১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাকিব-রাজন ॥ নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞের শেষ কোথায়

  • শাহজাহান মিয়া

নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা ও পৈশাচিক বর্বরতাকেও হার মানিয়ে যেভাবে কোমলমতি শিশুর প্রাণ সংহার করা হয়েছে তার বর্ণনা উল্লেখ করার মতো ভাষা-জ্ঞান আমার নেই। নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞে উন্মত্ত হয়ে কোমলপ্রাণ বারো বছরের একটি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যার খবর খুলনাসহ এ দেশের সর্বস্তরের মানুষের মনে ঝড় তুলেছে। তারা স্তব্ধ, স্তম্ভিত। বিস্ময়ে বিমূঢ়। তাদের মনে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, রক্তমাংসে গড়া মানুষ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয় কি করে? মানুষ কি একেবারেই বিবেকহীন হয়ে পড়ল? সমাজের কি পচন ধরল? অত্যন্ত মর্মান্তিক হলো ওই শিশুরা এই পৃথিবী সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত হওয়ার আগেই মানুষ নামের পশুদের হাতে বর্বর আক্রমণের শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। ৮ জুলাই সিলেটে শিশু রাজন হত্যাকা-ের রেশ কাটতে না কাটতেই ৩ আগস্ট খুলনায় পৈশাচিক কায়দায় এক শিশু শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। অভাবের তাড়নায় পেটের আহার যোগাতে স্কুলের পড়া বাদ দিয়ে গ্যারেজে কাজ নিয়েছিল রাকিব হাওলাদার নামে মাত্র ১২ বছর বয়সের শিশুটি। প্রতিদিন কাজ করা বাবদ মাত্র ৫০ টাকা দেয়ার কথা থাকলেও গ্যারেজের মালিক সে টাকাও ঠিকমতো দিত না। কোনরকম ভুল হলেই নানা ছুতায় গালিগালাজ ও মারধর করতো। কাজ করে মজুরি না পেয়ে ও কোমল দেহে মারধর সইতে না পেরে আরেকটি গ্যারেজে চাকরি নেয় রাকিব। ঘটনার দিন রাকিব আগের গ্যারেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গ্যারেজ মালিক শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টু ক্ষুব্ধ হয়ে রাকিবকে ধরে গ্যারেজের ভেতরে নিয়ে যায়। দোকান থেকে যন্ত্রাংশ চুরির অপবাদ দিয়ে নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। এতেও তাদের ক্ষোভ না মিটলে বর্বর নির্যাতনের এক পর্যায়ে মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেয়ার শক্তিশালী কমপ্রেশার মেশিনের নল তারা রাকিবের মলদ্বার দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। ভেতরে বাতাস ঢুকে শিশুটির পেট বেলুনের মতো ফুলে ফেটে যায়। ওদের নিষ্ঠুর নির্যাতন সইতে না পেরে রাকিব চিৎকার করে নির্যাতনকারীদের অনুরোধ করেছিল তার পেটে আর বাতাস না ঢোকাতে। রাকিব ওদের বলেছিল, ‘আমারে আর গ্যাস দিও না, আমি মইরে যাচ্ছি।’ রাকিবের মর্মস্পর্শী চিৎকারও ওদের পাষাণ হৃদয়ে কোন মায়ার উদ্রেক করেনি। ওরা চালিয়ে যায় নির্যাতন। এক সময় ছিঁড়ে যায় শিশুটির নাড়িভুঁড়ি। ফেটে যায় ফুসফুস। শরীরের ভেতরে প্রচ- রক্তক্ষরণ হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও প্রমাণিত হয়েছে কমপ্রেশার মেশিনের বাতাসের প্রচ- আঘাতে রাকিবের নাড়ি, মলদ্বার ও প্রস্র্রাবের থলি ফেটে যায়। অসহায় শিশুটির আর্তচিৎকারে লোকজন উদ্ধার করে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখান থেকে ঢাকায় নেয়ার জন্য এ্যাম্বুলেন্সে তোলার পরই সে মারা যায়।

