২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জীবনে আড্ডার আবেশ

  • রেজা ফারুক

আড্ডা দৈনন্দিন জীবনে এক অন্যরকম আবেশ তৈরি করে। একঘেয়ে জীবনের ধারায় আড্ডা যে নিদারুণ আবহের সূচনা করে তার ছাপ পড়ে প্রতিটা মানুষেরই মনে। কী পুরুষ, কী নারী সবার মাঝেই আড্ডার প্রশান্তিময় আবেগ ছড়িয়ে দেয় অসীম আনন্দের মূর্ছনা। তাছাড়া মানুষ মাত্রেই একজন আরেকজনের সঙ্গে একপশলা গল্প করে পাঁচ-দশ মিনিট পার করে দেবেÑ এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। তবে নগরজীবনে যেমন আড্ডার রয়েছে প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস, তেমনি গ্রামীণ জনপদেও আড্ডা কিন্তু একটা বিশেষ যায়গা করে নিয়েছে বাঙালীর জীবন। বাঙালী মানেই গল্পবাজ। পরিচিত কিংবা অপরিচিত কথাচ্ছলে এক চিলতে কথাজুড়ে দেয়াই বাঙালীর রয়েছে আবহমান বৈশিষ্ট্য।

নগরজীবনের আড্ডার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেশ। অফিসে কাজের ফাঁকে সহকর্মীর সঙ্গে লাঞ্চ ব্রেক কিংবা টি ব্রেকে গল্পের আসরটা জমে ওঠে মধুর মগ্নতায়। তবে সেটাকে আড্ডা না বলে সাময়িক কথন বলাই ভাল। আড্ডাটা মূলত একটা শিল্পের রূপ পায় কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনীতিক, খেলোয়াড়, কলেজ-ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের মধ্যে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে চলে তুমুল ম্যারাথন আড্ডা। তবে এক্ষেত্রে প্রবল আড্ডাবাজ বলে প্রধানত এগিয়ে আছেন লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, সংস্কৃতি কর্মীরাই। লেখক-শিল্পীর এই আড্ডার প্রচলন হয়ে আসছে মধ্যযুগ থেকে। তবে সে সময়ের আড্ডা আর আধুনিক যুগের আড্ডার মধ্যে রয়েছে রকমফের। লেখক, শিল্পী সংস্কৃতি কর্মীদের আড্ডার কোন সমারোহ কিংবা টাইম ফ্রেম নেই। একবার আড্ডা জমে উঠলে সেই আড্ডায় কখন পর্দা নামবে তা যেন নিজরাও অনুধাবন করতে পারেন না। আবার কর্মজীবী মানুষের আড্ডাটা শুধু সন্ধ্যার জন্যই থাকে তোলা। কখনও বা তারা ছুটির দিনের অবসরে আড্ডায় মেতে ওঠেন। আর কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী, সাংবাদিক, সংস্কৃতি কর্মীদের আড্ডাটা যেন এক রুটিন বাঁধা বিষয়। যে যেখানেই থাকুক নির্দিষ্ট সময়ে তারা নির্দিষ্ট রেস্টুরেন্ট, রেস্তরাঁ অথবা ক্যাফেটিরিয়ার ক্যান্টিনে এসে একে একে জড়ো হয়ে মেতে ওঠবে জস্পেশ আড্ডায়। প্রসঙ্গক্রমে লেখক-শিল্পী, সাহিত্যিকদের কিছু ছবি সেই পঞ্চাশের সময়কাল থেকে সবার মধ্যে এক ধরনের রোমাঞ্চকর আনন্দও জমিয়ে তুলত, যার কথা মনে হলেই যারা ওই আড্ডার সহযাত্রী ছিলেন তারা হয়ে পড়েন ভীষণ নস্টালজিক। এমনই এক আড্ডাস্থল ছিল পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক ঘরোয়া রেস্তরাঁয় এক সময় ঢাকার প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা নিয়ম করে রোজ দু-বেলা কিংবা কখনও দিনরাত চুটিয়ে আড্ডা দিতেন। সেই আড্ডা আজ কেবলই স্মৃতি। বিউটি বোর্ডিং আজও আছে কিন্তু সেই আড্ডাটা এখন আর জমে ওঠে না। পরবর্তীতে লেখকদের আড্ডা বোর্ড মার্কেটের মনিকা রেস্তরাঁয় ওঠে আসে। মনিকা থেকে শাহবাগের রেখায়নে। শিল্পী রাজীব আহসানের রেখায়ন ছিল সত্তর-আশি দশকের এক প্রাণোচ্ছল আড্ডাখানা। ছিল আরেক আড্ডা শাহবাগেরই সিনোরিনা স্ন্যাকবার। তবে সর্বত্রই আড্ডার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল চা আর চায়ের সঙ্গে সিগারেট। আড্ডা মানেই চা-সিগারেট। আর এই আড্ডার খপ্পরে পড়ে এক সময় কেউ কেউ লেখালেখিতেও জড়িয়ে যেতেন এবং এই লেখালেখিতে জড়িয়ে পড়া অনেক লেখকই পরবর্তীতে দেশের খ্যাতনামা লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জনেও সক্ষম হয়েছেন।

ঢাকার আরেকটা আড্ডাস্থল ছিল ৬৮, পুরানা পল্টনের সন্ধানী প্রেস। প্রবীণ-নবীন লেখক-শিল্পীবৃন্দ এখানে সেই ষাটের দশক থেকে সন্ধানী প্রেসে গাজী শাহাবুদ্দিন তথা মনু ভাইয়ের অফিসে আড্ডায় একবার এসে ডুবে গেলে ভেসে উঠার যেন ফুরসতই পেতেন না। ঢাকার আড্ডার আরও অনেক স্থান ছিল এক সময়। এখন সেগুলো শুধুই স্মৃতি। ঢাকার পাশাপাশি জেলা শহরগুলোতেও ছিল এমন অনেক রেস্তরাঁ কিম্বা চা স্টল। যেখানে এখন আর আগের মতো লেখকরা সমবেত হয়ে আড্ডায় মেতে ওঠে না। এমনই এক প্রখ্যাত বেস্টুরেন্ট হলো নারায়ণগঞ্জের শতবর্ষী বোস কেবিন। আমার দেখা এবং আড্ডায় অংশ নেয়া রাজশাহীর সাহেববাজারের রাজশাহী কেন্টিন, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট বাজারের ইংরেজ দা’র চা স্টলেও সকাল-বিকেল, সন্ধ্যায় জমত স্থানীয় সংস্কৃতি কর্মীদের প্রাণবন্ত আড্ডা।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর চা আড্ডার মধ্য দিয়েই হয়ে উঠেছে বিখ্যাত। এমনি অনেক আড্ডা হতো এক সময় ঢাকাতে। মাঝে মধ্যে আড্ডা হতো গুলিস্তানের উল্টোদিকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের অধুনা বিলুপ্ত বিখ্যাত ঢাকা রেস্তরাঁয়। যেখানে সাহেবী কায়দায় চা কফি পরিবেশন করা হতো। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ছিল পিঠাঘর (এখনও আছে); সেখানেও মৃদু আড্ডা বসত লেখক ও সংস্কৃতি কর্মীদের। এত যে আড্ডার গল্প; এই গল্পের প্রাণ এখন শাহবাগের আজিজ মার্কেট। নবীন-প্রবীণ সব বয়সী লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতি কর্মীদের এক মিলনস্থল হলো আজিজ মার্কেট। নানা ব্যস্ততার ফাঁকে সুযোগ পেলেই অনেকে ছুটে যান লেখক-শিল্পী বন্ধুটির সঙ্গে দেখা করে একঝলক চা-সিগারেট পানের ফাঁকে একটু আড্ডা দিয়ে মনকে ভাল করে বাড়ি ফিরে যাওয়া। এছাড়া পাড়া-মহল্লায় নানা পেশার নানা বয়সী মানুষের আড্ডাতো আছেই। আছে গ্রামে-গঞ্জে দিন শেষে বিকেল সন্ধ্যায় অবসরে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে আড্ডায় চায়ের কাপে তুফান তোলা। রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়ে আড্ডা শেষে ঘরে ফেরার তাগিদ। আছে খেয়াঘাটের আড্ডাও। শৈশব-কৈশোরের আড্ডার দুরন্ত ছায়াটা যে কী মিষ্টি ছিলÑ সেটাও কি কম।

বিকেলে হাতের কাজ সেরে গ্রামের বাড়ির উঠোনে বসে বউ-ঝিদের গল্পোচ্ছলে আড্ডায় মেতে ওঠার দৃশ্যতো আজ অম্লান।

শহর ছাড়িয়ে দূর গ্রামের নিঝুম রেলস্টেশনে বন্ধুদের নির্জন আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে আপ আর ডাউন ট্রেনের আসা-যাওয়া। শহরের বড় দালানের ছাদে বসে বৈকালিক আড্ডার অমোঘ দৃশ্যের ভিতরেও ফুটে ওঠে বন্ধুর কিংবা কাছের মানুষের সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটানোর চমতকার মুহূর্তগুলো। কখনো বা দলবেঁধে নদী তীরে বসে আড্ডা দেয়ার মায়াবী দৃশ্যের ভেতর দিয়ে বেজে ওঠা জাহাজের ভেঁপু ওই আড্ডায় যেন নতুন প্রাণের স্পন্দন দেয় জাগিয়ে।

আড্ডার যেন কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। অনর্গল ধুমবৃষ্টির মতোই আড্ডা এক অনিঃশেষ অনুভূতির পাতা যায় ঝরিয়ে। ঢাকার আড্ডা যেমন জীবন্ত হয়ে ধরা দেয় সবার মাঝে, তেমনি কফি হাউসের আড্ডাও কি কম মুখরিত। রিফ্রেশমেন্টের এক প্রধানতম প্রসঙ্গ হলো প্রিয় মানুষদের সঙ্গে প্রিয় কিছু সময় কাটিয়ে গল্প সেরে ওঠে পড়া। নানা অজুহাতে না ছুতো আড্ডা থেকে একরত্তি সটকে পড়ার গল্পও কি কম মনে পড়ার।

গ্রামে-গঞ্জের চা স্টলে সন্ধ্যার আড্ডাটা অব্যাহত থাকলেও ঢাকার আড্ডা যেন কেমন মিলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। নগরজীবনে প্রাত্যহিক নানা ব্যস্ততার ভেতর যেন সকল গল্প, সকল গান, সকল কথোপকথন এসে জড়ো হয়ে আছে সেলফোনের ফ্রি কোয়েন্সিং, ক্ষুদে বার্তা, ফেসবুকসহ নানা যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু এর পরেও আড্ডার আবেদন, আড্ডার গভীর ব্যঞ্জনা যেন চায়ের উষ্ণধারার মতোই মিলিয়ে যাওয়ার আগে রেখে যায় মন ভাল করে তোলার কয়েক পঙ্ক্তি কবিতার রেশ।

নির্বাচিত সংবাদ