২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্মান্ধতার স্বৈরাচার

  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রোধ তৈরি করতে পেরেছে কিন্তু স্বাধীন সমাজব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। ক্রোধ ক্ষমতার দিকে দৌড়েছে, আর ক্ষমতা হয়ে উঠেছে মানুষকে ক্ষুদ্র করার কৌশল। রাজনীতির ক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়িয়েছে ক্ষুদ্র মানুষরা, আর ক্ষুদ্র মানুষরা ফের তৈরি করেছে আরও ক্ষুদ্র মানুষদের। গান্ধীজি থেকে ঢোঁরাই তৈরি হয়েছেন। ঢোঁ আলো ছড়িয়েছেন আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঢোঁরাইদের ভেতর। একেই তো বলে আলো দিয়ে আলো জ্বালা। শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হতে পেরেছেন ক্ষুদ্র মানুষদের ভেতর স্বাধীনতার আলো জ্বেলে দিয়ে। তিনি আমৃত্যু বলে বেড়িয়েছেন সোনার বাংলার কথা, তাঁর রাজনীতির অন্তঃসার সোনার বাংলা তৈরি করব। বিপরীতে জিয়াউর রহমান বলে বেড়িয়েছেন তাঁর রাজনীতিতে টাকার অভাব নেই। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে টাকার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। টাকার অনুপ্রবেশের অর্থ দুর্নীতির অনুপ্রবেশ। দুর্নীতি যত শক্তিশালী হয়েছে, আদর্শ উধাও হয়েছে। টাকার খেলা শক্তিশালী করেছে নির্যাতনমূলক পদক্ষেপ এবং এই পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দিকে ও সশস্ত্র শক্তির স্বৈরাচারের দিকে। জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে একদিকে টাকার খেলা শুরু করেছেন, অন্যদিকে সশস্ত্র শক্তির স্বৈরাচার প্রবল করেছেন ও রাষ্ট্র কর্তৃত্বকে জবাবদিহিতার পরপারে পৌঁছে দিয়েছেন। রাজনীতি বিকিকিনির বিষয় হওয়ার দরুন মানুষের স্বরূপও বিকিকিনির বিষয় করে তুলেছেন জিয়াউর রহমান। এভাবে মানুষের স্বরূপের মধ্যে জিয়াউর রহমান অজ্ঞতা, মানসিক অলসতা, কুসংস্কার, ফ্যান্টাসি ঢুকিয়েছেন, রাজনীতি থেকে বিদায় দিয়েছেন এথিকস, আয় আয় করে ডেকে এনেছেন অযৌক্তিক এবং নির্যাতনমূলক আইনী ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক পলিসি ও যুক্তির শাসন বিদায় দিয়েছেন, শক্তিশালী করেছেন রাজনৈতিক ও নৈতিক ইনজাস্টিস এবং রাজনৈতিক ও ধর্মজ সন্ত্রাস।

জিয়াউর রহমান আর একটি অন্যায় করেছেন। বাংলাদেশের মানুষকে ইতিহাসের আশ্রয় থেকে ও নিরাপত্তা থেকে বের করার ষড়যন্ত্র করেছেন। এই ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি পাকিস্তানী ইতিহাসের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাসকে টেনে এনেছেন এবং টেনে আনার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকে, জামায়াতে ইসলামীকে এবং সশস্ত্র শক্তির একাংশকে। এখান থেকে শুরু বিএনপির রাজনীতিচর্চা, ইতিহাসচর্চা ও রাষ্ট্রচর্চা। বিএনপির রাজনীতিচর্চার মধ্যে দায়বদ্ধতা নেই (খালেদা জিয়া বিএনপির রাজনীতিচর্চার আপাতত শেষ সংস্করণ, এই সংস্করণে দায়বদ্ধতা নেই), ইতিহাসচর্চার মধ্যে কদর্য সাম্প্রদায়িকতা আছে এবং রাষ্ট্রচর্চার মধ্যে ক্ষমতার জবরদস্তি আছে। তিনটির মধ্যে যুক্ত ক্ষমতা : প্রথম বিশ্লেষণ থেকে শেষ বিশ্লেষণ পর্যন্ত ক্ষমতা। ক্ষমতার জন্য ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্র জিয়াউর রহমানের চরিত্র নষ্ট করেছে, তেমনি তাঁর স্ত্রীর চরিত্রও ভ্রষ্ট হয়েছে। এ জন্য জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে থেকেও মুক্তিযুদ্ধ করেননি এবং একই কারণে খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের ক্যান্টনমেন্টে জীবনযাপন করতে দ্বিধা করেননি। এ দুটি তিক্ত তথ্যের বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করছে একদিকে জিয়াউর রহমানের চরিত্র, অন্যদিকে খালেদা জিয়ার চরিত্র। চরিত্রহীনতার কারণে তাঁদের প্রণীত জাতীয়তাবাদের মধ্যে একটা মিথ্যা ঘণ্টা অনবরত বাজতে থাকে। কী তাঁদের বক্তব্য, কী তাঁরা বলতে চান, কোথায় তাঁদের গন্তব্য : কোনকিছু স্পষ্ট নয়। তাঁরা ধর্মপরায়ণ নন, কিন্তু ক্ষমতার স্বার্থে ধর্ম ব্যবহার করেছেন। নিজেদের রাজনীতির নিরাপত্তার কারণে ধর্ম নিয়ে খেলেছেন।

