১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফুটবলের আলোচিত কেলেঙ্কারি!

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। ছেলে-বুড়ো, আবাল-বৃদ্ধবনিতা সবাই এই খেলার ভক্ত। এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে ফুটবল বোঝে না। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলের এত সমাদর। এই খেলার প্রতি মানুষের মুগ্ধতা বেড়েছে যুগে যুগে পেলে, ম্যারাডোনা, প্লাতিনি, জিদান, রোনাল্ডো, মেসিদের মতো তারকাদের আবির্ভাবে। কিন্তু মাঝে মাঝে নির্মল এই খেলাটা কলুষিতও হয়েছে বিভিন্ন কারণে। খেলার মাঠে মেজাজ হারিয়ে অনেক ধরনের ‘আকাম’ করেছেন ফুটবলাররা।

সম্প্রতি এমন কা- করে সমালোচিত হয়েছেন নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে খ্যাত লিওনেল মেসি। প্রতিপক্ষের ফুটবলারের গলা চেপে ধরে নায়ক থেকে খলনায়ক হয়েছেন বার্সিলোনার আর্জেন্টাইন তারকা। এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। ২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে জিনেদিন জিদান এমন কা- ঘটিয়ে ফুটবলবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে ঢুস মেরেছিলেন ফরাসী কিংবদন্তি। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ইতালির জিওর্জিও চিয়েল্লিনিকে কামড় দিয়ে নিষিদ্ধ হন উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ। এবার মেসির দ্বারা আক্রান্ত ফুটবলারটি ফ্রান্সের হলেও তার ক্লাব ইতালি এ এস রোমা।

মেসির দ্বারা আক্রান্ত হওয়া ফুটবলারটি হলেনÑ রোমার ফরাসী ডিফেন্ডার এমাপো ইয়াঙ্গা-এমবিয়া। গত সপ্তাহে ন্যূক্যাম্পে জোয়ান গ্যাম্পার ট্রফির শিরোপানির্ধারণী ম্যাচে অনাকাক্সিক্ষত এই কা- ঘটান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। অবশ্য মেসির সৌভাগ্য, এই অযাচিত ঘটনার দরুণ লালকার্ড দেখতে হয়নি তাঁকে। এরপরও তাঁর সমালোচনায় মুখর এখন ফুটবলবিশ্ব। মাঠে ফুটবলারদের মেজাজ হারিয়ে কলঙ্কিত ঘটনার জন্ম দেয়া নতুন কিছু নয়। তবে ঘটনাটির সঙ্গে যখন মেসির নাম জড়িয়ে পড়ে তখন তা অবিশ্বাস্যই লাগে। কেননা শান্ত ব্যবহার, মুখে সব সময়ই হাসি, প্রতিপক্ষকে সব সময়ই সম্মান দেখানোর জন্য সর্বদাই প্রশংসিত মেসি। সেই তিনিই যা করেছেন তা অবিশ্বাস্যের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে কামড়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকবার। গলা ধাক্কা দিয়ে লালকার্ড দেখার ঘটনাও কম নয়। কিন্তু মেসির দ্বারা এমন কা- ঘটবে তা কেউ ভাবতেও পারেননি। জোয়ান গ্যাম্পার ট্রফির ম্যাচে ইয়াঙ্গা এমবিয়ার গলা চেপে ধরে ফুটবল বিশ্বকেই চমকে দিয়েছেন মেসি।

কোপা আমেরিকায় চিলির কাছে ফাইনালে হারের পর থেকেই সমালোচনায় জেরবার মেসি। বার্সিলোনার প্রাক-মৌসুম সফরে ছিলেন বিশ্রামে। নেইমারের সঙ্গে এই ম্যাচে তিনিও ফেরেন ক্যাটালানদের হয়ে। মেসি-নেইমার যুগলবন্দীতে দুর্দান্ত খেলতে থাকে বার্সা। ২৬ মিনিটে নেইমারের গোলে এগিয়েও যায় গত মৌসুমের ট্রেবলজয়ীরা। কোপা আমেরিকার হতাশা মুছে মেসি খেলছিলেন দুর্দান্ত। কিন্তু ম্যাচের ৩৩ মিনিটে সেই ঘটনা, মেসির ক্যারিয়ারেই যা কালো দাগ এঁকে দিয়েছে। এ সময় ফরাসী ডিফেন্ডার এমবিয়ার সঙ্গে ঝামেলা বাধিয়ে বসেন মেসি। শুরুটা করেছিলেন অবশ্য এমবিয়া। রোমার অর্ধে বল নিয়ে এগোচ্ছিলেন মেসি, তাঁকে পাহারা দিয়ে রাখার দায়িত্বে ছিলেন এমবিয়া। নেইমারকে পাস দিয়ে মেসি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় এমবিয়া যেভাবে মেসিকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন, সেটা হয়তো পছন্দ হয়নি তাঁর। নেইমারের কাছ থেকে ফিরতি পাস পেয়ে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন। সামনে কেবল গোলরক্ষক। এ সময়ই রেফারি অফসাইডের বাঁশি বাজান। কিন্তু মেসি না থেমে বল নিয়ে এগোতে থাকেন। এ সময় এমবিয়া মেসিকে কিছু বললে তাদের মাঝে তর্ক শুরু হয়। এরপর এমবিয়া ঝামেলা শুরু করেন কপাল দিয়ে মেসিকে ধাক্কা দিয়ে। এর জবাব মেসি দেন মাথা দিয়ে গুঁতো মেরে। গুঁতো মারার পর ফরাসী ডিফেন্ডারের গলা ধরে ধাক্কাও দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

