২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়তে চাই

চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়তে চাই
  • মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে মেয়র নাছির

স্টাফ রিপোর্টার ॥ শতভাগ রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করে চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ার ঘোষণা দিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির। আর তা করতে নাগরিকদের সর্বোচ্চ সহযোগিতার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সহায়তা কামনা করেছেন। তাছাড়া নাগরিকদের সঠিক ও বিশ্বমানের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানে সরকারের কাছে সিটি গবর্নেন্স বা নগর সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। সুন্দর, পরিকল্পিত, গ্রিন সিটি হিসেবে চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনে যে কোন প্রকার হুমকি

আসলে তা প্রতিরোধ করতে নিজের জীবন দিতেও রাজি আছি। মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে চিটাগাং জার্নালিস্ট ফোরাম ঢাকা (সিজেএফডি) আয়োজিত মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এই প্রথমবারের মতো তিনি ঢাকায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন।

মেয়র নাছির বলেন, চট্টগ্রাম এক সময় ছিল সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী। বর্তমানে তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। যা পুনরুদ্ধার করতে হবে। কিছু মানুষের খামখেয়ালিপনা, আত্মকেন্দ্রিকতা আর লোভের কারণে চট্টগ্রাম আজ হুমকির মুখে। পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র চট্টগ্রামে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করলেও শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন তথা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তারা এগিয়ে আসতে পারছে না। আমাকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব নিয়েই একপাহাড় প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার অবস্থা যে এত নাজুক ছিল তা আমি কোনভাবেই বুঝতে পারিনি। গত কয়েকদিনেই আমি তা টের পেয়েছি। বন্দর নগরীর এ অভিভাবক বলেন, আমি রাজনীতি করে নিচের থেকে উপরে উঠে এসেছি। তাই দায়িত্ব পালনে সবার সহযোগিতা পেলে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠনের অঙ্গীকার করেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদক।

মেয়র নাছির বলেন, আমি একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। চট্টগ্রামবাসীর মধ্যেও রাজনৈতিক ভেদাভেদ আছে। তবে আমি সবাইকে বলেছি, আমার কাছে মেয়র হিসেবে কোন দল, ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ নেই। নগর সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, একটি সিটির সার্বিক উন্নয়নের জন্য তা প্রয়োজন। তবে এ জন্য এটি কিভাবে পরিচালিত হবে তা আইন দ্বারা ঠিক করে দিতে হবে। বর্তমানে মেয়রদের নগরের ওপর কোন কর্তৃত্ব নেই। শহরের অনেক রাস্তা বা স্থাপনাই এলজিইডি, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্পোরেশন, বা অন্য প্রতিষ্ঠানের।

সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ কোন মাস্টারপ্ল্যান গঠনের চিন্তা আছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র জানান, এবার একটি পরিকল্পিত নগর গড়তে পরিকল্পনা হাতে নেয়া হবে। এ নিয়ে আমরা বিশিষ্ট নাগরিক তথা পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে আলোচনা করব। আলোচনার সিদ্ধান্ত মোতাবেক পরবর্তী কর্মকা- পরিচালিত করা হবে।

নাছির বলেন, চট্টগ্রামই হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র শহর যেখানে নদী, পাহাড়, সমতলের সমষ্টি। আর পাশে রয়েছে সাগর। আমি মেয়রের দায়িত্ব নেয়ার পর নগরীর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। কর্ণফুলীর নিচ দিয়ে চীন সরকার ও আমাদের সরকারের সহযোগিতায় টানেল নির্মিত হচ্ছে। এটা হলে কর্ণফুলীর দুপাড়ে পরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন হবে। যা চট্টগ্রামকে বদলে দিবে। দেশের ৮০ ভাগ আমদানি রফতানি এ বন্দর দিয়ে পরিচালিত হলেও চট্টগ্রামের উন্নয়নে তেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। চট্টগ্রাম সিটির খাল, নালা ও ডোবাগুলো প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। নাগরিকগণ মনে করছেন নালা খালগুলো এক ধরনের ডাস্টবিন। নগরের সৌন্দর্য সুরক্ষায় এ ধরনের ভুল ধারণা সবাইকে পরিহার হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিমাত্রায় বৃষ্টিপাত, সমুদ্রের পানিস্তর বেড়ে যাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম আজ জলাবদ্ধতা আর দুর্গন্ধের নগরীও। এ নগরকে বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কেবল সিটি কর্পোরেশনের একার পক্ষে এটাকে বাঁচানো সম্ভব নয়।

আ জ ম নাছির বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের দেনা এখন ২৫০ কোটি টাকা। কর্পোরেশনের সাতটি বিভাগই চলছে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে। দীর্ঘদিন যাবত কোন প্রধান প্রকৌশলী বা কোন সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার নেই। শুধু এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে প্রকৌশল শাখা চলছে। এছাড়া প্রধান স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা রাজস্ব কর্মকর্তা নেই। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য লোকবল নেই, যা লোকবল রয়েছে তার অর্ধেকই অস্থায়ী। শুধু নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়েই বর্তমানে ২৩টি মামলা রয়েছে। ফলে জনবল নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। কর্পোরেশনের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের মধ্যে একে অপরকে প্রতিপক্ষ মনে করে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলা প্রত্যাহার করাতে সক্ষম হয়েছি। তবে হঠাৎ করেই এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।

আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অভিযানে নামবেন ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, নগরীর সৌন্দর্য বর্ধনে অবৈধ বিলবোর্ড রাখা হবে না। আমি ইতোমধ্যেই ৩৩০টি অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণ করেছি। এ অভিযান চলতেই থাকবে। সিটির সার্বিক উন্নয়নে রাজস্ব আদায়ে কঠোরতার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। মনে রাখবেন দলীয় পরিচয়ে কেউ রাজস্ব না দিয়ে থাকতে পারবেন না। আমি সবার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এরা সবাই আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ক্ষতি করতে পারে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি যে কোন ঝুঁকি নিতে রাজি। এতে আমার জীবন গেলেও ভয় পাই না। মেয়র নাছির জানান, চট্টগ্রামের উন্নয়নে এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক, জাইকাসহ নানা উন্নয়ন সহযোগী সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। দরকার কেবল মেয়রের স্বাধীনতা আর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দক্ষ জনবল। শহরের বেহাল রাস্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাস্তার দীর্ঘস্থায়িত্ব বাড়াতে মেয়র বিটুমিনের পরিবর্তে কংক্রিটের রাস্তা হতে হবে। বিটুমিনের রাস্তা নিম্নমানের হলে ও কংক্রিটের রাস্তা দীর্ঘস্থায়ী হয়। জোয়ারের পানিতে বিটুমিন নষ্ট হলেও সিমেন্টের রাস্তা ১০ থেকে ১৫ বছর টিকে থাকে। তবে চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে আগামী ৫ বছরের মধ্যেই সম্ভব।

সংবাদ সম্মেলনে সিজেএফডি সভাপতি সাইফ ইসলাম দিলাল, সাধারণ সম্পাদক শামীম জাহাঙ্গীর, শাহীনুল ইসলাম চৌধুরী, রণজিত কুমার বিশ্বাস, মুস্তফা কামাল, অনুপ খাস্তগীরসহ সাংবাদিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।