জামায়াতে ইসলামের রাজনীতি এভাবে বিএনপির রাজনীতি হয়ে উঠেছে। নিজেদের স্বার্থে জামায়াতের রাজনীতি বিএনপি একদিকে রক্ষা করেছে, অন্যদিকে শক্তিশালী করেছে। জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া জামায়াতকে রক্ষা করার রাজনীতি করেছে দীর্ঘ দীর্ঘদিন ধরে। জামায়াতকে রক্ষা করার অর্থ নিজেদের স্বার্থরক্ষা করা। তারা জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধী কখনই স্বীকার করেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতের ভূমিকা মেনে নিয়েছে এবং ধর্মজ রাজনীতির প্রয়োজন এবং ব্যবহার বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বীকার করেছে। এই স্বীকারের অর্থ এবং ব্যবহারের অর্থ একদিকে পাকিস্তানের জল্লাদি ভূমিকার প্রয়োজন মেনে নেয়া, অন্যদিকে নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যে অপরাধ এই সত্য ইতিহাস থেকে উধাও করে দেয়া। এই কারণে বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্বন্ধে টালবাহানা করে (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ব্যাপারে বিএনপির ভূমিকা ঘৃণার উদ্রেক করে)। ন্যুরেমবার্গ বিচার সম্বন্ধে জার্মানদের কুণ্ঠা ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশে জামায়াতী এবং বিএনপির যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে খালেদা জিয়া এবং বিএনপির কুণ্ঠা আছে। এখানেই নিহিত খালেদা জিয়ার চরিত্র ও ইতিহাসবোধ, এখানেই নিহিত বিএনপির চরিত্র ও ইতিহাসবোধ। জিয়াউর রহমানের প্রেতাত্মা এভাবেই শক্তিশালী হয়েছে।

বাংলাদেশে দুই উৎস থেকে ভায়োলেন্স এবং টেরোরিজম শক্তিশালী হয়েছে। একটি হচ্ছে টোটালিটারিয়ান ধর্মজ ঐতিহ্য। অপরটি হচ্ছে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তগত করার সশস্ত্র ঐতিহ্য। দুই ঐতিহ্যই গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি বৈরী। টেরোরিজম ও ভায়োলেন্সের পেছনে ধর্মজ মতাদর্শের মদদ এবং টেরোরিজম ও ভায়োলেন্সের পেছনে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তগত করার সশস্ত্র মতাদর্শের মদদ : টেরোরিজম ও ভায়োলেন্সের বিপদ থেকে দেশকে মুক্ত করেনি। জামায়াতে ইসলামী প্রথম ঐতিহ্য ইনহেরিট করেছে। বিএনপি দ্বিতীয় ঐতিহ্য ইনহেরিট করেছে। এই দুই ঐতিহ্য কি পরস্পরবিরোধী? না। ভায়োলেন্স এবং টেরোরিজমের সম্পর্ক গণতন্ত্রের মধ্যকার সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নড়বড়ে করে রেখেছে। জামায়াত প্রথম থেকেই সেক্যুলার বাংলাদেশকে ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তার অস্ত্র ভায়োলেন্স ও টেরোরিজম। বিএনপি প্রথম থেকেই জিয়াউর রহমানকে শ্রেষ্ঠ করার মাধ্যম হিসেবে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তগত করার সশস্ত্র মতাদর্শকে শক্তিশালী করেছে। ক্ষমতা দখল করার অস্ত্র : ভায়োলেন্স ও টেরোরিজম, জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে ক্যুর পর ক্যু। এভাবেই রাজনীতির ভাবনা এবং ভায়োলেন্সের ভাবনা পরস্পর প্রবিষ্ট হয়েছে। (সেনা শাসন গণতান্ত্রিক শাসনের চেয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘকালীন হওয়ার দরুন বাংলাদেশের পক্ষে লিবারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়া দুরূহ হয়ে ওঠে)। টেরোরিজম এবং ভায়োলেন্স যেমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, তেমনি যুদ্ধের সময় ও যুদ্ধপরবর্তী সময় জামায়াতে ইসলামী প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষী ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। এ কথা জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতির ক্ষেত্রে সত্য, অসংখ্য ক্যু সমাজে ও সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। যুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর এথনিক ক্লিনসিং এবং হত্যাকা-ের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সেনাবাহিনী ক্লিনসিং ও হত্যাকা-ের মিল পাওয়া যায়। দু’ক্ষেত্রে এথনিক ক্লিনসিং, সেনাবাহিনী ক্লিনসিং ও হত্যাকা-ের কোন বৈধতা নেই। তার দরুন বৈধতাহীন এথনিক ক্লিনসিং ও সেনাবাহিনী ক্লিনসিং এবং হত্যাকা- ভায়োলেন্স ও টেরোরিজমের উদাহরণ। টেরোরিজম হচ্ছে ভায়োলেন্সের আইনবহির্ভূত ও নৈতিকতাহীন ফর্ম। এই ফর্মকে আদর্শ মনে করে রাজনীতির ক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়ার অর্থ রাজনৈতিক কমিউনিটি ধ্বংস করা। সে কাজটি কি জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি (হেফাজতে ইসলামের সহযোগে) যৌথভাবে করছে না?

এথনিক ক্লিনসিং ও সেনাবাহিনী ক্লিনসিংয়ের মধ্যে থেকে বিএনপি বলে থাকে সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা একটি অবদমিত অপরাধবোধ কাজ করছে। এই অপরাধবোধ সযতেœ রক্ষা করার কারণে তাদের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক প্রয়োজন স্বীকার করা সম্ভব হয় না। সে জন্য টেরর এবং ভায়োলেন্স, সে জন্য তাদের ক্যাডার বাহিনী টেররের ডিসকোর্সের মধ্যে বাড়তে থাকে (মুক্তবুদ্ধির মানুষজনকে হত্যা করা তার নজির)। জামায়াত নিষিদ্ধ হয় না, হেফাজত নিষিদ্ধ হয় না, বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতের আস্ফালন শেষ হয় না। মুক্তবুদ্ধির মানুষজনের হত্যা নির্বিঘেœ চলতে থাকে। রাজনীতির মধ্যে এভাবে একটি সুররিয়ালিস্টিক বাস্তব তৈরি হয়। এই সুররিয়ালিস্টিক বাস্তব ভয়ঙ্কর। মনে হয় বিএনপি, জামায়াত এবং হেফাজত হত্যা করার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। রাষ্ট্র আধুনিক হতে পারছে না, রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে একটি গর্জনগাদী প্রক্রিয়া। মুক্তবুদ্ধির বদলে ধর্মান্ধরা রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ধর্মান্ধতা হচ্ছে সংবিধানহীন ক্ষমতা কিংবা সংবিধান নষ্ট করার ক্ষমতার লোভ সর্বগ্রাসী। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের রুখে দাঁড়াবার সময় এসেছে। নয়তো ধর্মান্ধতার স্বৈরাচারে দেশ রাষ্ট্র সমাজ ডুবে যাবে।