১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমস্যার পাহাড়ে ধুঁকছে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ১০ সরকারী কলেজ

সমস্যার পাহাড়ে ধুঁকছে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ১০ সরকারী কলেজ

বিভাষ বাড়ৈ ॥ সমস্যার পাহাড় নিয়ে ধুঁকছে রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত দেশের ঐতিহ্যবাহী সরকারী কলেজগুলো। শিক্ষক, আবাসিক ও শ্রেণীকক্ষ সঙ্কটসহ নানামুখী অব্যবস্থাপনায় হোঁচট খাচ্ছে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের স্বনামধন্য এ প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক কার্যক্রম। সঙ্কট এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ঐতিহ্যবাহী ১০ কলেজে দুই লাখ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র দুই হাজার। শিক্ষার্থীর হার অনুপাতে যত সংখ্যক শিক্ষক থাকার কথা কোন কলেজেই তার লেশমাত্রও নেই। অধিকাংশের অবস্থা রীতিমতো করুণ। শিক্ষার্থী সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান সরকারী তিতুমীর কলেজে ৫০ হাজার ৪৫০ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র ২২০। ভাল নয় অন্যগুলোর অবস্থাও। শিক্ষক সঙ্কট ছাড়াও অবকাঠামোর অভাব, পরীক্ষার হল না থাকা, শ্রেণীকক্ষ সমস্যা, হোস্টেলে আসনস্বল্পতাসহ বহুমুখী সমস্যায় দিশেহারা এসব প্রতিষ্ঠান।

দেশের ঐতিহ্যবাহী কলেজের শিক্ষা সঙ্কট নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এ উদ্বেগজনক চিত্র। কলেজগুলোর বেহাল শিক্ষা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা অধিদফতরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোও। আর শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা হতাশ কণ্ঠে বলছেন, আমাদের সমস্যা দেখার কেউ নেই। শিক্ষক সঙ্কট নিয়েও যেন কেউ ভাবছে না। জানা গেছে, বিধান অনুসারে ৪৫ শিক্ষার্থীর জন্য একজন তো দূরের কথা ১০০ থেকে ২০০ শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী আছে ৫০ হাজার পর্যন্ত। অথচ শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত হবে ৩০:১ অর্থাৎ প্রতি ৩০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকবেন। চলমান আইনেও বলা আছে, কোন বিষয়ে ডিগ্রী (পাস) ও অনার্স থাকলে ১০ এবং মাস্টার্স কোর্স হলে শিক্ষক থাকবেন ১২। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা শহরে পুরনো ঐতিহ্যবাহী মোট ১০ সরকারী কলেজ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন সরকারী মহিলা কলেজ, সরকারী তিতুমীর কলেজ, সরকারী বাঙলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারী কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, বদরুন্নেসা সরকারী মহিলা কলেজ, গার্হস্থ্য সরকারী কলেজ, সরকারী বিজ্ঞান কলেজ এবং সরকারী সঙ্গীত কলেজ। অনার্স মাস্টার্স পর্যায়ে রয়েছে একটি সরকারী আলীয়া মাদ্রাসাও। তবে বছরের পর বছর ধরে চলা সঙ্কটে প্রাচীন এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জৌলুস ও প্রভাব দিন দিন কমে যাচ্ছে। ঐতিহ্য হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

