২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অতলান্তিকের দেশ থেকে ॥ জায়নের স্বপ্নের হাত

  • শরীফা খন্দকার

নিউ হরাইজন নামে নাসার এক স্পেস ক্রাফটের মাধ্যমে কিছুদিন আগেই বরফের আবরণে ঢাকা প্লুটোকে দেখা গিয়েছিল টেলিভিশন পর্দায়। গ্রহজগত থেকে বিচ্যুত প্লুটোর চাঁদ শ্যারনের পাহাড় আর উপত্যকার ছবি দেখেছিল আগ্রহী মানুষ। কিন্তু সেদিন সকালে যে দৃশ্য দেখে টিভির খোলা পর্দার দিকে আমি তাকালাম সেটি এই ক’দিনেই পুরনো হয়ে যাওয়া এমন কোন ছবি নয়। চিরকালের সৌন্দর্যমাখা একটি ক্ষুদে বালকের হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখাচ্ছিল এবিসির গুড মর্নিং আমেরিকা। ওপরের পাটিতে দুটো দাঁত নেই বলে ওর কালো বর্ণের মুখটাতে মিশে গেছে অন্যরকম লাবণ্য। দিনটা ছিল জুলাই মাসের ২৯ তারিখ-সকালের নিত্যকার কাজ ফেলে অজান্তেই তাই আটকা পড়ে গেলাম এবিসির পর্দায়।

কিন্তু একটু পরেই ক্যামেরার পানে অনিন্দ্য সুন্দর বালকটি যখন মেলে ধরল তার হাত দুটি দেখলাম ওগুলোর কব্জি থেকে নিচের অংশটুকু কবে যেন নির্মমভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, গোড়ালি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ওর দুটি পায়ের পাতাও। মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোর শহরতলির মাত্র আট বছর বয়সের এই বালকের নাম জায়ন হার্ভি। এসব স্টোরি দেখা বরাবরই এড়িয়ে যেতে চাই। মনে হলো সাতসকালে কাজকর্ম ফেলে হৃদয়ে আঁকলাম এমন এক শিশুর ছবি যেটা হৃদয়ে কতদিন কষ্ট হয়ে বিঁধে থাকবে কে জানে।

তারপরেও টিভিটা বন্ধ করে দিতে চেয়ে কেমন আশ্চর্যভাবে থেমে গেলাম যে। অন্ধকারের কাছে হার না মানা এক হস্তপদহীন বালক কি অপার সাহস নিয়ে নিজের কথা হড়বড়িয়ে বলে চলছে বালকোচিত চপলতায়! সে বলল, দু’বছর বয়সে তার একটি কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। মায়ের দেয়া একটি কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন করার পর মারাত্মক রকম ইনফেকশন হওয়ার কারণে সে সময় কেটে ফেলা হয়েছিল শিশু জায়নের হাতসহ পা দুটিও।

কিন্তু ও যখন ক্রমে বড় হতে লাগল যখন এসে গেল তার হাঁটাহাঁটির দিন, হুটোপুটি আর ছোটাছুটি করে খেলবার লগ্ন- তখন কেমন হলো সেই হস্তপদহীন শৈশব? সে হাসিমুখে জানাল ওই সময়টিতে এসব অঙ্গহীনতা কোন কিছুতেই অপারগ করে তুলতে পারেনি তাকে। বরং অন্য সব শিশুর মতোই তারও জীবন হলো ছটফটে ও চঞ্চল।

নড়ু মবঃং যধহফ ঃৎধহংঢ়ষধহঃ

কারণ, শিশু বয়স থেকে অনেক পরিশ্রমে সে শিখে নিয়েছে এই হাতবিহীন হাত দিয়ে কিভাবে নিজেই খেতে পারে, লিখতে পারে। সে আরও শিখেছে কম্পিউটার ব্যবহার করতে, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, প্রিয় ভিডিও গেমসহ কত রকম যে খেলা। এক জোড়া প্রস্থেটিক্স ফিটের ওপর স্নিকার্স পরে সে শিখেছে হাঁটাচলা ও দৌড়ানো। এমনকি একা একা লাফানো-ঝাঁপানো পর্যন্ত সে করতে পারে।

ওর গল্প শুনতে শুনতে মনে হলো শরীরের সমুদয় অঙ্গ পেয়েও পৃথিবীতে কেন অসংখ্যজনের কত যে না পাওয়ার দুঃখ। চারদিকে খুশির রেণু ছড়িয়ে তাদের জন্য যেন বালকটি বলছে- ‘আমার পানে চেয়ে চেয়ে খুশি থাকো!’

সকালের এই অনুষ্ঠানটি পূর্ণ হয় সাধারণত ছোট ছোট নিউজ, গান ইত্যাদি নানারকম দিয়েই। তাই ধারণা ছিল বাল্টিমোর বালকের হাত ও পায়ের কাহিনীটি হয়ত এখানেই শেষ। কিন্তু বিধাতার লীলায় মানুষের হাত দিয়ে শেষও কখনও কখনও অশেষ হয়ে যায়। দেখি ডিফারেন্ট এঙ্গেলে টিভি পর্দার বাম কোণে একটি ইনসার্ট ফ্রেমে বেশকিছু মানুষ। এতক্ষণ এমনি নিমগ্ন ছিলাম যে, সেদিকে তেমন নজর দেয়া হয়নি। যতক্ষণ না হঠাৎ করে সেটাই হয়ে উঠল মাস্টার শট। লাইভ অনুষ্ঠানের ডানায় ভর করে আসা এমন শটটি ছিটকে ফেলে দিল জায়ন হার্ভির হাত-পাবিহীন পুরনো ছবিটাকে।

লাইভে প্রচুর লোকের মাঝে ওই ক্ষুদে বালকটিকেই দেখা গেল। দু’পাশে ঘনিষ্ঠভাবে দু’জন সম্ভবত তার পিতা-মাতা এবং বড়সড় একটি দল চিকিৎসকের পোশাকে। এবিসি উপস্থাপিকা ঘোষণা করল সে চিলড্রেন হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়ার একটি অনন্য লাইভ নিউজ কনফারেন্স থেকে কথা বলছে। দিন ও রাতের পরবর্তী নিউজগুলোতে দেখলাম সিএনএন, সিবিএস, এনবিসিসহ দেশের নামী-দামী সমস্ত মিডিয়া সেখানে উপস্থিত ছিল।

ক্যামেরা যখন অন্যদিকে না গিয়ে সরাসরি ধারণ করল অনুষ্ঠানের মধ্যমণি জায়নের হাত দুটিকে তখন সে এক অবাক করা কা-। কিছুক্ষণ আগেই তো দেখিয়েছে কব্জিসহ ওর হাতেরা উড়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। কিন্তু এ মুহূর্তে সেই নিখোঁজ হাত, তার আঙ্গুলগুলো আপন জায়গায় ফিরে এলো কোন্্ অমৃতলোক থেকে? শুধু ওর কব্জির ওপরের অংশটিতে দেখা যাচ্ছে একটি ব্যান্ডেজ। অদ্ভুত আবিষ্টতার মধ্য দিয়ে ভাবি এ কোন্ জাদুকরী খেলা! পেন মেডিসিন এ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের নিউজ কনফারেন্স নতুন হাত নিয়ে উপস্থিত হতে যাচ্ছে।

জায়ন হার্ভি

পেন মেডিসিন এ্যান্ড চিলড্রেন হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়ার লাইভ সংবাদ সম্মেলনে ছোট্ট জায়ন একজোড়া নতুন হাত নিয়ে প্রথম ধন্যবাদ জানাল পেন মেডিসিন এ্যান্ড চিলড্রেন হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়ার উপস্থিত চিকিৎসক ও স্টাফদের। যারা জাদুবিদ্যা দিয়ে নয়, এক অভূতপূর্ব জটিল অপারেশনের মাধ্যমে বালকটির হাতে সংযোজন করেছে ডোনেট করা একজোড়া হাত। চিলড্রেন হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়ার সার্জনরা সারাবিশ্বে এবারই সর্বপ্রথম সফলভাবে রেখে গেলেন ডবল ডোনার হ্যান্ড ও ফোর আর্ম সংযোজনের কীর্তিগাথা। হাসপাতালটির প্রেসিডেন্ট ও চিফ এক্সিকিউটিভ ম্যাডেলিন বেল এমন কর্মকা-কে বললেন, ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি এ্যাকমপিশমেন্ট’। বালক প্রবর আনন্দে ভাসতে ভাসতে মেডিক্যাল টিমের উদ্দেশে উচ্চারণ করল ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফর হেল্পিং মি থ্রু দিস বাম্পি রোড’। পরবর্তীতে এনবিসির সঙ্গে একটি সাক্ষাতকারে সে বলেছে সব সময়েই তার গোপন কামনা ছিল নতুন একজোড়া হাত।

