১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কসাই সিরাজের মৃত্যুদণ্ড, খান আকরামের আমৃত্যু কারাদণ্ড

কসাই সিরাজের মৃত্যুদণ্ড, খান আকরামের আমৃত্যু কারাদণ্ড
  • যুদ্ধাপরাধী বিচার

বিকাশ দত্ত ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা-গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন এবং শতাধিক বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাগেরহাটের কসাই রাজাকার কমান্ডার শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারকে (৭২) মৃত্যুদণ্ড ও খান আকরাম হোসেনকে (৬১) আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেছে ট্রাইব্যুনাল। রায়ে বলা হয়, আসামি সিরাজের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আর আকরাম দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তিনটি অভিযোগের মধ্যে একটিতে। কসাই সিরাজকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে, অথবা ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে যেভাবে সুবিধাজনক সেভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে আকরামকে স্বাভাবিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাটাতে হবে জেলখানায় চার দেয়ালের মধ্যে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মঙ্গলবার এ রায় প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। রায়কে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর আশপাশের এলাকায় পুলিশী নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গঠন করা হয় তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়। ট্রাইব্যুনাল তার রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, অভিযুক্ত সিরাজ মাস্টার একাত্তরে হত্যা করে উল্লাস প্রকাশ করতেন। তিনি তার অপরাধের জন্য অনুতপ্তও হননি। তাই তিনি কোন অনুকম্পা পেতে পারেন না। সর্বোচ্চ সাজাই তার প্রাপ্য। এ রায়ে প্রসিকিউশনপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষ সংক্ষুব্ধ, তারা বলেছেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করা হবে। বাগেরহাটের দুই রাজাকারের রায়টি হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের ২১তম রায়। এরমধ্যে ১০টি রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ১১টি রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। কসাই সিরাজ মাস্টার ও খান আকরাম হোসেনের সঙ্গে এ মামলায় আব্দুল লতিফ তালুকদার (৭৫) নামে আরেক রাজাকার সদস্য অভিযুক্ত হন। কিন্তু রায়ের আগেই গত ২৭ জুলাই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় মৃত্যু হওয়ায় তার নাম মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়। বাগেরহাটের তিন রাজাকারের মামলাটি বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য ২৩ জুন রায় ঘোষণার জন্য সিএভি রাখা হয়। ৫ আগস্ট রায় ঘোষণার জন্য মঙ্গলবার দিন নির্ধারণ করে ট্রাইব্যুনাল। মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৫ মিনিট থেকে ১২টা ২৪ মিনিট পর্যন্ত ১৩৩ পৃষ্ঠার রায়ের সারসংক্ষেপ পড়েন বিচারকরা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় সিরাজ মাস্টার ও আকরামকে।

যে অভিযোগে দুই জনের দণ্ড ॥ এ মামলার মোট সাতটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম ছয়টিতে সিরাজের বিচার চলে। এর মধ্যে ১ থেকে ৫ নম্বর অভিযোগে হত্যা, গণহত্যা, লুটপাট ও অগ্নি সংযোগের মতো অপরাধের দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ সাজার আদেশ দিয়েছে আদালত। আর আকরামের অপরাধের বিচার হয়েছে ৫, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে। এর মধ্যে প্রথম দুটি ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দিয়েছে আদালত। ৭ নম্বর অভিযোগে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকায় তাকে দেয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদ-। আদালত ১৩৩ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত সার পড়ে শোনানোর সময় সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা ও টুপি পরিহিত সিরাজ এবং ছাই রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত আকরামকে অনেকটাই ভাবলেশহীন দেখা যায়।

মামলার কার্যক্রম ॥ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কচুয়ার শাঁখারিকাঠি বাজারে গণহত্যার শিকার রঘুদত্তকাঠি গ্রামের শহীদ জিতেন্দ্র নাথ দাসের ছেলে নিমাই চন্দ্র দাস বাদী হয়ে ২০০৯ সালে কচুয়া থানায় ওই তিনজনসহ ১২ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ২০১৪ সালের ১০ জুন তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর ১১ জুন আব্দুল লতিফ তালুকদার, ১৯ জুন আকরাম হোসেন খান ও ২১ জুলাই সিরাজ মাস্টারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৫ নবেম্বর তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর ৩২ জন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী তাদের বিরুদ্ধে এবং ৫ জন সাফাই সাক্ষী পক্ষে সাক্ষ্য দেন।

এই তিন রাজাকারের বিরদ্ধে প্রসিকিউশন পক্ষ ৫, ১৭ ও ২৩ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইয়েদুল হক সুমন ও প্রসিকিউটর মোশফেক কবির। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ১৭ ও ২১ জুন সিরাজ মাস্টারের পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী এ্যাডভোকেট আবুল আহসান এবং খান আকরাম হোসেন ও লতিফ তালুকদারের পক্ষে ব্যারিস্টার এম সারওয়ার হোসেন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ ॥ রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, অভিযুক্ত সিরাজ মাস্টার একাত্তরে হত্যা করে উল্লাস প্রকাশ করতেন। তিনি তার অপরাধের জন্য অনুতপ্তও হননি। তাই তিনি কোন অনুকম্পা পেতে পারেন না। সর্বোচ্চ সাজাই তার প্রাপ্য। এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করলেও সংক্ষুব্ধ আসামি পক্ষ বলেছে, তারা আপীল করবে। মামলার প্রসিকিউটর সাইয়েদুল হক সুমন বলেন, কসাই সিরাজ মাস্টারের যে রায় হয়েছে তা যথাযথ। তিনি ১৯৭১ সালে প্রতিদিন একজন করে মানুষ হত্যা করতেন। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন, শিক্ষক এত নিচে নামতে পারেন আমরা এটা ভাবতে পারি না। কিন্তু তিনি তা করেছেন।

অপরদিকে দ-প্রাপ্ত শেখ সিরাজুল ইসলামের (সিরাজ মাস্টার) আইনজীবী আবুল হাসান বলেন, এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। রাজাকার কমান্ডারের অভিযোগের পক্ষে কোন দলিল দেখাতে পারেননি রাষ্ট্রপক্ষ। আসামিপক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে আপীল করা হবে। খান আকরাম হোসেনের আইনজীবী সারোয়ার হোসেন বলেন, আমৃত্যু কারাদ-াদেশের বিরুদ্ধে আপীল করা হবে। আপীলের প্রস্তুতি নেয়া হবে এখন থেকেই।

প্রসিকিউশন পক্ষে সন্তোষ আসামি পক্ষ বিক্ষুব্ধ ॥ বাগেরহাটের রাজাকার কমান্ডার শেখ সিরাজুল ইসলামকে (সিরাজ মাস্টার) মৃত্যুদ- ও খান আকরাম হোসেনকে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেয়ায় খুশি হয়েছেন প্রসিকিউশন পক্ষ। অন্যদিকে আসামি পক্ষ সংক্ষুব্ধ। তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করবেন বলে জানিয়েছেন।

মামলার প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী জনকণ্ঠকে বলেছেন, আমরা রায়ে খুশি। কসাই সিরাজ মাস্টার এলাকায় যেভাবে হত্যা গণহত্য লুটপাট অপহরণ করেছিল তা আমরা ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ করতে সফল হয়েছি। অন্য প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সাইয়েদুল হক সুমন বলেন, কসাই সিরাজ মাস্টারের যে রায় হয়েছে তা যথাযথ। তিনি ১৯৭১ সালে প্রতিদিন একজন করে মানুষ হত্যা করতেন। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন, শিক্ষক এত নিচে নামতে পারেন আমরা এটা ভাবতে পারি না। কিন্তু তিনি তা করেছেন। অপরদিকে দ-প্রাপ্ত শেখ সিরাজুল ইসলামের (সিরাজ মাস্টার) আইনজীবী আবুল হাসান বলেন, এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। রাজাকার ডেপুটি কমান্ডারের অভিযোগের পক্ষে কোন দলিল দেখাতে পারেনি প্রসিকিউশন পক্ষ। আসামিপক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে আপীল করা হবে। খান আকরাম হোসেনের আইনজীবী সারোয়ার হোসেন বলেন, আমৃত্যু কারাদ-াদেশের বিরুদ্ধে আপীল করা হবে। আপীলের প্রস্তুতি নেয়া হবে এখন।

২১তম রায় ॥ ২০১০ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ পর্যন্ত ২১টি মামলার রায় হয়েছে। তার মধ্যে ২৪ জনকে বিভিন্ন দ- প্রদান করা হয়েছে। যাদের দ- দেয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন, জামায়াতের সাবেক রুকন বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদ (মৃত্যুদ-), জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা (আমৃত্যু কারাদ- (আপীলে মৃত্যুদ-, পরবর্তীতে রায় কার্যকর), জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (মৃত্যুদ- ) আপীলে আমৃত্যু কারাদ-, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান (মৃত্যুদ- ) আপীল বিভাগেও মৃত্যুদ- বহাল, পরবর্তীতে রায় কার্যকর। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম (৯০ বছরের কারাদ-) অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ (মৃত্যুদ-), ১৬ জুন আপীল বিভাগেও তার মৃত্যুদ- বহাল রেখেছেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (মৃত্যুদ-), আপীল বিভাগেও মৃত্যুদ- বহাল। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আব্দুল আলীম (আমৃত্যু করাদ-) অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ, বদর বাহিনীর নেতা চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এবং মোঃ আশরাফুজ্জামান খান (মৃত্যুদ-), জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী (মৃত্যুদ-), জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাশেম আলী (মৃত্যুদ-), বিএনপি নেতা নগরকান্দা পৌর মেয়র জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকার(মৃত্যদ-), আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোঃ মোবারক হোসেন (মৃত্যুদ-), জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী কায়সার বাহিনীর প্রধান সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার (মৃত্যুদ-), জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজাহারুল ইসলাম (মৃত্যুদ-) জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান (মৃত্যুদ-) ও জাতীয় পাটির আব্দুল জব্বার (আমৃত্যু কারাদ-)। মাহিদুর রহমান এবং আফসার হোসেন চুটু (আমৃত্যু কারাদলাড), হাসান আলী (মৃত্যুদ-), ফোরকান মল্লিক (মৃত্যুদ-) সর্বশেষ কসাই সিরাজকে মৃত্যুদ- ও খান আকরামকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়েছে।

যে চার্জে মৃত্যুদ- ॥ শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারের বিরুদ্ধে প্রমাণিত ও মৃত্যুদ- পাওয়া পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম চারটিতে একা অভিযুক্ত করা হয় তাকে। পঞ্চমটিতে তিনজনই অভিযুক্ত হন।

চার্জ-১ : ১৯৭১ সালের ১৩ মে বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে রাজাকাররা বাগেরহাটের সদর থানার রনজিৎপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর লুণ্ঠন করে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় নিরস্ত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৪০/৫০ জনকে হত্যা।

চার্জ-২ : ১৯৭১ সালের ২১ মে ভারতের শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ২/৩ হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাগেরহাটের রামপাল থানার ডাকরার কালীমন্দিরে জড়ো হন। সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে রাজাকাররা তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এ হামলা চালিয়ে সেদিন ৬/৭শ’ জনকে হত্যা করা হয়।

চার্জ-৩ : ১৯৭১ সালের ১৮ জুন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগেরহাটের সদর থানার বেসরগাতী, কান্দাপাড়া ও কান্দাপাড়া বাজার এলাকায় আক্রমণ চালিয়ে সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিরীহ, নিরস্ত্র ২০ জনকে অপহরণের পর তাদের আটকে রেখে নির্যাতন চালায়। পরে তাদের মধ্য থেকে ১৯ জনকে হত্যা করা হয়। একজন ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান।

চার্জ-৪ : ১৯৭১ সালের ১৪ অক্টোবর বেলা ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত বাগেরহাটের সদর থানার চুলকাঠিতে হামলা চালিয়ে ৫০টি বাড়ি লুণ্ঠনের পর অগ্নিসংযোগ করা হয়। ওইদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ৭ জন নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে রাজাকাররা।

চার্জ-৫ : তিনজনকেই অভিযুক্ত করে পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৫ নবেম্বর বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগেরহাটের কচুয়া থানার শাখারিকাঠি হাটে হামলা চালিয়ে অভিযুক্তরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ৪২ জন নিরীহ, নিরস্ত্র লোককে আটক করেন। পরে তাদের নির্যাতন করে হত্যা করেন। এছাড়া তাদের বাড়ির মালামাল লুণ্ঠনের পর অগ্মিসংযোগ করেন। এসব অপরাধ সংঘটিত করেন আসামিরা।

চার্জ-৬ : তিনজনকেই অভিযুক্ত করে ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২২ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বাগেরহাটের কচুয়া থানার বিভিন্ন গ্রামে হামলা চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিরস্ত্র ৫ জনকে অপহরণ ও আটক করে সিরাজসহ তিনজনের নেতৃত্বে রাজাকাররা। পরে তাদের নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

চার্জ-৭ : খান আকরাম হোসেন ও আব্দুল লতিফ তালুকদারকে অভিযুক্ত করে সপ্তম অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের তেলিগাতীতে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান শিকদারকে আটক করার পর তাকে নির্যাতন করে হত্যা করেন আসামিরা।

কে এই কসাই সিরাজ ॥ বাগেরহাট সদরের মির্জাপুর গ্রামের গোটাপাড়া গ্রামের হারেজউদ্দিন শেখ ও সালেহা বেগমের ছেলে শেখ সিরাজুল হককে স্থানীয় বাসিন্দারা একসময় চিনতেন সিরাজ মাস্টার নামে। একাত্তরে বেয়নেট দিয়ে গলা কেটে বহু মানুষকে হত্যার কারণে তার নাম হয় ‘কসাই সিরাজ’।

১৯৪২ সালে জন্ম নেয়া সিরাজ বিএ পাস করার পর বাগেরহাটের সায়েড়া মধুদিয়া কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে তিনি খুলনার মাল্টিলেটারাল হাইস্কুলে যোগ দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত সেখানেই চাকরি করেন। মামলার নথি অনুযায়ী, মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন বা এনএসএফ-এর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসা সিরাজ পরে মূল দলেও সক্রিয় হন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন এবং ওই সশস্ত্র বাহিনীর বাগেরহাট অঞ্চলের উপ-প্রধানের দায়িত্ব পান। জেলার বিভিন্ন স্থানে রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধে অংশ নেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় সিরাজ মাস্টার রাজাকার বাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির একেএম ইউসুফের ‘বাঁ হাত’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ইউসুফ মামলার বিচার চলাকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা কসাই সিরাজকে ধরে এনে বাগেরহাট শহরের একটি স্কুলে আটকে রাখে। খবর পেয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষ তাকে দেখতে আসে। পরে দীর্ঘদিন তিনি কারাগারে ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ত্রিশ বছর পর ২০০১ সালে সিরাজ যোগ দেন বিএনপিতে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

আকরাম হোসেন ॥ অন্যদিকে খান আকরাম হোসেনের জন্ম ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের দৈবজ্ঞহাটি গ্রামে। বাবার নাম জয়নাল আবেদীন খান, আর মা জুলেখা বেগম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেন আকরাম। এরপর ভোল পাল্টে সরকারী চাকরিও জুটিয়ে ফেলেন। কিশোর বয়সে যুদ্ধাপরাধে অংশ নেয়া আকরাম কৃষি বিভাগের মেকানিক হিসেবে ২০১১ সালে অবসরে যান। সিরাজ মাস্টারের মতো আকরামও একাত্তরে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন এবং বাগেরহাট অঞ্চলে পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগিতায় নানা ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নেন।

লতিফ তালুকদার ॥ যে তিনটি ঘটনায় আকরামকে ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত করা হয় তার প্রতিটি ঘটনাতেই সঙ্গে ছিলেন বাগেরহাটের আরেক রাজাকার সদস্য লতিফ তালুকদার। রায়ের আগে মৃত্যু হওয়ায় চার দশক আগের করা অপরাধের সাজা তার আর জেনে যাওয়া হয়নি। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করা লতিফ ১৯৮৫ সালে কুচয়া থানার রাড়িপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। সে সময় তিনি ছিলেন জাতীয় পার্টির একজন স্থানীয় নেতা। ১৯৯০ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন বলে জানা যায়। লতিফ তালুকদার বাগেরহাটের কচুয়া থানার শোলারকোলা গ্রামের জেন্দের আলী তালুকদার ও সামর্তমান বিবির ছেলে।