২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রতিবেদন দাখিল হয়নি, কামরুলকে ফেরত আনতে কোন অগ্রগতি নেই

প্রতিবেদন দাখিল হয়নি, কামরুলকে ফেরত আনতে কোন অগ্রগতি নেই
  • রাজন হত্যার এক মাস

সালাম মশরুর, সিলেট অফিস ॥ নির্মম নির্যাতনে শিশু রাজনের মৃত্যুবরণের ১ মাস পূর্ণ হয়েছে ৮ আগস্ট। মামলার অভিযোগপত্র আজও দাখিল হয়নি। অন্যতম ঘাতক কামরুলকে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতিও নেই। শনিবার জেলা প্রশাসক রাজনের ভাই সাজনের লেখাপড়ার খরচ ৫ হাজার টাকা তার মায়ের হাতে তুলে দিয়েছেন। রাজন হত্যাকা-ের পর সিলেটের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিমাসে রাজনের ভাই সাজনের লেখাপড়া বাবত ২ হাজার টাকা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এর অংশ হিসেবে শুক্রবার জেলা প্রশাসক মোঃ জয়নাল আবেদীন নিজে রাজনের বাড়িতে যান। এ সময় তিনি রাজনের মা লুবনা বেগমের কাছে ৫ হাজার টাকা হস্তান্তর করেন।

শিশু রাজন হত্যাকা-ের বিচার কাজ কবে শুরু হবে? কবে মামলার চার্জশীট প্রদান করা হবে? এমন প্রশ্ন এখন উচ্চারিত হচ্ছে সকল মহল থেকে। যে কোন লোমহর্ষক হত্যাকা-ের পর প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠেন জনতা। আসামিদের গ্রেফতার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এমন আশ্বাস সামনে চলে আসে। আর জনতাও সান্ত¡না নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। পরবর্তীতে দিনের পর দিন নানান জটিলতায় বিচার কাজ ঝুলে থাকে। এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে অভ্যস্ত মানুষ অন্তত রাজন হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে এমনটি হবে আশা করেননি।

নির্মম নির্যাতনে খুন হওয়া শিশু সামিউল আলম রাজনের বাড়িতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন দ্রত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে খুনীদের বিচার হবে। একই আশ্বাস দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রীও। আর নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, সিলেটের জেলা প্রশাসক বলেছিলেন, মামলাটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করতে প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে। যে বিষয়টি খোদ প্রধানমন্ত্রীর নজরে রয়েছে। দেশে-বিদেশে অগণিত মানুষ তোলপাড় করা এ হত্যাকা-ের পর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদারকি যেখানে রয়েছে সেখানে অন্তত একটি হত্যাকা-ের বিচার দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে এ প্রত্যাশা ছিল সকল শ্রেণীর মানুষের। রাজন হত্যার এক মাস পূর্ণ হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার বিচার দূরে থাক এক মাসের মধ্যে তদন্ত কাজই শেষ করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। পুলিশের কাছ থেকে ডিবির হাতে গেছে তদন্তভার। তবু এক মাসেও তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয়নি। একই অবস্থা এ হত্যা মামলার প্রধান আসামি সৌদি আরবে আটক কামরুল ইসলামকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও। ঈদের পরপরই কামরুলকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছিলেন সংশ্লিস্ট মন্ত্রীরা। তবে এখন পর্যন্ত কামরুলকে ফেরাতে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। এখনও অনিশ্চিতায় সময় যাচ্ছে কামরুলকে দেশে ফেরানোর বিষয়টি।

এ বিষয়ে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদউলাহ শহিদুল ইসলাম শাহিন বলেন, কোন ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার হবে সেটা নির্ধারণ করার আগে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা জেলা প্রশাসকও চাইলে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে স্থানান্তর করতে পারেন। কিন্তু এক মাসেও তদন্ত কাজ শেষ না হওয়ায় মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির সম্ভাবনা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। কামরুলকে দেশে ফেরাতে গাফিলতি রয়েছে উল্লেখ করে শাহীন বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের বন্দীবিনিময় চুক্তিও নেই। এছাড়া কামরুলকে ফেরত পাঠানোর আবেদন জানিয়ে মামলার যে এজাহারটি সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে, সে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে, ‘চোর সন্দেহে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।’ এখন চোর পিটিয়ে মেরেছে বলে সৌদি আরব কাউকে ফেরত দেবে কী না সেটাও ভাবার বিষয়। এজাহারের এই দুর্বলতার কারণেও কামরুলকে ফেরত আনা কষ্টকর হবে।

গত ৮ জুলাই সকালে সিলেটের কুমারগাওয়ে পৈশাচিক নির্যাতন করে ১৩ বছরের শিশু সামিউল আলম রাজনকে হত্যা করা হয়। নিহত রাজন কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের মাইক্রোবাসচালক শেখ আজিজুর রহমানের ছেলে। শিশু রাজনকে পেটানোর ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে নির্যাতনকারীরাই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। ২৮ মিনিটের ওই ভিডিও দেশ-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। এলাকাবাসী প্রতিবাদী হয়ে এগিয়ে আসেন। সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ার পর এ হত্যা মামলার আসামিদের ধরতে তৎপর হয় পুলিশ। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের জনতা আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। সৌদি আরবেও কামরুলকে আটক করে জনতা। এ পর্যন্ত এ ঘটনায় কামরুলসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে ৮ জন। এ ঘটনায় আসামিদের পালাতে সহযোগিতা, দুর্বল এজাহারের মাধ্যমে খুনের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা ও রাজনের বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের দায়ে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে। হত্যাকা-ের পরপরই মূল আসামিরা একে একে আটক হয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষীদেরও আটক করা হয়। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী অভিন্ন। যা মামলার ক্ষেত্রে ভাল। দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিরা আটক হলেও তদন্ত কাজে দ্রুত অগ্রগতি না থাকায় হতাশার নিশ্বাস ফেলছেন সচেতন সমাজ।

রাজনের বারা আজিজুর রহমান তদন্তে ধীরগতি ও কামরুলকে ফেরাতে ব্যর্থতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছেলে হত্যার পর প্রথমে পুলিশ আসামিদের সঙ্গে আঁতাত করে ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করে। এরপর সরকারের আশ্বাস ও এগিয়ে আসায় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা করেছিলাম। এখন ভেবে পাচ্ছি না শুধুই কি সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।