২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রজন্মের আদর্শ ও প্রেরণার নাম বঙ্গবন্ধু

  • অঞ্জন আচার্য

অনিকেত আচার্য

সাংস্কৃতিককর্মী

বড় নষ্ট সময়ে, দম আটকানো বন্ধ্যা সময়ে জন্ম আমাদের। তখনকার প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি সকল বিষয়ে একরকমের ঊষর ভাব ছিল, ছিল পাকিস্তান প্রীতি-পাকিস্তান প্রীতির গন্ধ মেশানো। ধর্মের দিক দিয়ে সংখ্যালঘু আমি খুব বিব্রত হতাম, নিজেকে অনিরাপদ মনে হতো, মনে হতো বঙ্গবন্ধু শুধু আমাদের আপন; বন্ধুদের নয়। তাই বন্ধুরাও আমার আপন-পরের দোলাচালে দুলতো। যা হোক, একদম ছোটবেলায় আমাকে খাবার খাওয়াতে খাওয়াতে বা রাতে ঘুম পাড়াতে গিয়ে ঠাকুমার মুখে মুক্তিযুদ্ধের লোমহর্ষক সব গল্প আর কিশোরবেলায় প্রথমে শরণার্থী ও পরে মুজিবনগর সরকারের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বাবার অভিজ্ঞতা শোনার ভেতর দিয়ে আমার মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয়। নিম্ন মধ্যবিত্ত অথচ শিক্ষা ও রাজনীতিসচেতন পরিবারের পারিবারিক শিক্ষা, বাবার প্রগতিশীল রাজনীতির নেতৃত্ব এবং বাঙালী সংস্কৃতির ছায়াতলে আমার বেড়ে ওঠায় মা-বাবার কাছে কয়েকজন কবি আর রাজনৈতিক নেতার জন্মদিনে নিতান্তই ঘরোয়া আয়োজনে তাঁদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো খুব কম বয়সেই শিখেছিলাম আমি। আমার মা খুব কম লেখাপড়া করতে পেরেছিলেন। কিন্তু কেমন করে যেন অদ্ভুত অদ্ভুত সব কঠিন কথা বলতেন তিনি আমাকে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাঁর একটা কথা আমার জীবনবোধে অমূল্যরতন যোগ করেছে। মা বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই বাঙালী জাতি, আর বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ডাক না দিলে, মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়ী না হলে, আমরা কোনদিন বাঙালী হতে পারতাম না।’ এই কথার মধ্যেই আমি যেন জীবনের বীজমন্ত্র পেয়ে যাই। সংখ্যালঘু পরিচয়ের বাইরে আমি আমার এক অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় আবিষ্কার করি, যে আমি মানুষ, আমি বাঙালী; আর এই পরিচয়ের জন্য আমি শেখ মুজিবের কাছে ঋণী। তখনকার দিনে প্রগতিশীল রাজনীতির চর্চার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান খুব শক্তপোক্ত ছিল বলে মনে হয়নি। (এখনও তথাকথিত প্রগতিশীল রাজনীতির নামে যা হচ্ছে, সেখানেও বঙ্গবন্ধুকে কারা কতটুকু সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করেন, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে)। দুর্ভাগ্য যে, সেই রাজনৈতিক স্রোত আর ইতিহাস বিকৃত শিক্ষায় মানুষ হতে হতে আমার এবং আমার মতো অনেকের মূল্যবোধ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন তথা জীবনবোধের নাগাল পায়নি। ’৯০-এর সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমার প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত হওয়া শুরু হয় বলে মনে করি। কিন্তু তারপর আবার সেই কানাগলি। আমি ধাক্কাটা খাই যখন বিবিসির জরিপে রবীন্দ্রনাথকে পেছনে ফেলে বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন। মনে পড়ে, মায়ের কথাইতো ঠিক! এরপর থেকেই তাঁর সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে জানাশোনার চেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক বিভিন্ন বই আর পত্র-পত্রিকা, গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে ছায়ানট, উদীচী আর খেলাঘরের মতো সংগঠনে যুক্ত হয়ে, ৩২ নম্বরের জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে ঘুরে তাঁকে খুঁজে ফেরা। অনেক বছর পর তাঁর আত্মজীবনী পাঠের সুযোগ। অনেক বছর পর ১৩-এর তারুণ্যে গণজাগরণের জোয়ারে নিজেকে চেনা, আপন গন্তব্যকে জানা, নিজের শোণিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আবিরে ‘জয় বাংলা’ অনুভব, বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শকে আলাদা মাত্রায়, আলাদা সমীকরণে হিসেব করে নেয়া। হ্যাঁ, মানুষটি নিঃসন্দেহে দৃঢ়চেতা ছিলেন। কিন্তু তাঁর মধ্যে যে সরল শিশুটির অস্তিত্ব ছিল; সেটি ছিল বড় আবেগময়। এই আবেগই তার সকল রাজনৈতিক অঙ্কের সূত্র ভেঙ্গে কেমন করে যে যুক্তির মুঠো ছিঁড়ল! তিনি বিশ্বাস করে ফেললেন যে, কোন বাঙালী তাঁকে কোনদিন হত্যা করবে না। হায় আবেগ, অন্ধ আবেগ! সপরিবারে নিহত হলেন তিনি ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট। সেই থেকে বাঙালীর কপালে জন্মদিনের ওভালটিন কেকের মতো সর্বনাশের এত বড় কালো টিপ, সেই থেকে বাংলাদেশের প্রাণবায়ুতে অজ্ঞানতার নিকষ-কালো আলোকিত অন্ধকারের সিসা। তবু জেগে আছি অহর্নিশ; সকাল দেখব বলে। সম্ভাবনার সকাল, মুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত সকাল। ধর্মনিরপেক্ষ, বিজ্ঞানমনস্ক, শোষণ-বঞ্চনাহীন সাম্যবাদী সকাল; যেখানে আমার, আমাদের তথা বঙ্গবন্ধুর হাজার বছরের আবহমান বাঙালী সংস্কৃতি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেবে। বিশ্বাস করি, ভোর আসবেই মুক্তির বারতা নিয়ে; সত্যসূর্য হাসবেই; একদিন না হয় একদিন।

জয়নাব শান্তু

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাঙালী জীবনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অনিবার্য ব্যক্তিত্ব। তিনি আমাদের জাতির পিতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। একজন বাঙালী হিসেবে আমি মনে করি, সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান তাঁর অনন্য কীর্তি। বিশ শতকের বিশ্ব ইতিহাসে তাঁর কৃতিত্ব হলোÑ দ্বিজাতিতত্বের বিষবৃক্ষকে তিনি ভুল প্রমাণ করেন এবং সমূলে উৎপাটন করেন। কিন্তু তাঁর অবদানের মূল্যায়ন এখনও সম্পূর্ণ হয়েছে বলা যায় না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কথা মনে হলে আমি অত্যন্ত বিপন্ন ও বিচলিত বোধ করি। কেননা মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালীর অর্জন এই ১৫ আগস্টের পর থেকে ক্রমান্বয়ে বিনষ্ট হতে থাকে। সংবিধানের মূল চারটি স্তম্ভকে নির্মমভাবে বাতিল করা হয় এবং পাকিস্তানী সেনাতন্ত্রের পুনরুত্থান ঘটে এই বাংলাদেশে। ১৯৭৫ সালের ঘটনার পেছনে যুদ্ধাপরাধীদের একটি বড় ভূমিকা ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানী অনুচর ও তাদের এদেশীয় দোসররা স্বাধীনতার পর থেকেই সক্রিয় ছিল। সেই ভিন্ন ষড়যন্ত্র এক ভয়ঙ্কর রূপ নিল ১৫ আগস্টে। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতো, তবে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি করত না। একটি স্বাধীন দেশ, জাতীয় পতাকা এবং গণমানুষের মুক্তি অর্জনের নেতৃত্ব দিয়ে শুধু নিজের জীবনকেই উৎসর্গ করেননি, সপরিবারে শাহাদাতবরণ করেন বঙ্গবন্ধু। আত্মত্যাগের এই দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। তবে আনন্দের কথা হলো, এই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হয়েছে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ চলছে। এই বিচার সম্পন্ন হলেই এক নতুন আলোর পথ দেখবে এদেশের তরুণ সমাজ।

জোবায়ের ইকবাল

মিডিয়াকর্মী

বাংলাদেশের প্রতীক কী হতে পারে? কী দেখলে বা কী শুনলে অথবা কী জানলে এককথায় সবাই বলবে এটা বাংলাদেশ? এর উত্তরে বলতে হয় লাল-সবুজের পতাকা, বাংলাদেশের মানচিত্র, জাতীয় সঙ্গীত। আর একটি প্রতীক আছে বাংলাদেশের, একজন ব্যক্তি তিনি বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের পরিচয়ের সঙ্গে এই নামটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। একজন নেতা যিনি রাজনীতির প্রথম অবস্থান সামান্য একজন কর্মী থেকে শুরু করে প্রতিটা ধাপ পার হয়ে একটি জাতির পিতা হয়েছেন। আর তাই পিতৃত্ব এবং নেতৃত্ব সমানতালে বিদ্যমান ছিল তাঁর চরিত্রে। তাই বাঙালীকে দক্ষতার সঙ্গেই নেতৃত্ব দিয়েছেন অত্যন্ত কোমল হৃদয় দিয়ে। অনেক দেবতুল্য নেতা হয়ত বাঙালী জাতি পেয়েছে, কিন্তু মানুষের নেতা এবং মানব নেতা আজ অবধি একমাত্র বঙ্গবন্ধুই। সেজন্যই তিনিই একমাত্র নেতা যিনি সমগ্র বাঙলী জাতিকে এক কাতারে এনে এক করতে পেরেছিলেন। বাঙালী জাতির প্রতিটি আন্দোলনে, প্রতিটি অর্জনে তাঁকে পাওয়া গেছে সামনের কাতারে। ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায়, ১৯৩৯ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তাঁর রাজনৈতিক পথ চলা শুরু, সেই সময়ে স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন তদানিন্তন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হক। স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবি বাস্তবায়নের জন্য একটি দল নিয়ে তাঁর কাছে যান, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজেই। ১৯৪৩ থেকে শুরু বাঙালীর অধিকার আদায়ের নেতৃত্ব দেয়া। আর তা শেষ হয় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে জীবন দিয়ে। এই জাতির জন্য যতটুকু ত্যাগ একজন মানুষের জন্য সম্ভব, তা নির্দ্বিধায় করেছেন কোন চিন্তা না করে সকল পিছুটানকে উপেক্ষা করেই। এভাবেই তিনি একজন সামান্য কর্মী থেকে হয়েছেন জাতির পিতা।

শাহান সাহাবুদ্দিন

কবি, গল্পকার ও সাংবাদিক

শেখ মুজিব অগ্নিবলয়ের ভেতর তখনও। তখনও তিনি ভিসুবিয়াসের একেবারে কাছাকাছি জায়গায় দাঁড়িয়ে। সেখানে দাঁড়িয়েই তর্জনীর ইঙ্গিতে বাতলে দিলেন তিনি আমাদের পথ। মহাকবির মতো তিনি শোনালেন বাঙালীর শ্রেষ্ঠ কবিতাÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অনবদ্য কবিতার ক্লাইমেক্সে এসে তিনি বলছেন, ‘এই দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ আমরা দেখলাম ’৬৬, ’৬৯, ১৯৭০-এর বহুমাত্রিক নেতা, যিনি দাসত্বের কাল শেষ করে আগামী সকাল ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যে তাঁর দল আওয়ামী লীগসহ এগিয়ে যাচ্ছেন কখনও সুভাষ চন্দ্র বসুর মতো স্ফূলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠে, কখনও বা চিত্তরঞ্জন দাশের মতো আকাশের মতো উদার মানসিকতার বাঙালীয়ানা পরিচয় বহন করে, কখনও বা প-িত জওহরলাল নেহরুর সমাজতন্ত্র-ঘেঁষা উদারনৈতিক ধ্যান-ধারণার যোগ্যতম প্রবর্তকের ভূমিকায় থেকে। আব্রাহাম লিঙ্কন মার্কিনিদের যে আবেগ অনুভূতি ও দেশপ্রেমে একটি নতুন জাতির কথা বলেছিলেন, ‘এ্যা নিউ বার্থ অব ফ্রিডম’-এর কথা; স্যার উইনস্টন চার্চিল হিটলারের ফ্যাসিস্ট আক্রমণের বিরুদ্ধে ‘শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য নিয়ে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন সাত কোটি বাঙালীকে, জাগিয়ে তুলেছিলেন আগ্নেয় ভূমিপুত্রদের। তাঁর অসামান্য ভূমিকা ও নেতৃত্বে আমরা পেলাম একটি পতাকা। লাল-সবুজের উজ্জ্বল উদ্ধার। আমরা পেলাম আমাদের ঠিকানা, স্বাধীন দেশ ও মানচিত্র। কিন্তু হায়, সেই তিনি স্বাধীন দেশ এনে দেয়ার পরও দুদ- শান্তি নিয়ে ঘুমোতে পারেননি পরাজিত ও বিপথগামী শক্তির গভীরতর ষড়যন্ত্র ও অস্ত্রের মহড়ায়। অবশেষে এলো ১৫ আগস্টের কালোরাত, যা গভীর ক্ষত হয়ে আছে বাংলার ইতিহাসে।