শিক্ষক সঙ্কটের সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে রাজধানীর সরকারী তিতুমীর কলেজে। এখানে একই সঙ্গে আছে শিক্ষার্থীদের শ্রেণী কক্ষের সঙ্কট, আবাসন সঙ্কটসহ নানা সমস্যা। শিক্ষার্থী সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় এই প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা অর্ধলাখ। এই মুহূর্তে ৫০ হাজার ৪৫০ শিক্ষার্থী আছে এখানে। অধ্যক্ষ আবু হায়দার আহমেদ নাসের সঙ্কটের কথা বলতে গিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। বলছিলেন, নানা সঙ্কট আর সীমাবদ্ধতায় ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলো আসলেই সুনাম হারিয়ে ফেলছে। আগের সেই সুনাম নেই, মানও নেই। কেন এ অবস্থা? প্রশ্নের উত্তরে অধ্যক্ষ বলেন, বলে কি হবে। বলাই হবে, কাজ হবে না। এত বড় প্রতিষ্ঠান তিতুমীর কলেজ। অর্ধলাখ শিক্ষার্থী অথচ শিক্ষক মাত্র ২২০। সব দিকেই সঙ্কট। যেদিকেই তাকাবেন সসম্যা আর সমস্যা। শিক্ষক সঙ্কট ছাড়াও ক্লাস রুম স্বল্পতা, শিক্ষার্থীদের আবাসন সঙ্কটসহ অন্যান্য অবকাঠামো সঙ্কটও চরম আকার ধারণ করেছে। কত বছরে যে একটা নতুন ভবন হয়নি তার হিসেব মেলানো ভার। যদি কখনও করাও হয় কাজে লাগে না। ঠিকভাবে কাজ হয় না। কোনমতে কাজ করেই শেষ। এমন নানা সমস্যায় আমাদের কলেজের মতো প্রতিটি প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুনাম হারাচ্ছে। তাছাড়া মানও ধরে রাখা যাচ্ছে না। মানের সঙ্কটের জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় অমনোযোগী ও শিক্ষকদের চেষ্টার অভাবিকেও দায়ী করলেন অধ্যক্ষ।

বলছিলেন, আগের দিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী দুই পক্ষই ছিল মনোযোগী। হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক বলছিলেন, ৫০ হাজার ৪৫০ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন খুবই কম। শিক্ষক নেয়া খুব জরুরী। তবে একই সঙ্গে আছে আমাদের শ্রেণীকক্ষের ভয়াবহ সঙ্কট। অর্ধলাখ শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণীকক্ষ আছে মাত্র ৩৪টি। অধিকাংশ শিক্ষকের কোন কক্ষই নেই। শিক্ষকরা বলছেন, অর্ধলক্ষাধিক শিক্ষার্থীর এ কলেজে মাত্র একটি ছাত্র ও একটি ছাত্রী হল আছে।

আধুনিক ধারার শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনের জন্য ঢাকা কলেজের সুনাম রয়েছে। ১৮৪১ সালে ঢাকা ইংলিশ সেমিনারি স্কুলকে একটি কলেজ বা একটি আঞ্চলিক উচ্চতর ইংরেজী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়, যার নাম হয় ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজ বা সংক্ষেপে ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা ইংলিশ সেমিনারি স্কুলের নাম দেয়া হয় ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল। এ কলেজ প্রতিষ্ঠার পরপরই বদলে যায় পুরো ঢাকার চালচিত্র। জে. আয়ারল্যান্ডকে ঢাকা কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল নিয়োগ করা হয়। তিনি পূর্ববঙ্গের স্কুল-কলেজ পরিদর্শন করে ১৮৫৯-৬০ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন, ঢাকা কলেজে যে কোর্স পড়ানো হয়, তা লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ পরীক্ষার কোর্সের সমতুল্য এবং কোর্স সমাপনে ছাত্রদের জ্ঞানের পাঁচটি শাখায় পরীক্ষা দিতে হয়। এ পাঁচটি বিষয় ছিল ইংরজীসহ দুটি ভাষা, ইতিহাস এবং ভূগোল, গণিত, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান (পদার্থবিদ্যা) এবং মানসিক নৈতিক বিজ্ঞান। ১৮৭৫ সালে ঢাকা কলেজ একটি বড় সম্মান লাভ করে। সে বছর থেকে ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান শাখা চালু হয়। বিজ্ঞান শাখা খোলার পর ঢাকা কলেজে ছাত্রভর্তির হিড়িক পড়ে। একইসঙ্গে এ কলেজের অবকাঠামোগত পরিবর্তনও হয়। কিন্তু এখন এখানে কেবল সঙ্কট আর সঙ্কট। দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজে ২০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র আড়াইশ জন। শিক্ষকরা বললেন, কয়েক হাজার শিক্ষকের ভার পড়েছে কয়েক শিক্ষকের কাঁধে। শিক্ষক সঙ্কটে একই শিক্ষককে উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের ছাত্রদের ক্লাস নিতে হয়। এ কলেজে অনেক বিভাগ আছে, যেসব বিভাগের নিজেদের শ্রেণী কক্ষই নেই। ছাত্রদের নিয়মিত খোঁজ রাখতে হয় কোন শ্রেণীকক্ষ খালি আছে। এখানে শ্রেণীকক্ষের সঙ্কট তীব্র। বড় সঙ্কট আবাসনের। ঢাকা কলেজের নর্থ ও সাউথ হোস্টেল সময় সময় সরকারদলীয় ছাত্রনেতারা নিয়ন্ত্রণ করে। ছাত্রদের জন্য ঢাকা কলেজে সাতটি ছাত্রাবাস রয়েছে। হলগুলোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সাধারণ ছাত্ররা আতঙ্কে থাকে। রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া হলে থাকা প্রায় অসম্ভব। এক শিক্ষার্থী আকাশ বলছিলেন, আমরা ঢাকা কলেজে শিক্ষার পরিবেশ পাচ্ছি না। নানা সমস্যা আর ছাত্র সংগঠনের দলীয় কোন্দলে সব সময় আতঙ্কে থাকি। শিক্ষক সঙ্কটে প্রায়ই ক্লাস হয় না।

