২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নাজুক অবস্থার উন্নতি না হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ

  • ড. আতিউরের হুঁশিয়ারি

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ বিদ্যমান নাজুক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে না পারলে পরিচালনা পর্ষদে প্রয়োজনে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে বলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রবিবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে গবর্নর ড. আতিউর রহমান এ সতর্কতা জানান। একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারের পক্ষ থেকে আর মূলধন দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি। রাজধানীর মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এমওইউ’র অগ্রগতি বিষয়ক এক সভায় ডেপুটি গবর্নর আবু হেনা রাজী হাসান, এস কে সুর চৌধুরী এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।

গবর্নর আরও বলেন, বারবার আপনাদের মূলধন ঘাটতি পূরণে যোগান দেবে না সরকার। কেননা, পুনর্মূলধনীকরণ জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ায়। তাই আয় ও মুনাফা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। খেলাপী ঋণ কমাতে হবে। দক্ষতা বাড়াতে হবে। তাহলেই ফুটো বালতিতে আর পানি ঢালার প্রয়োজন পড়বে না। গবর্নর বলেন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গাইডলাইনগুলো অনুসরণ এবং যথাযথ ঋণ নিয়মাচার মেনে নতুন ঋণ প্রদান করতে হবে। গুণমানের ঋণ মঞ্জুরির জন্য পরিচালনা পর্ষদকে দায়িত্ব নিতে হবে। নতুন ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়ন, ঋণ মঞ্জুরি ও ঋণ হিসাব ব্যবস্থাপনায় অনুসরণীয় নিয়মাচার Ñ এসব প্রধান নির্বাহী এবং পর্ষদের অডিট কমিটির সতর্ক নজরদারির মধ্যে থাকতে হবে। তিনি বলেন, মঞ্জুরিকৃত ঋণ একবারে বা এক চেকেই বিতরণ না করে পার্ট-বাই-পার্ট বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। আগের বিতরণকৃত ঋণের সদ্ব্যবহার যাচাই করে ঋণের পরবর্তী কিস্তি বিতরণ করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে ‘এ্যান্ড ইউজ কমপ্লায়েন্স’ চাইবে। ড. আতিউর রহমান বলেন, যে কোন শাখার গুরুতর অনিয়মের জন্য প্রথমে প্রধান নির্বাহীকেই জবাবদিহি করতে হবে। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গাফিলতি থাকলে কোন ছাড় দেয়া হবে না। যে কোন বিষয়ে নন-কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে গাফিলতির জন্য দায়ী প্রধান নির্বাহীদের বিরুদ্ধে অপসারণসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। পর্ষদের সদস্যদের গাফিলতির দৃষ্টান্তও বিহিত ব্যবস্থার জন্য সরকারের নজরে দেয়া হবে।

এরপরেও যদি অবস্থার কোন উন্নতি না হয় তাহলে ব্যাংকগুলোর পর্ষদে ক্যামেলস রেটিংয়ের ভিত্তিতে প্রয়োজনে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারা মোতাবেক জড়িত কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনতে কোনরকম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই রেটিংয়ের উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত নতুন শাখা খোলার আবেদন করবেন না। লোকসানি শাখাগুলোকে লাভজনক শাখায় পরিণত করুন। আপনাদের ব্যাংকগুলোর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর কৌশল গ্রহণ, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, দৃঢ় কর্পোরেট সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিকে পর্ষদকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। বর্তমান চেয়ারম্যান ও পরিচালকগণ অনেক বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ। নতুন উদ্যমে ব্যাংকগুলোতে স্বার্থান্বেষী প্রভাবমুক্ত বস্তুনিষ্ঠ ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়ন ও ঋণ ব্যবস্থাপনা, সকল পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং সুষ্ঠু ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলো সক্রিয় ও সচেষ্ট থাকবে বলে গবর্নর আশা করেন।

সভাশেষে এস কে সুর চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে মূলত চারটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এগুলো হলো- ক্যাশ রিকভারি, ইন্টারনাল কন্ট্রোল এ্যান্ড কমপ্লায়েন্স, অটোমেশন এবং গুড গবর্নেন্স। এগুলোর অভাব হলে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে বলে তাদের সতর্ক করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারা অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, কোর ব্যাংকিং সলিউশনে কোন অবস্থায় সন্তোষজনক নয়। এজন্যই পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ সতর্কতা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতিতে সরকার বারবার মূলধনের যোগান দেবে না। যে কারণে ব্যাংকগুলোকে খেলাপী ঋণ কমিয়ে আনতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ডেপুটি গবর্নর জানান, সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে অলাভজন শাখার সংখ্যা কমিয়ে না আনলে নতুন শাখার অনুমতি দেয়া হবে না, প্রভিশন ঘাটতি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ফর বিয়ারেন্স সুবিধা দেয়া হবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে। এজন্য অডিট বিভাগকে শক্তিশালী করে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে সভায় গবর্নর অগ্রণী ব্যাংকের একটি অডিট রিপোর্টের প্রশংসা করে অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে তা অনুসরণের নির্দেশ দেন বলেও জানান তিনি। এছাড়া সভায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) কাছ থেকে বকেয়া আদায় করতে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বিপিসি বর্তমানে লাভজনক অবস্থায় আছে। তাই বকেয়া আদায়ে ব্যাংকগুলোকে প্রক্রিয়া শুরু করতে বলা হয়েছে। সভায় ব্যাংকিং রিক্রুটমেন্ট কমিটির ( বিআরসি) মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে সরকারের করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাইয়ের সময় এর গুরুত্ব তুলে ধরতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে।