২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বুকের দুধই শ্রেষ্ঠ খাবার

  • ডা. আবু সাঈদ শিমুল

ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুস্থ, সবল, রোগমুক্ত রাখার জন্য প্রত্যেক মাকে শিশুর জন্মের মুহূর্ত থেকে বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। জন্মের পরপরই শিশুকে বুকের দুধ অর্থাৎ প্রথমে শালদুধ খাওয়ালে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ে এবং পুষ্টিও লাভ করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকায় শালদুধকে শিশুর জীবনের প্রথম টিকা বলা হয়। কিন্তু দুধ কোম্পানিগুলোর দাপটে কিংবা অজ্ঞাতবসত অনেকেই বাচ্চাকে বুকের দুধ দিতে চান না। বাংলাদেশে ২০১১ সালে ৬৪% নারী ৬ মাস পর্যন্ত বাচ্চাকে শুধু বুকের দুধ দিয়েছিল। তবে ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ৫৫% এ নেমে আসে। চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ।

কাজের মাঝে শিশু করবে মায়ের দুধ

পান, সবাই মিলে সবখানে করি সমাধান

এই প্রতিপাদ্য নিয়ে পলিত হয়েছে সপ্তাহটি। ১৯৯৩ সালে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহে মাতৃবান্ধব কর্মস্থল উদ্যোগের যে অভিযান শুরু“হয় ২০১৫ সালে সে উদ্যোগই আরও স্পষ্টভাবে প্রতিধ্বনিত হলো।

বুকের দুধের অনেক উপকারিতা আছে। সেগুলো এখানে বিস্তারিত তুলে ধরছি।

বুকের দুধের উপকারিতা

শিশুর জন্য

যেসব শিশু বুকের দুধ খেয়েছে তাদের বয়সকালে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হাঁপানি ও হৃদরোগ হওয়ার আশঙ্কা কম। মায়ের দুধে পুষ্টি উপাদান ছাড়াও আছে শতকরা ৯০ ভাগ পানি। সেজন্য শিশুকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত আলাদা পানি দেয়ার প্রয়োজন নেই। মায়ের বুকের দুধ জীবাণুমুক্ত। সুতরাং বায়ু বা পানিবাহিত জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার সুযোগ নেই। উপরন্তু মায়ের দুধে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়Ñ যার ফলে শিশুর অসুখ-বিসুখ বিশেষ করে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসনালীর রোগ, হাঁপানি, এলার্জি, চুলকানি ইত্যাদি কম হয়।

মায়ের জন্য লাভ

বুকের দুধ না খাওয়ালে মায়েদের স্থ’ূল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া বুকের দুধ না খাওয়ানোর দীর্ঘমেয়াদি কুফল হিসেবে স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সারের ঝুঁকির ব্যাপারটি তো এখন প্রমাণিত। বুকের দুধ খাওয়ালে মায়েদের যে শুধু শরীর ভাল থাকে তা-ই নয়, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যও ভাল থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, বুকের দুধ খাওয়ালে মায়েরা সহজে উত্তেজিত হন না, উদ্বেগ ও হতাশায়ও তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়েন না। কর্মজীবী মায়েরা যে কয়েক মাসই মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না কেন, এ সময়ের পুরোটাই শিশুকে শুধু বুকের দুধ দেয়া উচিত। এতে পরবর্তী সময়ে শিশুর রোগ হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে, ফলে শিশু যেমন সুস্থ থাকে, তেমনি শিশুর জন্য কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি নিতে হয় না বলে মায়েরও সুবিধা হয়। তবে এতসব বিষয়ের উর্ধে হলো মা ও সন্তানের সম্পর্ক। বুকের দুধ খাওয়ালে স্তন্যদায়ী মা ও সন্তানের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক বন্ধন। বেশি বেশি বুকের দুধ দিলে এ বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়, আর মা তখন উপলব্ধি করেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি।

বিকল্প দুধের অপকারিতা

বিকল্প দুধ তৈরিতে ব্যবহৃত পানি এবং দুধ খাওয়ানোর বোতল ও নিপলের সঙ্গে রোগজীবাণু থাকার আশঙ্কা থেকে যায়। ফলে শিশু ঘন ঘন রোগাক্রান্ত হয়। বিকল্প দুধে মায়ের দুধের মতো রোগপ্রতিরোধক শক্তিকাঠামো যেমন, ইমিউনোগোবিউলিন, লিউকোমাইট, ম্যাকোনেজ, নিউট্রোফিল প্রভৃতি থাকে না অথবা খুবই কম পরিমাণে থাকে। ফলে শিশুর বিভিন্ন সংক্রামক রোগের আশঙ্কা বাড়ে। বিকল্প দুধে আমিষ বা প্রোটিনের পরিমাণ খুব বেশি থাকায় শিশু অ্যাকজিমা, আন্ত্রিক প্রদাহ ও মলে রক্তক্ষরণের সমস্যায় ভোগে। বিকল্প দুধ যেমন গরুর দুধে কমবয়সী শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় এসিওই ভিটামিন কম মাত্রায় থাকে। ফলে বিকল্প দুধে নির্ভরশীল শিশুর ভিটামিনের স্বল্পতাজনিত রোগ বেশি হয়। অনেক সময় বিকল্প দুধ সহজে হজম হয় না। ফলে শিশু পেটেরপীড়ায় ভোগে। বোতলের দুধে অভ্যস্ত শিশু বোতলের ছিদ্রে একটু চাপ দিয়ে অনায়াসে দুধ পায় বলে কষ্ট করে স্তন চুষে দুধ আর খেতে চায় না। ফলে মায়ের বুকের দুধ ক্রমেই কমে যায়। তখন বোতলের দুধে অভ্যস্ত শিশুর সঙ্গে মায়ের মানসিক বন্ধন দুর্বল হয়। তাই বলা যায় শিশুর সঠিক বিকাশের জন্য কৌটার দুধ নয়, তাকে বুকের দুধই দিতে হবে।

শিশু বিভাগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল