২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিঙ্গাপুর শূন্য থেকে শিখরে

  • অনুবাদ : এনামুল হক

টিকে থাকতে হলে অসাধারণত্ব অর্জন করতে হবে। অন্যদের থেকেও হতে হবে ব্যতিক্রমী। ক্ষুদে দ্বীপদেশ সিঙ্গাপুর ঠিক সেটাই করেছে। শূন্য থেকে অসাধারণ উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া ফেডারেশন থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর দেশটার অস্তিত্ব রক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। আজ এই আধুনিক নগর রাষ্ট্রটি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন কেন্দ্র। বিশ্বের দুটি ব্যস্ততম কন্টেইনার পোর্টের একটি সিঙ্গাপুর। বিশ্বের দুটি ব্যস্ততম আধুনিক ও সর্বাধিক দক্ষ বিমানবন্দর এখানে। পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশ সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি ঈর্ষণীয় রকমের শক্তিশালী। সুশাসন, দক্ষতা ও শৃঙ্খলার জন্য দেশটি অতি প্রশংসিত।

কেমন করে এই বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করল সিঙ্গাপুর? নেতৃত্বের কোন্্ জাদুর কাঠির স্পর্শে শূন্য থেকে শিখরে গিয়ে পৌঁছাল দেশটা? ৫০ বছর আগের সিঙ্গাপুর আর আজকের সিঙ্গাপুরকে দেখলে যে কারোর মনে এ প্রশ্ন উদয় না হয়ে পারবে না। উল্লেখ্য, গত ৯ আগস্ট সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় দেশটির ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

মালয়েশিয়া থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার সময় সিঙ্গাপুরের কোন সম্পদ ছিল না। এমনকি পর্যাপ্ত পানিটুকুও না। ছিল না পশ্চাদভূমি। আয়তন ছিল মাত্র সোয়া দুইশ’ বর্গমাইল। পানির জন্য সিঙ্গাপুর নির্ভর করত মালয়েশিয়ার ওপর। আর খাদ্যের জন্য বহির্বিশ্বের ওপর। সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান ইউ বলেছেন, কাব্য এখন আমাদের কাছে বিলাসিতা। করতে হবে কঠোর কঠিন পরিশ্রম। সেই পরিশ্রমের গুণে সিঙ্গাপুর এ পর্যন্ত আয়তন বাড়িয়েছে এক-পঞ্চমাংশ। বাড়িয়েছে আমদানি করা বালি দিয়ে সাগর ভরাট করে। তথাপি ৫৫ লাখ অধিবাসীর জন্য এই স্থানটি অতিমাত্রায় অপ্রতুল।

স্থানীয় নাগরিক ছাড়াও আছে বিদেশী নাগরিক, যারা কাজ উপলক্ষে আসে আবার চলে যায়। যেমন ৫০ হাজার মালয়েশীয় প্রতিদিন কাজ করতে আসে সিঙ্গাপুরে। মোট জনসংখ্যার ২০ লাখ বিদেশী। তারপরও সিঙ্গাপুর বিপুলসংখ্যক ইমিগ্রেন্ট নিচ্ছে। এদের ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে সিঙ্গাপুরের ভূ-খ-গত আয়তন আরও প্রসারিত হওয়ার প্রয়োজন অতি জরুরী হয়ে উঠেছে।

সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যার ৭৪ শতাংশ চৈনিক, ১৩ শতাংশ মালয়ী ও ৯ শতাংশ ভারতীয়। তারপরও এই মিশ্র জনগোষ্ঠী এক বিচিত্র জাতিসত্তার অধিকারী হয়েছে, যা একান্তভাবেই সিঙ্গাপুরীয়। এই সত্তা অর্জনে তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ, যিনি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। লি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যা নির্মম রকমের বাস্তবানুগ। ক্ষমতার বেশিরভাগ সময় তিনি ছিলেন একজন কল্যাণব্রতী একনায়ক। শুরু থেকেই তিনি কঠোর হাতে বিরোধী দলকে দমিয়ে রেখেছিলেন। পার্লামেন্ট ছিল নির্বাহী ক্ষমতার রবারস্ট্যাম্প মাত্র। ১৯৮১ সালের আগ পর্যন্ত সেখানে কোন বিরোধীদলীয় সদস্য পার্লামেন্টে নির্বাচিত হতে পারেননি। সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ রাখা হয়েছিল। সরকারী নীতির সমর্থন করা ছাড়া ভিন্নমত প্রকাশের কোন সুযোগ দেয়া হতো না। একের পর এক মানহানির মামলাসহ নানা ধরনের কেসকারবারের দ্বারা বিরোধী রাজনীতিকদের সর্বদা হুমকির মুখে রাখা হতো কিংবা দেউলিয়া করে ফেলা হতো।

