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। ইসলাম শান্তির ধর্ম, শান্তির ধর্মকে যারা কলুষিত করে যাচ্ছে তারা ধর্মে বিশ্বাস করতে পারে না। অন্তত বাংলাদেশের মাটিতে ধর্মের নামে রক্তপাত চলবে না, চলতে দেয়াও হবে না। আর যারা শিশু নির্যাতন ও হত্যা করবে তাদের কঠোর শাস্তি পেতে হবে। এ ধরনের অপরাধীদের শাস্তি দিতে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছি। এসব করলে কেউ-ই রেহাই পাবে না।

শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শান্তির ধর্ম ইসলামকে যারা কলুষিত করছে তারা নিজেদের মুসলমান হিসেবে কিভাবে ঘোষণা দেবে? যারা মুসলমান হয়ে মুসলমানকে হত্যা করে তারা কখনোই ধর্মে বিশ্বাসী হতে পারে না। আবার এরাই ধর্মের নামে রাজনীতি করছে।

সাম্প্রতিক বিশ্বে ধর্মীয় জঙ্গীবাদের ছোবলের দৃষ্টান্ত টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্ভাগ্য যে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় আজকে যে সন্ত্রাসবাদী, জঙ্গীবাদী কর্মকা- চলছে তার ধাক্কা তো মাঝেমধ্যেই এসে লাগে। আমরা কঠোর হাতে তা দূর করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, এখানে বহু চেষ্টা হয়েছে নানাভাবে জঙ্গীবাদী ও সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করার। কিন্তু এই বাংলাদেশ অসাম্প্রয়িক দেশ। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যে যার অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। সেইভাবেই জাতির পিতা বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। সেভাবেই আমরা দেশ গড়ে তুলছি, সেভাবেই আমরা গড়ে তুলতে চাই।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্নস্থানে ব্লগার হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুঃখ হয় যখন দেখি, আজকে সৌদি আরবে মসজিদে জুমার নামাজের দিন সুইসাইড স্কোয়াড দিয়ে বোমা মেরে মানুষ হত্যা করা হলো। এরা কী মুসলমান? এক মুসলমান আরেক মুসলমানকে হত্যা করতে যারা আত্মহননের পথ বেছে নেয়- তারা কিভাবে মুসলমান হয়? কোন ধর্ম তারা রক্ষা করে? তিনি বলেন, একদিকে নিজেরা নিজেদের হত্যা করে আবার অন্যদিকে আল কায়েদার লোক আজকে স্বীকার করেছে এখানে তারা ব্লগারদের হত্যা করছে। তাহলে এই যে দ্বন্দ্ব, এই যে কনফ্লিক্ট- এর জবাব কোথায়?

শেখ হাসিনা প্রশ্ন রেখে বলেন, মুসলমান হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়ে মসজিদের ভেতর জুমার নামাজ পড়ার সময় মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। আবার এসব সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে লিখল কেন তার জন্য ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে। তাহলে কোনটা বাস্তব, কোনটা সত্য, কোন পথে মানুষ যাবে? তিনি আরও প্রশ্ন রেখে বলেন, এ হানাহানি, রক্তারক্তি কার জন্য, কার স্বার্থে? কোন ধর্মের মর্যাদা রক্ষার জন্য? জানিনা এ প্রশ্নের উত্তর কখনো কেউ দিতে পারবে কি না?

শিশু হত্যা ও নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির জন্য আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে বাংলাদেশে যে শিশু নির্যাতন, আমি জানি না আমাদের বাঙালীর ভেতরে কী ধরনের একটা অদ্ভুত মানসিকতা আছে! কারণ একটা ঘটনা ঘটলে প্রবলভাবে যখন প্রচার পায়, তখন সেই ঘটনা আরও ঘটাবার একটা প্রবণতাই আমরা দেখি। এটা একটা অদ্ভুত চরিত্র যেন এদেশের মানুষের। একজন মা-বাবা কিভাবে নির্যাতন করে একটি শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করতে পারে- আমি এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না।

