২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডাক্তার যাকে জীবন দিয়েছে সেই সুরাইয়াকেই ডাক্তার বানাতে চান মা

ডাক্তার যাকে জীবন দিয়েছে সেই সুরাইয়াকেই ডাক্তার বানাতে চান মা

শর্মী চক্রবর্তী ॥ ডাক্তারদের সেবায় আমি ও আমার মনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। তাই আমার ইচ্ছা আমার মনিকে পড়ালেখা করিয়ে ডাক্তার বানাবো। ডাক্তার হয়ে সেও মানুষের সেবা করবে। শনিবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৩য় তলায় ৪৮ নাম্বার কেবিনে গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়ার মা নাজমা বেগম তার এই স্বপ্নের কথা জানান। গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়াকে আদর করে মনি ডাকেন নাজমা বেগম। বাবা-মা দুজনেরই স্বপ্ন মেয়েকে ডাক্তার বানানোর। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের সেবায় ক্রমেই উন্নতির দিকে গুলিবিদ্ধ মা ও শিশু। সুরাইয়াকে নিয়ে এখন স্বপ্ন দেখছেন তার বাবা-মা। স্বপ্নের কথাই প্রকাশ করে মা নাজমা জানালেন, চিকিৎসকদের সেবায় তিনি মুগ্ধ। হাসপাতালে শয্যায় থেকেই মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন বুনছেন তিনি। মুখ ফুটেই বাকি কথাটুকু জানালেন সুরাইয়ার পিতা বাচ্চু ভূঁইয়া। তিনি বলেন, মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে ডাক্তার বানাতে চাই। কিন্তু আমিতো গরিব মানুষ। চা বিক্রি করে সংসার চালাই। এত টাকা পাব কোথায়। সুরাইয়ার লেখাপড়ার সুযোগ যদি সরকার করে দিতো তাহলে আমাদের এই স্বপ্ন পূরণ হতো। বৃহস্পতিবার রাতে কেবিনে আসার পর প্রতিদিন নাজমা বেগম এনআইসিইউতে গিয়ে দুধ খাইয়ে আসেন সুরাইয়াকে। মেয়ে কোলে নিয়ে আদর করেন তখন। শরীরে গুলি লাগায় ও সিজার করায় প্রচ- ব্যথা, হাঁটতে খুব কষ্ট হয় নাজমার। কিন্তু মেয়ের কাছে যাওয়ার সময় কোন কষ্টই কষ্ট মনে হয় না তার কাছে। সকল ব্যথা ভুলে গিয়ে মেয়ের কাছে ছুটে যান। কিছু সময় সুরাইয়ার কাছে থাকতে পেরে, তাকে আদর করতে পেরেই শান্তি পান তিনি।

নাজমা বেগম বলেন, সুরাইয়াকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। দীর্ঘ ৮ বছর অপেক্ষার পর সুরাইয়া আমার গর্ভে আসে। বড় মেয়ে অসুস্থ হওয়ায় তাকে নিয়েই ছিল আমার সকল স্বপ্ন। কিন্তু মা হিসেবে নিজেকে খুব বেশি হতভাগা মনে হয়। জন্মের পর মেয়েটাকে স্বাভাবিকভাবে কোলে নিতে পারিনি। এভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে কোন সন্তানের জন্ম হয়েছে বলে আমার জানা নেই। পৃথিবীতে আসার আগেই আমার মনিকে এমন ঘটনার শিকার হতে হবে আমি ভাবতেও পারি না।

ভয়ঙ্কর সেই দিনের কথা মনে করলে এখনও আঁতকে ওঠেন নাজমা বেগম। তিনি বলেন, আমরা রাজনীতি করি না। রাজনীতি বুঝি না। গরিব মানুষ। স্বামীর চা বিক্রির টাকায় সংসার চলে। অথচ রাজনীতির বলি হলাম আমরাই। নাজমা প্রশ্ন করেন, আমার পেটে থাকা বাচ্চা কি অপরাধ করেছিল। তাকে কেন গুলিবিদ্ধ হতে হলো? বলেই দীর্ঘশ্বাস টানেন তিনি। চোখের কোণে তখন বিন্দু বিন্দু জল জমাট হয়েছে। একই অবস্থা পাশে দাঁড়ানো বাচ্চু ভূঁইয়ার।

২৩ জুলাই বিকাল ৪টার দিকে গুলিবিদ্ধ হন নাজমা বেগম। রোমহর্ষক সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নাজমা বেগম জানান, টিনশেডের পাকা ঘর তাদের। পাশেই চাচাশ্বশুর ও দেবরদের বাড়ি। নিজেদের ঘরে খাটের মধ্যে শুয়ে ছিলেন তিনি। হঠাৎ গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ। কৌতূহল নিয়েই খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নাজমা। এই দাঁড়ানোটাই তার কাল হয়ে যায়। বাইরে তখন ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ। মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণ হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় সবাই নাজমার পরিচিত। কেউ তাকে চাচি, কেউ ভাবী বলে সম্বোধন করে। তাদের মধ্যেই দুজন আলী ও আজিবর। এগিয়ে আসে নাজমার দিকে। আজিবরকে নির্দেশ দেয় আলী, এই কামরুলের ভাবীকে গুলি কর। তখন অনুনয় করে নাজমা তাদের বলেন, আজিবর তুই আমাকে গুলি করবি ক্যা। আমি কি অন্যায় করেছি। তোর সঙ্গে আমার শত্রুতা আছে নাকি।

তখন পালানোর সুযোগ নেই। নাজমা বলেন, আমি চিন্তাও করতে পারিনি ওরা আমাকে গুলি করবে। আমি তাদের হাতজোড় করে বলেছি- আমি গর্ভবতী মহিলা, তোরা আমাকে গুলি করিস না। জবাবে আজিবর বলেছে, গর্ভবতী বলে কোন ছাড় নেই। বলেই নাজমার পেটের বাম দিকে গুলি করে আজিবর। এর মধ্যেই নাজমার স্বামী বাচ্চু ভূঁইয়া ছুটে যান। বাচ্চু ভূঁইয়া জানান, সেদিন দুপুরে খাওয়া হয়নি তার। মাগুরা সদরে তার চায়ের দোকান বন্ধ করে খেতে যান পৌর শহরের আদর্শপাড়ার বাড়িতে। বাড়িতে ঢোকার আগেই বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শুনতে পান তিনি। অন্তত ১০টি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ পান বাচ্চু ভূঁইয়া। ১০-১২ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গুলি করতে করতে এগিয়ে আসছিল। নিজের বাড়িতে যাওয়ার আগেই থেমে যান চাচা মমিন ভূঁইয়ার বাড়ির সামনে। এর মধ্যে বাচ্চু ভূঁইয়ার মেজো চাচি চিৎকার করে বলেন, বাচ্চু তোর বউকে গুলি করে আলী ও আজিবর চইলে গেছে। দৌড়ে নিজের বাড়িতে যান। দেখতে পান রক্তে ভেসে গেছে ঘরের বারান্দা। রক্তের মধ্যে পড়ে আছেন নাজমা বেগম। তোয়ালে দিয়ে গুলিবিদ্ধ স্থানটি চেপে রাখেন। একটি রিকশায় করে নাজমাকে নিয়ে দ্রুত যান মাগুরা সদর হাসপাতালে। সেখানেই রাতে অস্ত্রোপচার করা হলে জন্ম হয় কন্যাশিশুর। মায়ের পেটে অবস্থানের কারণে শরীরের পাঁচটি স্থানে গুলির আঘাত লাগে তার। শিশুটির পিঠ দিয়ে গুলি ঢুকে বুক ও হাতে আঘাত করে বাম চোখের নিচ দিয়ে বের হয়ে গেছে।

বাচ্চু ভূঁইয়া জানান, নাজমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরপরই তার চাচা মমিন ভূঁইয়াকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। নাজমাকে গুলি করে যাওয়ার সময় মমিন ভূঁইয়াকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। রাত দেড়টার দিকে মমিন ভূঁইয়া মারা যান। অন্যদিকে গুলিবিদ্ধ নাজমা ও নবজাতককে নিয়ে শঙ্কিত মাগুরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা। এর মধ্যেই মাগুরার পুলিশ সুপার ২০ হাজার টাকা দিয়ে নবজাতককে ঢামেক হাসপাতালে পাঠান। এ্যাম্বুলেন্সে করে দুই ফুফু শিখা ও শিউলি নবজাতককে ঢাকায় নিয়ে আসেন। গত ২৬ জুলাই শিশুকে সেখানে ভর্তি করা হয়। এর দুই দিন পরই গুলিবিদ্ধ কচি শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়। গুলিবিদ্ধ শিশুর সুস্থতার জন্য মায়ের দুধের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মাকে ঢাকায় আনতে তাগিদ দেন চিকিৎসকরা। ৩০ জুলাই নাজমা বেগম ঢাকায় এসে একই হাসপাতালে ভর্তি হন। বাচ্চু ভূঁইয়া বলেন, শিশুর নাম না রাখায় নাজমার বাচ্চা হিসেবেই ডাক্তাররা খাতায় লিখেছিলেন। কেউ কেউ বুলেট কন্যা ডাকতেন। পরে ওই দিনই সবার সামনে বড় মেয়ে সুমাইয়ার সঙ্গে মিল রেখে তার নাম রাখি সুরাইয়া।

গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের স্পেশাল কেয়ার বেবি ইউনিটে চিকিৎসাধীন আছে। একই হাসপাতালের ৪৮ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন শিশুর মা নাজমা বেগম।

হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ কানিজ হাসিনা জানান, শিশু ও মায়ের অবস্থা আগের চেয়ে ভাল। শিশুকে মায়ের দুধ পান করানো হচ্ছে। তবে মায়ের পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে নির্ধারত সময়ের আগে জন্ম হওয়ার কারণে সুস্থ হতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে শিশুকে। অপরিণত হয়ে জন্ম হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৫০০ গ্রাম ওজন কম শিশুটির। যে কারণে একটা ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে বলে জানান তিনি। গুলিবিদ্ধ হয়ে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় মাস আগে জন্মেছে শিশুটি। তিনি আরও বলেন, সুরাইয়ার অবস্থা আগের থেকে অনেকটা উন্নতি হলেও এখনও আশঙ্কামুক্ত নয়। মা নাজমা বেগমকে কেবিনে দেয়া হলেও সুরাইয়াকে এখনও কেবিনে দেয়ার কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। কারণ এতে সুরাইয়ার ইনফেকশন হতে পারে বলে জানান তিনি।