উত্তেজনা ছড়ানো ম্যাচে মেসি এমবিয়ার গলা চেপে ধরার পর সতীর্থরা এসে পরে পরিস্থিতি শান্ত করেন। প্রীতি ম্যাচ হওয়ায় লালকার্ড দেখা থেকে বেঁচে যান সাবেক রেকর্ড টানা চারবারের ফিফা সেরা ফুটবলার। যে কারণে ২০০৫ সালে নিজের আন্তর্জাতিক অভিষেক ম্যাচে শেষবার লাল কার্ড দেখা মেসিকে ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার লালকার্ড দেখতে হয়নি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের জার্সি গায়ে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে ম্যাচের ৬৩ মিনিটে মাঠে নেমেছিলেন মেসি। ৪৪ সেকেন্ড পরই লালকার্ড দেখে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। সেটিই মেসির প্রথম ও শেষ লাল কার্ড দেখা! কলঙ্কিত কা- ঘটিয়ে এবার তিনি রক্ষা পেলেন প্রীতি ম্যাচের কারণে। তবে সমালোচনা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বিশ্বের অন্যতম সেরা এই সুপারস্টার।

গোটা ফুটবলবিশ্ব অবাক হয়েছেন মেসির এমন কা-ে। তবে এই বিষয়টিকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না বার্সিলোনার সহ-সভাপতি জর্ডি মেস্ট্রে। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, মেসির এমন কা- অনেকটাই স্বাভাবিক। অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফুটবল ম্যাচে অনেক ঘটনা ঘটে থাকে। আর মেসির মতো এ ধরনের ঘটনা হরহামেশাই হচ্ছে। ফুটবল ম্যাচে এটা স্বাভাবিক। এ ঘটনা অকল্পনীয় নয়। তিনি আরও বলেন, মেসির মতো এমন ঘটনা আগেও যেমন ঘটেছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে। আপনি যখন ফুটবল খেলবেন, তখন আপনাকে স্বাভাবিক বিষয়গুলোকে মেনে নিতে হবে। আর সেটাই একজন ফুটবলারের জন্য স্বাভাবিক ঘটনা।

জিনেদিন জিদান বেশি কথা বলেন না। তবে বল পায়ে তিনি কবিতা লিখতেন! ফ্রান্সের বর্ণবাদী বিভক্তির মিলনের প্রতীক হয়ে আছেন আলজেরীয় বংশোদ্ভূত এই ফরাসী ফুটবল তারকা। জিদান তাঁর প্রজন্মের সেরা ফুটবলার। কোন বিতর্ক ছাড়াই এটি মেনে নেবেন সবাই। দুটি বিশ্বকাপ ফাইনাল দিয়ে জিদানকে মনে রাখবে ফুটবলবিশ্ব। যার একটি দিয়ে তিনি উঠেছিলেন যশ আর খ্যাতির চূড়ায়, আরেকটিতে চূড়া থেকে হয়েছিলেন পতিত। ১৯৯৮ সালে দেশের মাটিতে আইমে জ্যাকের বিশ্বকাপজয়ী দলের প্রধান চরিত্র ছিলেন জিদান। অসামান্য সৃজনশীলতা আর দীপ্তিময় আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ফ্রান্সকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে। মুখোমুখি হয়েছিলেন ফেবারিট ব্রাজিলের। ফাইনালে টাক মাথায় মার্কা মারা হেডে দারুণ দুটি গোল করেন। সবাইকে অবাক করে ফ্রান্স ৩-০ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে হয় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

দেশে এবং দেশের বাইরে নায়ক হিসেবে জিদান তার পর থেকেই বসে যান পূজার বেদিতে। আট বছর পর জিদানের বিশ্বকাপ গল্পে নেমে আসে নাটকীয় এক ঘূর্ণাবর্ত। সবকিছু ঠিকঠাকভাবেই এগোচ্ছিল। জিদান-জাদুতেই একে একে বাধা পেরিয়ে ফাইনালে ওঠে ফ্রান্স। এবার শিরোপা জয়ে ফ্রান্সের বাধা ছিল ইতালি। ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই পেনাল্টি থেকে গোল করে এগিয়ে দিয়েছিলেন জিদান। মনে হচ্ছিল বিশ্বকাপে রচিত হতে চলেছে আরেকটি জিদান-গাথা। কিন্তু জিদানের দেয়া গোলটি পরিশোধ করে দেন ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জি। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষ হতে তখন আর মিনিট দশেক বাকি। ম্যাচে সমতা (১-১)। মাতেরাজ্জির সঙ্গে কিছু বাক্য বিনিময়ের পর আচমকাই জিদান ঢুস দিয়ে বসেন মাতেরাজ্জির বুকে। লালকার্ড দেখে জিদানকে লজ্জায় মাথা নিচু করে শিরোপার পাশ দিয়েই চলে যেতে হয় মাঠের বাইরে। অবিস্মরণীয় একটি ফুটবল ক্যারিয়ারের উপসংহারটা হয় এমনই। টাইব্রেকে ইতালির কাছে হেরে যায় ফ্রান্স। জিদানের এই ঘটনা বিশ্ব ফুটবলের কালো অধ্যায়গুলোর শীর্ষে।

কারও কারও বিশ্বকাপ শেষ হয় ইনজুরির জন্য। আর লুইস সুয়ারেজের ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল কামড়ের কারণে! ইতালির ডিফেন্ডার জিওর্জিও চিয়েল্লিনির কাঁধ কামড়ে দেয়ার অপরাধে ফিফা উরুগুয়ের স্ট্রাইকার সুয়ারেজকে দোষী সাব্যস্ত করে। ইতালি-উরুগুয়ের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সুয়ারেজ হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার চিয়েল্লিনির কাঁধে দাঁতের কামড় বসিয়ে দেন। বল তখন অন্যদিকে থাকায় সুয়ারেজের এ কামড় কা- রেফারি বা লাইন্সম্যান কেউ দেখতে পাননি। চিয়েল্লিনি অবশ্য জার্সি খুলে বার বার কামড়ের চিহ্ন দেখিয়ে রেফারির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। পরে ম্যাচ শেষে ভিডিও পর্যালোচনা করে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি সুয়ারেজ ও উরুগুয়ের ফুটবল ফেডারেশনকে শুনানিতে ডাকে। এ কমিটি তাকে পরে দোষী সাব্যস্ত করে। মাঠে ফুটবলারদের আচরণবিধির যে লম্বা তালিকা তৈরি করেছে ফিফা-সেটা ভাঙেন সুয়ারেজ। তাইতো শাস্তি পেতে হয় বার্সিলোনা তারকাকে।

উল্লিখিত ঘটনাগুলো ছাড়া আরও অনেক ঘটনা আছে যা ফুটবলকে কলঙ্কিত করেছে। এই যেমন ‘ঈশ্বরের হাত’। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে কিন্তু মাথার বদলে হাত ব্যবহার করেও পার পেয়েছিলেন দিয়াগো ম্যারাডোনা। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে হেড না করে, হাত দিয়ে গোল করেছিলেন ‘আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর’? তিউনিসিয়ার রেফারি আলী বিন-নাসের তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি। ম্যারাডোনার হাত দিয়ে করা গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। তারপর অবশ্য ইংল্যান্ডের ছয়জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলটিও করেছিলেন ম্যারাডোনা। তবে বেশি আলোচনা হয় সেই হাত দিয়ে করা গোল নিয়েই। ২-১ গোলে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিল ইংলিশরা। ম্যাচ শেষে হাতের গোল সম্পর্কে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘গোলটি হয়েছে আসলে খানিকটা ম্যারাডোনার মাথা আর ঈশ্বরের হাতের সমন্বয়ে। সেই থেকে ‘ঈশ্বরের হাত’ বললে সবার মনে পড়ে যায় ম্যারাডোনার সেই হাত দিয়ে করা গোলটির কথা।