নির্যাতন করে শিশু হত্যার কয়েকটি ঘটনা ঘটার পর স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীকে নিয়ে আলোচনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি। যারা এ ধরনের শিশু নির্যাতন করবে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া এবং এদের শাস্তি দিয়ে মানুষকে দেখাতে হবে যে এই অপরাধ করলে কাউকে রেহাই দেয়া হবে না। এ সময় শিশু নির্যাতনের ঘটনার কথা বলতে গিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের সবার সঙ্গে ছোট ভাই ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলকে নির্মমভাবে হত্যার কথা স্মরণ করতে গিয়ে আবেগে জড়িয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, কোন শিশু হত্যার ঘটনা দেখলেই সেই রাসেলের কথা মনে পড়ে। ওইদিন বঙ্গবন্ধুসহ ১০ বছরের শিশু রাসেল, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের শিশু কন্যা ও পুত্র, চার বছরের নাতিকে হত্যা এবং শেখ ফজলুল হক মনির অন্তঃসত্ত্বা সন্ত্রী আরজু মনিকে হত্যার ঘটনাও তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব হত্যার বিচার হলে একটি দৃষ্টান্তের সৃষ্টি হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ওই হত্যার বিচার তো করেইনি, বরং ১৫ আগস্টের হত্যাকা-কে জায়েজ করতে তখন কত রকম লেখনী লেখা হয়েছে। কতভাবে খুনীদের বাহবা দেয়া হয়েছিল, তাদের কত বিশেষণ দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছিল। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার থেকে মুক্তি দিয়ে বিভিন্ন দূতাবাসে পর্যন্ত চাকরির মাধ্যমে ঘাতকদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেন, একটা অপরাধ আরও অপরাধকে উৎসাহিত করে। যারা তখন এগুলো করেছিলেন, তাদের অনেকেই বেঁচে আছেন। আজকে তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি মেলালে দেখা যাবে-সেদিন তারা কী বলেছিলেন, আর এখন তারা কী বলছেন। এ প্রসঙ্গে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও খুনীদের ফাঁসির রায় কার্যকরের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার এবং রায়ও কার্যকর আমরা করেছি। এ জন্য তিনি দেশের জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, কেননা তারাই এই সুযোগ করে দিয়েছেন।

মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিকের আলোকপাতের পাশাপাশি তাঁকে ঘিরে নানা ঘটনার আবেগঘন স্মৃতিচারণও করেন মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ১৫ আগস্টের বিয়গান্তক ঘটনার মাত্র ১৫ দিন আগে বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে নিয়ে বিদেশে যাই। বিদেশে যাবার দিন মাকে আকুল হয়ে কাঁদতে দেখেছি। খুব চাপা স্বভাবের হলেও সেদিন এই মহীয়সী নারী যেভাবে কেঁদেছিলেন, তা আগে কখনো দেখাও যায়নি। কিন্তু সত্যিই আর মাকে আমরা দেখতে পারিনি।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও প্রেরণাই বঙ্গবন্ধুকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি শুধু সন্তান না, আমি মা’র বন্ধুর মতন ছিলাম। একটা দেশকে স্বাধীন করা, একটা জাতিকে স্বাধীন করা একদিনে হয় না। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে হয়। সেই ত্যাগ স্বীকার করেছে আমার মা। তিনি বলেন, আমার বাবা রাজনৈতিক অঙ্গনে সর্বক্ষণ মায়ের সাহস ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে বন্দী করা হলে আমার মা পরিবার সামলাতেন, খোঁজ-খবর নিতেন দলের নেতাকর্মীদের। সবাইকে আগলে রাখতেন, সবাইকে সাহস যোগাতেন। তাঁর কাছ থেকে আমরাও জীবনে চলার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার মা অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন, তাঁর কখনো কোনো চাহিদা ছিল না। তাঁর মধ্যে কোন হা-হুতাশ ছিল না। পরিবার বা দলের যখন প্রয়োজন হতো, তখন তিনি গহনা বা ঘরের ফার্নিচার পর্যন্ত বিক্রি করে দিতেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হোক সেটাই তিনি চেয়েছেন। তাঁর যে ত্যাগ-তিতিক্ষা, প্রেরণা সেটাই তো বঙ্গবন্ধুকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছিল। যার জন্য আজ আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।

উদারতা-সবাইকে আগলে রাখা মায়ের কাছ থেকেই শিখেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আব্বার বিরুদ্ধে যখন ১৪-১৫টা মামলা দিয়ে তাঁকে জেলে নিয়ে যাওয়া হতো, তখন আমার মা সবাইকে আগলে রাখতেন। তিনি নিজের ঘরের খাবারের জন্য রাখা বাজারের টাকা আওয়ামী লীগের অসুস্থ নেতাকর্মীদের পেছনে খরচ করতেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের বাড়িতে বাজারের টাকা পৌঁছে দিতেন। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস আমরা দেখেছি এবং শিখেছি। তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট বাবা-মা, ভাইসহ সবাই জীবন দিয়ে গেছেন, কিন্তু ঘাতকের কাছে একটিবারের জন্যও কেউ প্রাণভিক্ষা চাননি, মাথানত করেননি। বরং মাথা উঁচু করে তারা জীবন দিয়ে গেছেন। বাঙালী জাতির মর্যাদা রেখে গেছেন।

তিনি বলেন, বঙ্গমাতা বেগম মুজিব ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহস ও অনুপ্রেরণার জায়গা। তিনি সবসময় বঙ্গবন্ধুকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিতেন। রাজনৈতিক মামলায় বঙ্গবন্ধুকে যখন কারাগারে বন্দী করা হতো, তখন শেখ ফজিলাতুন্নেছাই পরিবার সামলাতেন, খোঁজ-খবর নিতেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। আগলে রাখতেন সবাইকে। তাই বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন, আর এই অর্জনের পেছনে নেপথ্যে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনের ওপর আলোচনা করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেবেকা মোমেন ও জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপক মমতাজ বেগম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম এনডিসি। অনুষ্ঠানের শুরুতেই মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবিনভিত্তিক একটি প্রমাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

নির্বাচিত সংবাদ