দেশের নারী শিক্ষায় ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইডেন মহিলা কলেজে ছাত্রী রয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার। শিক্ষক আছেন মাত্র ২৪৫। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক হোসনে আরা অন্য কলেজের সঙ্গে তুলনা করে অবশ্য বলছিলেন, সেই তুলনায় আমাদের কলেজে শিক্ষক ভালই আছেন। তবে নতুন বিভাগ আমরা খুলতে যাচ্ছি। উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। নতুন বিভাগ হলেই আমাদের অবশ্য শিক্ষক প্রয়োজন হবে। ইডেন কলেজের ছাত্রীরা জানায়, কলেজের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা হোস্টেলের সিট। নেত্রীদের সিটবাণিজ্য এখানে বড় সঙ্কট। হলের সিটের বিনিময়ে বিভিন্ন সময়ে নেত্রীদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজ করানোর মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী হাসনাহেনা বলছিলেন, আমরা গুরুজনদের কাছ থেকে ইডেন কলেজের সুনামের কথা শুনেছি। কিন্তু এখন কেবল সমস্যাই দেখি।

কবি নজরুল সরকারী কলেজে বর্তমানে ২০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে এ কলেজে। শিক্ষক আছেন ১০০। এখন এ কলেজে ১৭ একাডেমিক বিভাগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য আছে একটি ছাত্রাবাস, একটি মসজিদ, একটি খেলার মাঠ, চারটি কম্পিউটার ল্যাব। আছে মাত্র একটি আবাসিক হল। কলেজটিতে ক্লাসরুমের তীব্র সঙ্কট। ১৮৭২ সালে নির্মিত জরাজীর্ণ ভবনে চলে কলেজের কার্যক্রম। যে কোন মুহূর্তে ভবন ধসের আশঙ্কা রয়েছে। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আকবর বলছিলেন, শিক্ষক তো নেই তার ওপর ক্লাসরুম সঙ্কট। অনেক সময় ক্লাসের পুরোটা সময়ই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমাদের কোন পরিবহন সুবিধা নেই, আবাসন সুবিধাও প্রায় একই অবস্থা।

মিরপুরের সরকারী বাঙলা কলেজে শিক্ষার্থী রয়েছে ২৫ হাজার। অথচ তাদের শিক্ষক রয়েছেন দেড়শ’। শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে ১২ হাজার ছাত্রছাত্রীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন একশ জনেরও কম। সরকারী বিজ্ঞান কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজের অবস্থাও একই। প্রতিটি কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরাই বলছেন, পরীক্ষার হল না থাকা, ক্লাস রুম স্বল্পতা, শিক্ষার্থীদের আবাসন সঙ্কটসহ অন্যান্য অবকাঠামো সঙ্কটও চরম আকার ধারণ করেছে। পৃথক পরীক্ষার হল না থাকায় প্রতিটি কলেজই এক স্তরের পরীক্ষার সময় অন্য সকল শ্রেণীর ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়। ফলে বছরের বড় একটা সময় ক্লাস বন্ধই রাখতে হয়।

এদিকে ঢাকার পাশেই টঙ্গী সরকারী কলেজে ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক মাত্র একশ’ জনের মতো। শিক্ষার্থীদের জন্য নেই বলতে গেলে কোন শ্রেণী কক্ষই। তিন-চারটি শ্রেণী কক্ষে চলছে ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর কাজ। নেই পরীক্ষার হল। শিক্ষকরা আক্ষেপ করে বলছিলেন, আমরা শিক্ষক চাই। কাজ হচ্ছে না। শ্রেণী কক্ষের সমস্যা আবাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানা গেছে, ঢাকাসহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজের সমস্যা নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি চেষ্টা করেছিল কয়েকবার। সমস্যা চিহ্নিত ও দূরীকরণে গঠিত সাব-কমিটির প্রতিবেদনেও বেরিয়ে এসেছিল জটিলতার চিত্র। সঙ্কট সমাধানে কমিটি নিয়মিত বা প্রয়োজনের বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে অন্তত শিক্ষক সঙ্কট লাঘবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপাারিশ করেছিল। কমিটি বলেছে, ৪/৫ জন শিক্ষক নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক, তিন বছরের ডিগ্রী (পাস) কোর্স, চার বছরের অনার্স ও মাস্টার্সের পাঠদান দুঃসাধ্য।

সঙ্কট উত্তরণে শিক্ষাবিদদের পরামর্শ ॥ দেশের ঐতিহ্যবাহী এ কলেজগুলোর সমস্যা নিয়ে এর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উদ্বিগ্ন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরাও। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলছিলেন, অপরিকল্পিত ও অদূরদর্শী সম্প্রসারণই আজকে এ কলেজগুলোর দুরবস্থার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকের সংখ্যা না বাড়িয়ে অবকাঠামো সম্প্রসারণ না করে ইচ্ছেমতো শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। এই যে অপরিকল্পিত শিক্ষার্থীর সম্প্রসারণ এটাই আজকের সঙ্কটের কারণ। আজ হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষক। এভাবে মান ঠিক রাখা যায়না। এ শিক্ষাবিদ সঙ্কটের আরেকটি কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন এইচএসসি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একই প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার কথা। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের আরেকটি দিক হচ্ছে পাল্লা দিয়ে অনার্স ও মাস্টার্স বিষয় খুলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। এর ফলে সেখানে এইচএসসির শিক্ষার্থীরা অবহেলার শিকার হচ্ছে। শিক্ষকরাও অধিক মনোযোগ দেন অনার্স ও মাস্টার্সের দিকে। সঙ্কটের সমাধানের জন্য এই অপরিকল্পিত ও অদুরদর্শী সম্প্রসারণ বন্ধ করা জরুরী। জরুরী অবকাঠামোর দিকে নজর দেয়া, জরুরী শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানো, জরুরী শ্রেণীকক্ষ বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবীর জনকণ্ঠকে বলছিলেন, আসলে এত সমস্যা নিয়ে চলতে গেলে মান বলেন আর ঐতিহ্যই বলেন তা ঠিক রাখা যায় না। এর প্রতিটি কলেজের দিকে তাকালে একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। প্রথমত আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত একটা সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। তিতুমীর কলেজে যে পরিমাণ শিক্ষার্থী তার সকলে এক দিনে আসলে মহাখালী এলাকার পুরোটাতেও জায়গা হবে না। এভাবে মান রক্ষা হয়? জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির সাবেক এ মহাপরিচালক বলছিলেন, একটি কলেজে এইচএসসি থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যায় পর্যন্ত পড়ালে তার মান ঠিক রাখায় যায় না। এ ধরনের কলেজের অনেকগুলোতেই তা হচ্ছে। যেখানে এটা হচ্ছে সেখানে এইচএসরি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা গুরুত্ব কম পায়। শিক্ষকরাও সেদিকে মনোযোগ দেয় না। এক সঙ্গে এইচএসসি, অনার্স ও মাস্টার্স চললে হবে না। আবাসন সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। শ্রেণীকক্ষ সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। আর একটি বিষয় এখন নিশ্চিত করা দরকার, সেটা হচ্ছে শ্রেণী কক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।