অপারেশনটিতে নেতৃত্বদানকারী একই হাসপাতালের অর্থপেডিক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান ও ডিরেক্টর অব হ্যান্ড ট্রান্সপ্লানটেশন ডাঃ এল স্কট লেভিন সংবাদ সম্মেলনে একটি স্টেটমেন্টের মাধ্যমে জানালেন আট বছর বয়সী এই বালকের জীবন পথের বিষম ঝাঁকুনিটি তারা সবসময় অনুভব করতেন। কেন তার প্রয়োজন এমন নতুন হাত? ওর কাছে প্রথম সাক্ষাতে জানতে চাওয়া এই প্রশ্নে সে জবাব দিয়েছিল ‘আমি বানরদের বারে ঝুলে ঝুলে খেলতে চাই।’ লেভিন মন্তব্য করলেন ‘এ প্রিটি লজিক্যাল এ্যানসার ফর এইট ইয়ার্স ওল্ড।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্যে এরপর হ্যান্ড প্ল্যান্টেশন বিভাগের পরিচালক লেভিন সমগ্র চিকিৎসা জগতকে অবহিত করলেন এই বলে যে, জায়নের হাতে এই অসাধ্য সাধনের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল সার্জন ও সহকারীদের এক সুবিশাল কর্মযজ্ঞ। মরদেহের হাত সার্জারি করে করে ব্যাপারটি প্রাকটিস করেছেন তারা দীর্ঘ সময় ধরে। তাছাড়া একই হাসপাতালে ২০১১ সালে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সফল হ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্টেশনের অভিজ্ঞতা ছিল তাদের ভিত্তি। কিন্তু একটি শিশুর ডবল হ্যান্ড সংযোজন সহজ কাজ ছিল না। কারণ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় হাত-পাসহ তার সমস্ত শরীর। সংযোজিত নবীন হাতটিকেও বৃদ্ধি পেতে হবে শরীরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। জাওনের ক্ষেত্রে যা করা হয়েছে তাতে ওর নতুন হাতেরও বৃদ্ধি ঘটবে অন্যান্য অঙ্গের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। সদীর্ঘ দশ ঘণ্টাব্যাপী এই জটিল সার্জারিটি তারা সমাপ্ত করেছেন গত জুলাই মাসের শুরুতে। যদিও একই মাসের ২৯ তারিখের পূর্বে এ সম্পর্কে তারা কোন ঘোষণা দিতে চাননি।

লেভিন স্কটে তার স্টেটমেন্টে আরও বললেন, তাদের এই অসাধারণ সাধনায় ব্রতী ছিলেন নার্স-ডাক্তার ও সার্জনদের ৪০ সদস্যের সুবিশাল এক সার্জিক্যাল টিম। যে টিমকে আবার বিভক্ত করা হয়েছিল ৪টি ওয়ার্কিং গ্রুপে। দু’দল ছিল যার হাত জুড়ে দেয়া হবে সেই ডোনার হ্যান্ড ও অপর দু’দল ছিল সংযোজনকামী জায়েনের হাতের দায়িত্বে। সার্জন দল জায়নের হাতের বোন, ব্লাড ভেসেল, নার্ভ, মাসল, টেন্ডন ও স্কিনের সঙ্গে সংযোজন করেছেন ডোনার হাত ও ফোর আর্মস দুটি।

সার্জনদের এসব কাজ অনেকের মতো তাদের কাছেও এক উচ্চমার্গের সাধন-ভজনের জটিল প্রক্রিয়া। তারপরেও গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনেছি তারা কিভাবে ডোনার হস্তদ্বয়কে একটি করে স্টিল প্লেট ও স্ক্রুর সঙ্গে যুক্ত করে এগুলোর প্রতিটি মাসল এবং টেন্ডন মেরামত করে দিয়েছিলেন। এরপর কিভাবে এর সঙ্গে সংযোজন করলেন জায়নের ধমনী ও শিরা। যে মুহূর্তে জাওনের নতুন হাতটি বহমান রক্ত স্রোতে গোলাপী বর্ণ ধারণ করল সে সময়টিকে স্মরণ করলেন লেভিন ‘দ্যাট হ্যান্ড ওয়াজ নাউ এলাইভ। ...দ্যাট বিকাম ইনস্ট্যান্টলি।’ সার্জনরা একটি একটি করে জুড়ে দিলেন হাতগুলোর নার্ভ ও ক্লোজড সার্জিক্যাল সাইটগুলো!

জাওনের ডোনার হ্যান্ডটি কার সে সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনরকম তথ্য দিতে রাজি হননি। তবে সাধারণত কোন মৃত মস্তিষ্কের শিশু পেসেন্ট এই হাত ডোনেট করে থাকতে পারে।

ডাক্তাররা বলেছেন, জায়ন এই প্ল্যানটেশনের একজন আইডিয়াল পেসেন্ট ছিল বলতে গিয়ে বলেছেন তার সাহসিকতার কথা। এখন তাকে যে সমস্ত আন্টিরিজেকশন ওষুধ খেতে হবে সেটা খাওয়াচ্ছে কিডনি সংযোজনের পর থেকেই। ডাক্তাররা তাই আশা করছেন, এটিতে ওর জন্য আলাদা কোন সঙ্কট নেই। যে ফিজিওথেরাপি ওকে নিতে হবে সেটাও সে নিচ্ছে দীর্ঘ সময়।

জায়ন এনবিসি নিউজের কাছে অতি সম্প্রতি একটি সাক্ষাতকারে জানাল এই গ্রাউন্ড ব্রেকিং অপারেশনটি তার কাছে ছিল এ ড্রিম কাম ট্রু- একটি স্বপ্ন পূরণ। তারপর বলল তার ছোট্ট বোনটিকে এই নতুন হাত দিয়ে ধরার জন্য তার অপেক্ষার তর আর সইছে না। ‘মাই ফেভারিট থিং (উইল বি টু ) ওয়েট ফর হার টু রান ইনটু মাই হ্যান্ডস এ্যাজ আই পিক হার আপ এ্যান্ড স্পিন হার ধৎড়ঁহফ...

লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী

ংযধৎরভধ.শ@ড়ঁঃষড়ড়শ.পড়স