এশিয়া মহাদেশের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সিঙ্গাপুরকে অনেক সময় বলা হয় এশিয়ার আলো। কঠিন কঠোর শাসন ও আইনের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দেশটাকে একেবারে বদলে ফেলা হয়েছে। সেখানে কোন গোলযোগ বিশৃঙ্খলা নেই, ময়লা আবর্জনা নেই, জীবনযাত্রা অচল করে দেয়া ট্রাফিক জ্যাম নেই। সিঙ্গাপুরে অপরাধ অতি সামান্য। সরকারের দুর্নীতি নেই বললেই চলে। অধিকাংশ মানব উন্নয়ন সূচক যেমন- আয়ু, শিশুমৃত্যু ও মাথাপিছু আয়ের দিক দিয়ে দেশটির অবস্থান শীর্ষভাগের দিকে। সেখানে ট্যাপের পানি জীবাণুমুক্ত। সরকার স্বচ্ছ, দক্ষ ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন। সরকার পরিচালনায় নেতৃবৃন্দ অতি উচ্চমান বজায় রেখেছেন। কয়েক দশকের প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব ও বিচক্ষণ রাষ্ট্র পরিচালনার বদৌলতে সিঙ্গাপুর আজ যে কোন পরিণতি ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্ষম। ৫০ বছরের বিরামহীন ও বলিষ্ঠ প্রবৃদ্ধির ফলে দেশটার অর্থনীতি আজ ঈর্ষণীয় শক্তি অর্জন করেছে। ১৯৭৬ সাল থেকে জিডিপি বছরে গড়ে ৬.৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। তবে বিগত দশকে অর্থনীতিতে একটা দোলুনিও ঘটেছে। যেমন অতিমাত্রায় বাণিজ্যনির্ভর এই অর্থনীতি ২০০৯ সালে সামান্য মন্দাকবলিত হয়েছিল। আবার সেখান থেকেই লাফ মেরে পরের বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয় ১৫.২ শতাংশ। তারপর থেকে প্রবৃদ্ধি বছরে ২.৪ শতাংশের মাত্রায় স্থিতিশীল থেকেছে। বেকারত্বের হার সামান্যÑ দুই শতাংশেরও নিচে। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সিঙ্গাপুরে সঞ্চয়ের হার খুব বেশিÑ জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ। বিনিয়োগের হার এখনও যথেষ্ট আকর্ষণীয়Ñ বছরে জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ।

সিঙ্গাপুর তার রিজার্ভের পরিমাণ কড়া গোপনীয়তায় রাখে। দেশটা বাইরের আর্থিক সঙ্কটের ধাক্কা সামলাতে যথেষ্ট সক্ষম। এর অর্থনীতি বহুমুখী, তবে এর কারখানা শিল্প ও সার্ভিস শিল্পের ভিত্তি অতি শক্তিশালী। সিঙ্গাপুরে আয়কর অতি সামান্য। মূলধন লাভের ওপর কর বা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ বা সম্পত্তি অর্জনের ওপর কর নেই। দেশটা ইন্টারনেট অবকাঠামোয় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। সাগর তলদেশের যে কেবলের মাধ্যমে জাপান ও ইউরোপের মধ্যে ইন্টারনেট ট্রাফিক চলাচল করে তা বেশির ভাগই ঘটে সিঙ্গাপুর হয়ে।

সিঙ্গাপুরের আয়ের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং অতি উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে বেশিরভাগই হলো আমদানি করা কাঁচামাল পরিশোধিত করে পুনরায় রফতানি করা। প্রধান শিল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- পেট্রোলিয়াম পরিশোধন, রাসায়নিক ইলেক্ট্রনিক্স ও কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশ উৎপাদনকারী শিল্প। সার্ভিস খাতÑ প্রধানত ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। লন্ডন, নিউইয়র্ক ও টোকিওর পর সিঙ্গাপুর হলো বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসা কেন্দ্র।

পোর্ট সার্ভিস সিঙ্গাপুরের রাজস্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এর সমুদ্রবন্দর বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দর। চাঙ্গিতে এর সর্বাধুনিক বিমানবন্দরটি বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ বিমানবন্দর হিসেবে খ্যাত। পর্যটন শিল্পও দেশটির রাজস্বের এক বড় উৎস। সিঙ্গাপুরে বছরে ১ কোটি লোক ভ্রমণে যায়। হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের সঙ্গে সিঙ্গাপুরকে চার এশিয়ান টাইগারের অন্যতম বলে গণ্য করা হয়।

ছবির মতো সুন্দর দেশ সিঙ্গাপুরে বস্তি নেই। নিরাশ্রম লোকজন কার্যত নেই; আবাসন এলাকাগুলো সাধারণত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অধীন। সিঙ্গাপুরের ৮০ শতাংশ নাগরিক হাউজিং এস্টেটে থাকে। বয়স্করা নিজস্ব বাড়ি এবং জীবনযাপনের মতো সঞ্চয় নিয়ে অবসরে যান।

সিঙ্গাপুরের এতসব উজ্জ্বল দিকের উল্টোপৃষ্ঠে অন্ধকার দিক যে নেই তা নয়। অভিযোগ আছে যে সিঙ্গাপুর লাখ লাখ বিদেশীকে কম বেতনে খাটিয়ে তাদের উদ্বৃত্ত শ্রম মেরে দেয় আর এভাবে সম্পদ স্ফীত করে। সে দেশে আয় বণ্টনের ক্ষেত্রে বিশাল ব্যবধান ও বৈষম্য বিদ্যমান। বহু লোক ডর্মিটরিতে গাদাগাদি অবস্থায় বা তার চেয়েও খারাপ পরিবেশে থাকে। সিঙ্গাপুরে কার্যত একদলীয় শাসন বিদ্যমান। সেখানকার শাসক দল পিপলস্ এ্যাকশন পার্টি (পিএপি) ধনী বিশ্বের একমাত্র রাজনৈতিক দল, যা গত ৫৬ বছরের মধ্যে কখনও ক্ষমতার বাইরে থাকেনি। সিঙ্গাপুরে বাক-স্বাধীনতা নেই, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই। বিরোধী দল অবাধে নির্বিঘেœ কাজ করতে পারে না। যতই উন্নয়ন হোক এবং জীবনযাত্রার মান বাড়ুকÑ একটা সময় আসবে যখন মানুষ এসব অধিকার নিয়ে সোচ্চার হবে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট