২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সংসদীয় কমিটি কার্যকর করতে টিআইবির নির্দেশ

সংসদ রিপোর্টার ॥ সংসদীয় কমিটি গঠন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব ও ব্যক্তি স্বার্থ কাজ করে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবির মতে, রাজনৈতিক বা দলীয় প্রভাব, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, সদস্য কর্তৃক বা মন্ত্রণালয় কর্তৃক কমিটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে না করা, কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা না থাকা এবং হাজিরা, সাক্ষ্য প্রদান ও দলিলপত্র প্রদানে বাধ্য করার ক্ষেত্রে ক্ষমতা না থাকার কারণে বাস্তবে এই কমিটিগুলো প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ অবস্থায় সংসদীয় কমিটি কার্যকর করতে ১১ দফা সুপারিশসহ একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টিআইবি।

রবিবার দুপুরে ধানম-িতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে নবম সংসদের পুরো মেয়াদ এবং দশম সংসদের ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কমিটিগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ‘বাংলাদেশে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যকারিতা সমস্যা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবি’র রিসার্চ এ্যান্ড পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার জুলিয়েট রোজেটি ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফাতেমা আফরোজ। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খান এবং টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এ সময় রিসার্চ এ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নবম ও দশম জাতীয় সংসদে প্রথম অধিবেশনে সব কমিটি গঠন ও দশম সংসদে দলীয় প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে সদস্য নিযুক্তির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ গৃহীত হলেও আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিকসহ বিবিধ চ্যালেঞ্জের কারণে কমিটির ওপর সার্বিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় কমিটিগুলো কার্যকর হচ্ছে না। সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরে বলা হয়, সংবিধানের ৭৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করে কমিটির বৈঠকে সাক্ষী হাজিরা, সাক্ষ্য প্রদান ও দলিলপত্র দেয়া বাধ্যতামূলক করা; সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন করে সভাপতি ও সদস্যদের বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পৃক্ততার তথ্য প্রতিবছর হালনাগাদ করে তা জনসম্মুখে প্রকাশের বিধান করা এবং আর্থিক কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে সভাপতি নির্বাচন করা প্রয়োজন। এছাড়াও প্রাক-বাজেট আলোচনার জন্য অর্থবিল অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত তথ্য কমিটিতে প্রেরণ করা; কমিটির সুপারিশের আলোকে মন্ত্রণালয়ের গৃহীত ব্যবস্থা সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে লিখিতভাবে কমিটিকে জানানো এবং কমিটির প্রতিটি সভার কার্যবিবরণী সভা-পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে এবং পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক প্রতিবেদন প্রতিবছর সংসদের ওয়েবসাইটে প্রকাশের সুপারিশ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই সব ক্ষমতা। ১৯৯১ সালের পর থেকে এ ধরনের এককেন্দ্রিক ক্ষমতা চলছে। তিনিই একাধারে প্রধানমন্ত্রী, দলীয় প্রধান আবার সংসদের নেতাও। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এমনটি নয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সংসদীয় কমিটিগুলো চলে। সংসদীয় কমিটিগুলো প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন না করতে পারার এটা একটা প্রধান কারণ। তিনি বলেন, দেশে আসলে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র চলছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যুক্তরাজ্য ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আইনসভায় প্রতিনিধিত্বের সমানুপাতিক হারে কমিটিতে সদস্য ও সভাপতি করা হয়। মন্ত্রী কমিটির সভাপতি বা সদস্য হন না। আর্থিক কমিটিগুলোর সভাপতি বিরোধী দল থেকে নির্বাচন করা হয়। সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের নানা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত রয়েছে। দেশে সেসব উদাহরণ চর্চা করা হলে কমিটিগুলো কার্যকর হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে সরকারেও আছে। সুতরাং তাদেরই প্রমাণ করতে হবে তারা সত্যিকার অর্থে বিরোধী দল কি না।

এদিকে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিধি বহির্ভূতভাবে নবম সংসদের ৫১টির মধ্যে ছয়টি এবং দশম সংসদের ৫০টির মধ্যে পাঁচটি কমিটিতে সদস্যের কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ১১টি কমিটির মধ্যে নয়টি কমিটির ১৯ জন সদস্যের ব্যবসা সংক্রান্ত সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। যে কারণে কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে সম্মাননা ক্রেস্টে স্বর্ণ জালিয়াতির মতো বহুল আলোচিত ঘটনার তদন্ত কাজ ব্যক্তি স্বার্থে প্রভাবিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনসভার কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে কমিটিগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য নয়। সংসদীয় কমিটির দায়িত্ব থাকলেও নবম ও দশম সংসদে কোন বিলের জনমত যাচাই-বাছাই করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বিধিতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় কমিটিগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এছাড়া কমিটির কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা খুবই সীমিত পর্যায়ে আছে।