কথাটি নির্মম হলেও সত্যি যে, মানুষের মনুষ্যত্ববোধ দিন দিন যেন লোপ পেয়ে যাচ্ছে। অবোধ পশুর হিংস্র্রতা মানুষের মধ্যে আছড় করে মানুষকে পশুর চেয়েও হিংস্র্র্র করে তুলছে। তা না হলে মানুষ নামের পশুদের হাতে ১৩ বছরের শিশু রাজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এক মাস পার না হতেই ১২ বছরের শিশু রাকিবেরও হৃদয়বিদারক মৃত্যু হবে কেন? রাজনের বাঁচার আকুতি, গগনবিদারী চিৎকারও নরপিশাচদের মন টলাতে পারেনি। উল্টো ঘাতকরা উল্লাসে ফেটে পড়ে মধ্যযুগীয় উন্মত্ততায় অসহায় শিশুটির ওপর তাদের বর্বর নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। দরিদ্র বাবার সীমিত আয়ে চলা সংসারে সহায়তার জন্য রাজনও স্কুল ছেড়ে নিজে ফেরি করে সবজি বিক্রি করে রোজগারে নেমেছিল। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে এলাকার এক নরপিশাচ যৌন লালসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে রাজনকে বলাৎকারে ব্যর্থ হয়ে তার বিরুদ্ধে ভ্যান চুরির অভিযোগ তোলে। পশুবৃত্তির মতো জঘন্য অপরাধ প্রচেষ্টা আড়াল করতে মানুষরূপী ওই পশুগুলো শিশুটিকে ধরে এনে একটি দোকানের খুঁটির সঙ্গে পিঠমোড়া করে বেঁধে তার ওপর প্রায় চার ঘণ্টা পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। গরিব বাবা-মা আদরের ছেলেকে বইখাতা তুলে রেখে শ্রমের জোয়াল কাঁধে দিয়ে কখনওবা সবজি বিক্রি করে পরিবারের উপার্জনক্ষম করেছিল। সেই শিশুটিকেও চোর অপবাদ দিয়ে নৃশংসভাবে রড দিয়ে পিটিয়ে, তার শরীরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, হাত-পা ভেঙ্গে খুন করেছে। ভাবতে গা শিউরে উঠে অবুঝ শিশুটির মৃত্যু নিশ্চিত করতে ওই পাষ-ের দল তার নাভিতে পর্যন্ত রড ঢুকিয়ে মুচড়িয়েছিল। অথচ বিকৃতমনা নিষ্ঠুর ঘাতকরা পবিত্র রমজান মাসে হাসতে হাসতে নির্মম হত্যাকা-টি ঘটিয়েছিল। কতটা মানবতাবোধহীন হলে পাষ-রা হত্যা করার পর ভিডিও করে তা আপলোড তথা সামাজিক নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেয়। সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ এই নৃশংসতার দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠে।

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী রাজন হত্যা মামলার অন্যতম আসামি বিত্তশালী কামরুল ইসলাম পুলিশের সহযোগিতায়ই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কামরুলের ছোট ভাই মুহিত আলমকে ধরার পরও এলাকায় থাকা কামরুলকে পুলিশ কেন গ্রেফতার করেনি তা নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ওঠে। তাই এলাকায় বলাবলি হয়, পুলিশের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় কামরুল থানা-পুলিশকে ম্যানেজ করেই গত ১০ জুলাই সৌদি আরব পালিয়ে যায়। কামরুল সৌদি আরব পৌঁছার পর পুলিশ অনেকটা লোক দেখানো রেড এ্যালার্ট জারি করে। ঘটনার চার দিন পর পত্রিকায় খবর বের হলে এবং সারাদেশে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তৎপর হয়। এমনকি রাজনের বাবা লাশ নেয়ার জন্য জালালাবাদ থানায় গেলে পুলিশ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এই নির্মম হত্যাকা-ের এক মাস চলে গেলেও এখনও পর্যন্ত মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি। অন্যতম ঘাতক কামরুলকে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই।

নৃশংসভাবে শিশু রাকিব, রাজন ও রবিউল হত্যাসহ আরও কিছু শিশুর মর্মান্তিক হত্যা আমাদের সমাজে সৃষ্ট অবক্ষয়ের একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। সমাজের সর্বস্তরে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই নরপশুদের ন্যক্কারজনক কাজের প্রতিরোধ করা সম্ভব। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত শিশু নির্যাতন হৃদয়বিদারক। আমি মনে করি এ ঘৃণ্য নৃশংসতা রোধে সমাজ ও মানুষের অনেক কিছু করার রয়েছে। অমানবিক কর্মকা- ও নৃশংসতার করাল গ্রাস থেকে শিশুদের মুক্তি নিশ্চিত করতে সামাজিক ঐক্য একান্তভাবেই প্রয়োজন। অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশে ভবিষ্যতে শিশুরাই নেতৃত্ব দেবে। এই শিশুদের সেভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার। এখানে দায়িত্ব এড়ানোর কোন উপায় নেই। শিশুরা দুর্বল বলে তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিককালে যেভাবে শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে সরকারের উচিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুততম সময়ে বিচার নিষ্পত্তি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

সমাজে শিশুর ওপর অমানবিক আচরণ যত বৃদ্ধি পাবে ততই শিশুদের সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত অনেক শিশুকেই নানা বৈষম্য-বঞ্চনার মধ্যে বড় হতে হয়। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সুবিধাবঞ্চিত এক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে অনেকের জীবন চলার পথ শুরু করতে হয়। সমাজে বিরাজমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাই এজন্য দায়ী। শিশুরা মানবসমাজের ভবিষ্যত প্রতিনিধি। শিশুর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বটি তাই সমাজকেই দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করতে হবে। নানারূপ পাপাচার-পঙ্কিলতা, নিষ্ঠুরতা ও আদিম অসভ্যতা থেকে সমাজকে বাঁচাতে হলে সত্য-সুন্দর ও জ্ঞানের আলোয় সমাজের মানুষকে আলোকিত করার কোন বিকল্প নেই। প্রশাসনসহ বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী হয়ে পড়েছে। রাকিব-রাজনদের ঘাতকদের গ্রেফতার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের শাস্তি বিধানই এখন জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট