২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গী রুখতে চাই প্রতিরোধ

একের পর এক তরুণ মুক্তচিন্তক হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ছয় মাসে চার ব্লগার খুন হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মুক্তচিন্তার নৃশংস প্রতিপক্ষ, আত্মস্বীকৃত খুনীরা এবার আর প্রকাশ্য রাজপথে নয়, বাসায় গিয়ে খুন করেছে। মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারী তরুণ ব্লগারদের ভেতর সর্বশেষ শিকার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়, যিনি নিলয় নীল নামে ব্লগে সক্রিয় ছিলেন। গণজাগরণ মঞ্চের এই কর্মী প্রধানত মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখালেখির জন্য পরিচিত ছিলেন। কয়েক মাস আগে ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখে তিনি নিজ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্লগার বা অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট টার্মটি দেশব্যাপী বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে আসে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আটক কাদের মোল্লার বিচারে ফাঁসির রায় না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট তথা ব্লগাররা শাহবাগে একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ করেন। পরে সেটি অভূতপূর্ব গণজাগরণের রূপ নেয়। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ইতিহাস সৃষ্টি করে। সে সময়েই মৌলবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্র অনলাইনে স্বাধীন মত প্রকাশকারীদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাতে শুরু করে। ওই সময়েই অর্থাৎ ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিরপুরে ব্লগার রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সেই থেকে শুরু।

সীমাবদ্ধতা, প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার ভেতর মানুষের মুক্ত সত্তা চিরউন্নত রাখা একটা চ্যালেঞ্জ বটে। তবু মুক্তচিন্তাকে যুগে যুগে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন শিল্পী, কবি, দার্শনিক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা। যদি তা না হতো তাহলে সমাজের বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যেত, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা স্থবির হয়ে পড়ত, সভ্যতা নির্বাসিত হতো আঁস্তাকুড়ে। আর প্রকৃতির সেরা সৃষ্টি হিসেবে আমাদের গৌরবের জায়গাটিও অবশিষ্ট থাকত না। মুক্তচিন্তার পথ অনেকটাই সঙ্কুুচিত হয়ে পড়ে কূপম-ূক সমাজে। অথচ এমন পশ্চাৎপদ কা-জ্ঞানশূন্য সমাজেই বেশি করে প্রয়োজন মুক্তচিন্তার মানুষ। চিন্তাকে মুক্তি দিতে অসমর্থ হলে আমরাও পাকিস্তান নামক একটি জঙ্গী-কবলিত রাষ্ট্রের অংশ হয়েই থাকতাম। স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা অর্জন তাই বৃহত্তর অর্থে মুক্তচিন্তারই সুন্দরতম ফসল। দুঃখের বিষয় হলো, নানা বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণার ভেতর দিয়ে বহুবিধ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সমাজ ক্রমেই এগিয়েছে অনুর্বর অনুদার প্রায় মুক্তচিন্তাহীন এক স্বার্থান্ধ প্রগাঢ় অন্ধকারের দিকে। সেখানে মুক্তচিন্তার বিপক্ষ শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা।

বাংলাদেশের ওপর মৌলবাদ-জঙ্গীবাদ ছায়া বিস্তার করে চলেছে। তারা অন্ধকারের প্রাণী, আলোতে তাদের ভয়। মুক্তবুদ্ধির ধার তারা ধারে না। তাদের কাছে মানবতন্ত্র নয়, বড় হলো চাপাতিতন্ত্র। লেখার জবাব যারা লেখা নয়, চাপাতির মাধ্যমে দিয়ে থাকে তারা রাষ্ট্রের আইন মানে না। তাই রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হয়ে তাদের অপতৎপরতা রোধ করতে হবে। শেকড়সুদ্ধ তাদের উপড়ে ফেলা চাই সভ্যতার স্বার্থে। তা না হলে এরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জন করা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে জঙ্গলে পরিণত করে ছাড়বে। মুক্তমনা অভিজিত-ওয়াশিকুর-অনন্তসহ প্রতিটি হত্যাকা-ের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা জরুরী। নিলয় হত্যার নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার প্রয়োজনে আইনের শাসন সমুন্নত রাখা চাই। সময় এসেছে জঙ্গীবাদ-মৌলবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়ানোর। দেশের প্রতিটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের আলোয় স্নাত তারুণ্যশক্তির সতর্ক সজাগ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই।