২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেয়া হিটলিস্টের ৮০ নম্বরে ছিলেন নিলয়

শংকর কুমার দে ॥ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেয়া তালিকায় হিটলিস্টের ৮৪ ব্লগারের মধ্যে নিলয় ছিলেন ৮০ নম্বরে। একের পর এক মুক্তচিন্তার লেখক ও ব্লগার খুনের ঘটনা অব্যাহত থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, এরপর কী আরও খুন হবেন, খুন হবেন কে? নিরাপত্তার অভাবে অনেক ব্লগার বিদেশে চলে যাচ্ছেন বা চলে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন। নিলয় নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করতে চাইলে কেন জিডি গ্রহণ করা হয়নি সেই বিষয়ে পুলিশের তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একের পর এক মুক্তচিন্তার ব্লগার খুনের ঘটনার বিচার না হওয়ায়ই খুনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। পুলিশ ও গোয়েন্দারা বলছেন, ‘সিøপার সেল’ পদ্ধতিতে খুনের ঘটনার কারণে খুনীকে চিহ্নিত বা শনাক্ত করার ক্লু খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সমাজবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে মুক্তচিন্তার ব্লগার হত্যাকা-ের এ ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক মুক্তচিন্তার ব্লগার অভিজিত রায়কে হত্যার পর পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি তদন্তে সহযোগিতায় এসেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। মুক্তচিন্তার ব্লগার নিলয় হত্যার ঘটনায়ও তদন্তে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমতি পেলে গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি তারাও তদন্ত শুরু করবে। ব্লগার নিলয় হত্যার পর শনিবার সকালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থা এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এফবিআই। এ সময় এফবিআই ওই ডিবি কর্মকর্তার কাছে তদন্তে সহায়তা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। খুব শীঘ্রই নিলয় হত্যাকা-ের তদন্তে এফবিআই আসতে পারে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানান, মুক্তচিন্তার লেখক ও ব্লগার খুনের ঘটনার পর আল কায়েদা, আনসারুল্লা বাংলা টিমের জঙ্গী সংগঠনের নামে যে বিবৃতি প্রদান করা হচ্ছে, তা কোথা থেকে কারা কিভাবে দিচ্ছে তা চিহ্নিত করতে পারছেন না পুলিশ ও গোয়েন্দারা। শুধু তাই নয়, খুনী চক্রের সদস্য কারা এবং খুনের নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী কারা তাও খুঁজে পাচ্ছেন না তদন্তকারীরা। মুক্তচিন্তার ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু তেজগাঁওয়ে খুনের ঘটনার সময়ে জিকরুল্লাহ ও আরিফুল ইসলাম নামের দুই জঙ্গীকে হাতে-নাতে ধরে ফেলে লাবণ্য নামের দুই হিজড়া। ধরা পড়ার পর পুলিশে হস্তান্তর করার হলে গ্রেফতারকৃত দুই জঙ্গী খুনের সময়ে জড়িত থাকা তাহের ও মাছুম নামের অপর দুই জঙ্গীর নাম উল্লেখ করে গ্রেফতারকৃতরা। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই দুই জঙ্গীকে গ্রেফতার করা সম্ভবপর হয়নি। এমনকি গ্রেফতার হওয়া দুই জঙ্গীর কাছ থেকেও নেপথ্যে থাকা খুনী চক্রের পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা সম্ভবপর হয়নি। আবু তাহের ও মাছুম এখনও পলাতক।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানান, ‘সিøপার সেল’ গঠন করে কিলিং মিশনে নেমেছে জঙ্গী সংগঠনগুলো। প্রায় প্রতিটি জঙ্গী সংগঠনে সিøপার সেল রয়েছে। সিøপার সেলের একজন সদস্যের সঙ্গে অন্য সদস্যের কোন পরিচয় থাকে না। এমনকি কিলিং মিশনে অংশ নেয়ার আগ পর্যন্ত সিøপার সেলের সদস্যরা একে অপরের কাছে অচেনা থাকে। এ হত্যা তাদের ওপর ‘ফরজ’ বলে নাযিল হয়েছে। বেহেস্ত পেতে তাদের হত্যা করতে হবে। এ কারণে একজন সদস্য অপর সদস্যের ব্যাপারে বিস্তারিত কোন তথ্যই জানেন না। স্লিপার সেলের প্রধান তাদেরকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ছবি দেখিয়ে দেয়। ওই ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে রেকি করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

গোয়েন্দা সূত্র জানান, শুক্রবার উত্তর গোড়ানে খুন হওয়া ব্লগার নীলাদ্রি চ্যাটার্জী নিলয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হেফাজত ইসলামের দেয়া ৮৪ ব্লগারের তালিকায় ৮০ নম্বরে নাম ছিল। অনলাইন ব্লগারদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ২০১৩ সালে ৮৪ জনের একটি তালিকা দিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম। এই তালিকায় থাকা ব্লগার ও নতুন সংযোজিতদেরই খুন করে চলেছে উগ্রপন্থীরা। সিøপার সেলের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যার নির্দেশের ক্ষেত্রে জেএমবি সদস্যরা গোপন আইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল) ঠিকানা ব্যবহার করছে। স্লিপার সেলে কমপক্ষে ৫ জন থেকে সর্বোচ্চ সাত জনের সদস্য মিলে একটি গ্রুপ। এর মধ্যে একজন দলনেতা থাকে। তাদের প্রত্যেককে একে অপরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় মূল পরিকল্পনাকারী। দলনেতাই প্রত্যেক সদস্যকে মিশনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানিয়ে দেয়Ñ কাকে, কীভাবে খুন করতে হবে। পরিকল্পনাকারী নিজেই স্লিপার সেলের সদস্যদের অস্ত্র সরবরাহ করে। তারা বেশিরভাগ সময় ধারালো চাপাতিসহ ছোরা জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার করে। কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যার পাশাপাশি বিশেষ ধরনের ইনজেকশনও ব্যবহার করে উগ্রপন্থীরা।

উগ্রপন্থীদের হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের ছেলেসহ অনেকেই। সিলেটের অনন্ত, সর্বশেষ নিলয়ও দেশে ছাড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি, খুন হয়েছেন। নিলয় খুন হওয়ার আগে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জিডি গ্রহণ করেনি থানার পুলিশ। কেন জিডি গ্রহণ করা হলো না সেই বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন, জঙ্গীবাদবিরোধী শক্ত অবস্থানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের প্রশংসা করেছে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। কিন্তু উগ্র মৌলবাদী জঙ্গী গোষ্ঠীর হাতে একের পর এক মুক্তচিন্তার লেখক ব্লগার খুনের ঘটনায় খুনীদের চিহ্নিত করার মাধ্যমে গ্রেফতার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ব্যর্থতায় এ ধরনের খুনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।