২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বীকার করলেন প্রধান বিচারপতি

স্বীকার করলেন প্রধান বিচারপতি
  • সাকা পরিবারের পক্ষ থেকে অনুরোধ;###;“আপনি বলেছিলেন- সাকার ফ্যামিলি
  • আপনাকে বলছে আমাকে না রাখার জন্য...
  • প্রধান বিচারপতি- হ্যাঁ হ্যাঁ”...
  • হ্যাঁ, না দিতে বলেছিলেন।;###;“আপনি বললেন না কালকে, মওদুদ আসছিলো। আপনার হাতে পায়ে ধরেছে।
  • প্রধান বিচারপতি- হ্যাঁ। ...হাতে পায়ে ধরছে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর আপীল শুনানিতে ওই বিচারপতিকে না রাখতে তার পরিবারের পক্ষ থেকে অনুরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে এক বিচারপতির সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়টি শুনানিতে স্বীকার করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। শুনানিতে স্বীকার করে তিনি বলেছেন, আমি গ্রহণ করছি যে, আমি কথা বলেছি, তবে তাতে কি হয়েছে? প্রধান বিচারপতি হিসেবে সবার জন্যই আমার দরজা খোলা। তিনি বলেন, সব বিচারপতিই আমার সঙ্গে কথা বলেন, তবে এতে বেঞ্চ গঠনের ওপর কোন প্রভাব পড়ে না। জনকণ্ঠের সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের বিরুদ্ধে জারি করা আদালত অবমাননার শুনানিতে সোমবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এসব কথা বলেন। পরে শুনানি শেষে আদেশের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ঠিক করা হয়েছে।

সোমবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে ৬ সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চে এই রুলের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এই বেঞ্চে আপীল বিভাগের সাত বিচারপতির মধ্যে শুধু বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক উপস্থিত ছিলেন না। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্াব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি ইমান আলী ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

শুনানিতে আইনজীবী সালাউদ্দিন দোলন সাকা চৌধুরীর আপীল শুনানির বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি ও অন্য এক বিচারপতির কথোপকথনের অংশ বিশেষ আদালতে পড়ে শোনান। জনকণ্ঠের সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের দাখিল করা জবাবের সঙ্গে যে অডিও সিডি উপস্থাপন করা হয়েছে, সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে দেয়া হলোÑ

অন্য বিচারপতি: এই যে সেদিন বললেন না, আপনি সেদিন বললেন যে, সাকার ফ্যামিলি আপনার কাছে এপ্রোচ করছে আমারে না করার জন্য কিন্তু পরবর্তী টাইমে দেন।

প্রধান বিচারপতি: সাকারটাতো হিয়ারিং হয়ে গেছে।

অন্য বিচারপতি: না, সেটা বলতেছি না। আপনি বলছিলেন, সাকার ফ্যামিলি আপনাকে বলছে আমাকে না রাখার জন্য এ জন্য রাখতে পারেন নাই।

প্রধান বিচারপতি: হ্যাঁ..হ্যাঁ।

অন্য বিচারপতি: কিন্তু, এখন পরবর্তীটা

প্রধান বিচারপতি: পরবর্তীতে হিয়ারিংয়ে যেটাই যাই, আমি আপনাকেই রাখব।

অন্য বিচারপতি: আমার কিন্তু আছে আর এক মাস।

প্রধান বিচারপতি: হ্যাঁ..?

অন্য বিচারপতি: এক মাস আছে।

প্রধান বিচারপতি: এক মাস আছে? কবে শেষ হবে?

অন্য বিচারপতি: আমারতো... মানে এই ছুটিতেই শেষ। নইলে আর পাব না কিন্তু। আমাকে দেন। অন্তত সাকার ফ্যামিলি থেকে আপনাকেও বলছে আপনি দিতে পারেন নাই, সাকার ফ্যামিলি মেম্বাররা বলছে। কিন্তু এইটাতো...

প্রধান বিচারপতি: সাকার ফ্যামিলি মেম্বার মানে, সাকার পক্ষ থেকে।

অন্য বিচারপতি: যাই হোক, সাকার পক্ষ থেকে বলছে আমারে না দেয়ার জন্য।

প্রধান বিচারপতি: হ্যা না দিতে বলছিলেন।

মওদুদ আহমেদের বাড়ির মামলার বিষয়ে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে বেঞ্চে না রাখতে মওদুদ আহমেদ প্রধান বিচারপতির হাতে পায়ে ধরেছেন, এ সংক্রান্ত একটি অডিও সিডিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই সিডি থেকে কিছু অংশ তুলে দেয়া হলো।-

অন্য বিচারপতি: আচ্ছা কালকে তো ১১ নাম্বারে মওদুদের। মওদুদেরটা ১১ নাম্বারে। মওদুদেরটায় কিন্তু আমার নাম ছিলো লিস্টে।......আজকে কিন্তু আমার নাম নেই।......আমি ছিলাম কিন্তু। আপনি কালকে বললেন না কালকে, মওদুদ আসছিলো। আপনার হাতে পায়ে ধরছে।

প্রধান বিচারপতি: হ্যাঁ।

অন্য বিচারপতি: কি বলছে?

প্রধান বিচারপতি: আপনি দয়া করে যাকে দেন চৌধুরী সাহেবকে দিবেন না। হাতে পায়ে ধরছে।

অন্য বিচারপতি: ধরছেতো কি হইছে?

প্রধান বিচারপতি: অস্পষ্ট

অন্য বিচারপতি: কি বলছে, যে মানিক সাহেবকে দিবেন না?

প্রধান বিচারপতি: হ্যাঁ, জি, জি।

অন্য বিচারপতি: হ্যাঁ, কি বলছে।

প্রধান বিচারপতি: চৌধুরী সাহেবকে বাদ দিয়ে যাকে দেন। তাকে দিয়েন না।

তিন দিনের শুনানিতে জনকণ্ঠের পক্ষে ছিলেন এ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন দোলন। তাকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার মুন ইমু রহমান খান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সোমবার সকাল ৯টায় শুনানি শুরু থেকেই এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বারের ডায়েসে দাঁড়িয়ে ১ ঘণ্টা বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি জনকণ্ঠসহ সাংবাদিকদের তীব্র সমালোচনা করেন।

সোমবার আদালতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ কলামিস্ট অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, মহাসচিব আবদুল জলিল ভূইয়া, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সম্পাদক সুভাষ সিংহ রায়, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন, ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি, এম বদি-উজ-জামান ও জনকণ্ঠের সাংবাদিক ও কর্মকর্তাবৃন্দসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা।

শুনানি শেষে জনকণ্ঠের আইনজীবী সালাউদ্দিন দোলন সাংবাদিকদের বলেন, শুনানিতে আমরা প্রথমে বলেছি, আমরা কোন আদালত অবমাননা করিনি। রিপোর্টটি হয়েছিল ঘটনা এবং সত্যের ওপর ভিত্তি করে। সত্যের ওপর ভিত্তি করে লেখা রিপোর্ট আদালত অবমাননা নয়। জনকণ্ঠ আদালত অবমাননা করেনি। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুলের জামিন সংক্রান্ত বিষয়ে আদালত জানতে চাইলে আমরা বলেছি, এখানে কলামিস্ট মনে করেন, যাদের অর্থনৈতিকভাবে অনেক সঙ্গতি আছে, তারা বড় আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন। কিন্তু গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সেই সঙ্গতি নেই। তারা উচ্চ আদালত পর্যন্ত আসতে পারেন না। অনেকে টাকার অভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে না পাড়ায় দীর্ঘদিন যাবত বিনা বিচারে জেলে আটক আছেন। এই মর্মে একটি হলফনামা আজ (মঙ্গলবার) দাখিল করব বলে আদালতে জানিয়েছি।

তিনি বলেন, আমরা বলেছি সাংবাদিকরা যখন তাদের নিজস্ব সোর্স থেকে তথ্য পেয়ে থাকেন তখন দেশ ও জাতির স্বার্থে সকল কিছু যাচাই বাছাই করে সেই রিপোর্ট প্রচার করে। এখানে তাদের যে তথ্য ছিল তার ভিত্তিতেই এই রিপোর্ট করেছে। তিনি বলেন, আদালতে আমরা আরও বলেছি, বেঞ্চ পুনর্গঠন করা এবং যে কোন বিচারপতিকে বেঞ্চে রাখা বা বেঞ্চ থেকে বাদ দেয়ার ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির রয়েছে। কিন্তু সেটা হতে হবে প্রধান বিচারপতির নিজস্ব বিচারিক চিন্তা চেতনার ওপর ভিত্তি করে। তিনি আরো বলেন, কোন মামলায় জড়িত কোন পক্ষের পরামর্শ বা অনুরোধ অনুযায়ী বেঞ্চ পুনর্গঠন করা অসাংবিধানিক।

তিনি বলেন, আমরা কথোপকথনের অপর প্রান্তের বিচারপতি ও একটি বিদেশী এয়ারলাইন্সের কান্ট্রি ম্যানেজারকে সাক্ষী হিসেবে সমনের জন্য দরখাস্ত দিয়েছি। প্রধান বিচারপতি ক্যাসেটের কথোপকথন ওনার নিজের বলে স্বীকার করেছেন, এ জন্য সাক্ষীকে আনার প্রয়োজন হয়নি। তিনি বলেন, আমরা বলেছি, এই রিপোর্টের কারণে বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করি, এই জন্য যে, জুডিশিয়ারি এবং সাংবাদিক সমাজ কারও বিরুদ্ধে নয়। সাংবাদিক সমাজের দায়িত্ব সম্পর্কে বলেছি, গত ৪০ বছরের ইতিহাসে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্রান্তিকালে সাংবাদিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই জনকণ্ঠের সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়েছি।

গত ১৬ জুলাই দৈনিক জনকণ্ঠে ‘সাকার পরিবারের তৎপরতা/ পালাবার পথ কমে গেছে’ শিরোনামে উপসম্পাদকীয় লেখেন নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়। ২৯ জুলাই সাকা চৌধুরীর আপীলেও মৃত্যুদ- বহাল রাখার রায়ের পরপরই জনকণ্ঠের সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদককে তলব করে আদেশ দেন আদালত। আদালতের নির্দেশ অনুয়ায়ী ৩ আগস্ট জনকণ্ঠের সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ (এম এ খান মাসুদ) এবং নিবন্ধের লেখক নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায় আদালতে উপস্থিত হন। এবং তিন মাসের সময়ের আবেদন করেন। পরে আদালত এক সপ্তাহের সময় দেন। পরবর্তীতে গত রবিবার ও সোমবার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আগামী বৃহস্পতিবার আদেশের জন্য দিন ঠিক করেন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ।

২৯ জুলাই আদালত আদালত অবমাননার সুয়োমটো রুল জারি করেন। ঐ রুলে উল্লেখ করা হয়, নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি বলেছেন, আদালতের গঠনমূলক সমালোচনা করা যাবে। তাই তাঁর কাছে বিনীত প্রশ্নÑ ১৪৩ জনকে পুড়িয়ে মারার অন্যতম হুকুমের আসামি কিভাবে চিকিৎসার জন্য জামিন পায়। জমির আল নিয়ে লাঠি দিয়ে মাথা ফাটিয়ে হাজার হাজার দরিদ্র আসামি যেখানে বছরের পর বছর জেলে আটকা। কারণ, তারা খুনের আসামি। সেখানে রাজনীতির নামে প্রকাশ্যে এই ১৪৩ জনকে খুন করার পরেও সে জামিন পাবে। এইকি বিচারের ন্যায়দ-। বিচারকরা নিশ্চয়ই জানেন, কেন তারা পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে এভাবে নৃশংস হত্যাকা- চালাচ্ছে। বাস্তবে এটা আইএসের পদ্ধতি। আইএস সবখানে এভাবে ভয়াবহ নৃশংসতা সৃষ্টি করে দেশের মানুষকে পাজেলড করে দিতে চায়। যাতে কেউ প্রতিরোধে এগিয়ে না আসে। ফখরুলের জামিনের ভেতর দিয়ে বিচারকরা কি বাংলাদেশকে আইএসের পথে অগ্রসর হওয়ার সুবিধা করে দিলেন না? এ সব ঘটে কি ফখরুলের টাকা আছে বলে আর যারা জমির আল নিয়ে মাথা ফাটায় ওদের টাকা নেই বলে ?

এখানেই শেষ নয়। ৭১-এর অন্যতম নৃশংস খুনী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী । নিষ্পাপ বাঙালীর রক্তে যে গাদ্দারগুলো সব থেকে বেশি হোলি খেলেছিল এই সাকা তাদের একজন। এই যুদ্ধাপরাধীর আপীল বিভাগের রায় ২৯ জুলাই। পিতা মুজিব তোমার কন্যাকে এখানেও ক্রুশে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তাই যদি না হয় তা হলে কিভাবে যারা বিচার করছেন সেই বিচারকদের একজনের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে সালাউদ্দিন কাদেরের পরিবারের লোকেরা ? তারা কোন্ পথে বিচারকের কাছে ঢোকে। আইএসআই ও উলফার পথে না অন্য পথে ? ভিকটিমের পরিবারের লোকদের কি কখনও কোন বিচারপতি সাক্ষাত দেয়? বিচারকের এথিকসে পড়ে? কেন শেখ হাসিনার সরকারকে কোন কোন বিচারপতির এ মুহূর্তের বিশেষ সফর ঠেকাতে ব্যস্ত হতে হয়। সে সফরের উদ্যোক্তা জামায়াত-বিএনপির অর্গানাইজেশান। কেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী আগে গিয়ে সেখানে অবস্থান নেন। কি ঘটেছে সেখানে। ক্যামেরনই পরোক্ষভাবে বলছেন, সকল সন্ত্রাসীর একটি অভয়ারণ্য হয়েছে লন্ডনে।