২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চাপাতির পাশাপাশি বিশেষ ইনজেকশন ব্যবহার করা হতে পারে

চাপাতির পাশাপাশি বিশেষ ইনজেকশন ব্যবহার করা হতে পারে

গাফফার খান চৌধুরী ॥ ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় হত্যাকা-ে চাপাতির পাশাপাশি বিশেষ ইনজেকশন ব্যবহার করা হতে পারে। ইনজেকশনটি মানবদেহের রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। ফলে দ্রুততার সঙ্গে রক্তক্ষরণ হয়ে মৃত্যু নিশ্চিত হয়। যে কারণে কোপানোর পর ৩ থেকে ৪ মিনিটের মধ্যেই নিলয়ের মৃত্যু হয়। এখন পর্যন্ত হত্যাকা-ের শিকার হওয়া ছয় ব্লগারের মধ্যে বুয়েট ছাত্র আরিফ রায়হান দীপ ছাড়া রাজীব, লেখক অভিজিত রায়, সিলেটের অনন্ত বিজয় দাশ, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, গোপীবাগে একই বাড়িতে ছয় জনকে এবং ফার্মগেটে চ্যানেল আইয়ের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকা-েও বিশেষ ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

নিলয় হত্যাকা-ের ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। নিলয় হত্যাকা-ের সঙ্গে অভিজিত হত্যাকা-ের মিল খুঁজে পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই)। ছয় ব্লগার ছাড়াও গোপীবাগে সিক্সমার্ডার ও ফার্মগেটে চ্যানেল আইয়ের উপস্থাপক মাওলানা নরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকা-ের সঙ্গে সদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম জড়িত বলে তদন্তকারী সংস্থা প্রায় শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে।

গত ৭ আগস্ট শুক্রবার দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন পূর্ব গোড়ানের ৮ নম্বর সড়কের ১৬৭ নম্বরের পাঁচতলা বাড়ির পঞ্চমতলার পূর্বদিকের নিজ বাসায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় নিলয়কে। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিলয়ের স্ত্রী আশামণি বলেন, বাড়ি ভাড়া নেয়ার কথা বলে প্রথমে ২০ থেকে ২১ বছর বয়সী এক যুবক ঘরে ঢোকে। ঢুকেই মোবাইল ফোন টিপতে থাকে। ২/৩ মিনিট পরেও ওই যুবক বের হচ্ছিল না। যুবককে বাড়ি ভাড়ার বিষয়ে বাড়ির মালিকের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করার পরামর্শ দেয় নিলয়। এ সময় আরও তিন জন দ্রুত তাদের ঘরে ঢুকেই নিলয়কে এলোপাতাড়ি চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকে। আমাকে পিস্তল ঠেকিয়ে বারান্দায় আটকে রাখে। আমার বোন তন্বীকে রান্না ঘরে ঢুকিয়ে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। তিনজন নিলয়কে মাত্র ৩ থেকে ৪ মিনিটের মধ্যে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর চলে যায়।

মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা সূত্র বলছে, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামতের মধ্যে রক্তমাখা টি শার্টটি খুনীদের। নিলয়কে হত্যার পর ফ্লোরে প্রায় এক ইঞ্চি পুরু রক্ত জমাট বেঁধে পড়ে ছিল। নিলয়কে প্রথম কোপটি দেয়া হয় পেছন থেকে। মাত্র ৩ থেকে ৪ মিনিটের মধ্যে নিলয়ের মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায় খুনীরা।

নিলয়কে চাপাতি দিয়ে কোপানোর পর তার দেহে বিশেষ ইনজেকশন দেয়া হতে পারে।

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক লেখক ব্লগার প্রকৌশলী অভিজিত রায়কে অমর একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে টিএসসিতে কুপিয়ে হত্যা করে দুই জন। পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকে একটি ব্যাগ উদ্ধার হয়। ব্যাগে একটি বিশেষ ইনজেকশন পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ল্যাবরেটরিতে ইনজেকশনটির পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, উদ্ধারকৃত ইনজেকশনটি একটি বিশেষ ধরনের ওষুধ দিয়ে তৈরি। ওই ইনজেকশনে থাকা ওষুধ মানবদেহের রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না।

তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, কুপিয়ে জখম করার পর অভিজিতের দেহে খুনীরা একাধিক ইনজেকশন দিয়ে যেতে পারে। যে কারণে টিএসসি থেকে স্বল্প দূরত্বে থাকা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরেও অভিজিতকে বাঁচানো যায়নি। অভিজিত হত্যাকা-ের ঘটনায় ৭ জন শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জনের ছবি পাওয়া গেছে। বাকি চারজনের মধ্যে কারও কারও দেহ ও মুখম-লের ঝাপসা ছবি সংগ্রহ করা গেছে। হত্যাকা-ে ব্যবহৃত ৭টি মোবাইল ফোনের মধ্যে একটি উদ্ধারও হয়েছে। হত্যাকারীরা কোপানোর পর কারও মৃত্যু নিশ্চিত করতে ওই ইনজেকশন ব্যবহার করতে পারে। রক্ত জমাট বাঁধতে না পারায় দ্রুত রক্তক্ষরণ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলছেন, এখন পর্যন্ত খুন হওয়া ছয় ব্লগারের মধ্যে বুয়েট ছাত্র আরিফ রায়হান দ্বীপ ছাড়া ৫ জন এবং গোপীবাগে বিশ্বত্রাণকর্তা দাবিদার লুৎফুর রহমান ও ফার্মগেটে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের উপস্থাপক মাওলানা নুুরুল ইসলাম ফারুকীকে হত্যার পর তাদের শরীরে বিশেষ ধরনের ইনজেকশন ব্যবহার করা বিচিত্র নয়।

প্রসঙ্গত, অভিজিত হত্যা এবং নিলয় হত্যাকা-ের মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে। অভিজিত হত্যাকা-ের ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামতের পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে। আর নিলয় হত্যাকা-ের ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামতের পরীক্ষা নিরীক্ষা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিতে চলছে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, নিলয় হত্যাকা-ে প্রয়োজনে এফবিআইয়ের সহায়তা নেয়া হবে। এফবিআই সহায়তা করতে প্রস্তুত আছে। ব্লগাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। পাশাপাশি কোন ব্লগার যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন, তবে তাঁরা ঢাকা মহানগর পুলিশ বা ডিবি পুলিশের সঙ্গে সরাসরি বা টেলিফোনে যোগাযোগ করতে পারেন। পুলিশের তরফ থেকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

মনিরুল ইসলাম জানান, এখন পর্যন্ত হত্যাকা-ের শিকার হওয়া ৬ ব্লগারের মধ্যে রাজীব হত্যায় ৬ জন গ্রেফতার হয়। এদের মধ্যে ৫ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। তারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। বুয়েট ছাত্র দ্বীপ হত্যাকারী মেজবাহ উদ্দিন, আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর হামলাকারীদের মধ্যে ৩ জন, ওয়াশিকুর রহমান বাবুর তিন হত্যাকারী গ্রেফতার হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। নিলয় হত্যাকারীরাও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের একটি দল বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্রেফতারকৃতরা আল কায়েদা এবং সিরিয়া ও ইরাকভিক্তিক জঙ্গী সংগঠন আইএস-এর অনুসারী। এসব হত্যাকা-ের মূল হোতাদের অনেকেই দেশের বাইরে অবস্থান করছে। পাকিস্তান থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামের জঙ্গী সংগঠনটি তদারকি করা হচ্ছে। তাদের গ্রেফতার করতে ইন্টারপোলসহ বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালানো হচ্ছে।