২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সুলতানা কামাল- এক কৃতী এ্যাথলেটের গল্প

সুলতানা কামাল (খুকী)। আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের এক রূপময় আদর্শ চরিত্র। তাঁর হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি এ দেশের নারী খেলোয়াড়দের জন্য এখনও অন্যরকম এক অনুপ্রেরণার আঁধার। মাঠে ও মাঠের বাইরে অসাধারণ ব্যক্তিত্বে গড়ে উঠেছিলেন তিনি। এ কারণেই যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে ট্র্যাক এ্যান্ড ফিল্ডে লড়েছেন তাঁরা কখনই তাঁকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি। এখনও এ্যাথলেট সুলতানা যেন সবার মনেই সমুজ্জ্বল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সব কিছুই তুচ্ছ হয়ে উঠেছিল ঘাতক চক্রের কাছে। আর তাই তো বঙ্গবন্ধু পরিবারের বউ হয়ে আসা এই এ্যাথলেটকেও নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। খুব সম্ভবত এশিয়া মহাদেশে এভাবে আর কোন নারী এ্যাথলেটকে বুলেটবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার নজির নেই। সেই কারণেই এ্যাথলেট সুলতানা কামালের বুলেটবিদ্ধ মৃত্যু বড় মনোযোগ কাড়ে।

মৃত্যুর মাত্র একমাস আগে ১৪ জুলাই বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য হয়ে এসেছিলেন তিনি। শেখ কামালের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল পারিবারিক মতামতের ভিত্তিতেই। তবে বঙ্গবন্ধুর প্রথম পুত্র শেখ কামালের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগেই ক্রীড়াঙ্গনের অদ্বিতীয়া এক নারী হিসেবে খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তারপর বঙ্গবন্ধু পরিবারের বধূ হয়ে আসায় সন্দেহাতীতভাবেই তিনি উঠেছিলেন আরও উচ্চতায়। যদ্দুর জানা যায়, সুলতানাদের পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সখ্য ছিল স্বাধীনতার আগে থেকেই। সেই কারণে কামাল-সুলতানা একে অপরকে ভালভাবেই জানতেন। আবার দু’জনেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুই প্রথম ফরিদপুরের কোন এক পার্লামেন্ট সদস্যকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠান সুলতানার বাবা দবিরউদ্দিনের কাছে। তারপর দু’পরিবারের সম্মতিতে কামাল ও সুলতানার বিয়ে সম্পন্ন হয়। সুলতানা বউ হয়ে আসেন বঙ্গবন্ধুর পরিবারে।

এ্যাথলেট হিসেবে সুলতানা কামাল যে অসাধারণ ছিলেন জাতীয় এ্যাথলেটিক্সের রেকর্ডই তার বড় প্রমাণ। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় এ্যাথলেটিক্সের আসর বসে ’৭৩ সালে। এই প্রতিযোগিতায় তিনি অসাধারণ কৃতিত্বেও স্বাক্ষর রাখেন। বেঁচে থাকা পর্যন্ত সুলতানা কামাল ’৭৩, ৭৪ এবং ৭৫ পর পর এই তিন সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। রেকর্ডপত্র অনুসন্ধান করে দেখা যায়, সুলতানা কামালের প্রিয় ইভেন্ট ছিল হার্ডলস, হাইজাম্প এবং ব্রডজাম্প। এই তিনটি ইভেন্টে বরাবরই তিনি দেশে ও বিদেশের মাটিতে অসাধারণ পারফরমেন্স প্রদর্শন করেন।

স্বাধীনতার পর প্রথম ১৯৭৩ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে জাতীয় এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতার আসর বসে। এই আসরে মেয়েদের বিভাগে মোট নয়টি ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে এই প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো এককভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তিনটি ইভেন্টে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে এক অনন্য রেকর্ড গড়েন সুলতানা। ১০০ মিটার হার্ডলস, হাই জাম্প এবং ব্রড জাম্পে তিনি প্রথম হন। এছাড়া ১০০ মিটার স্প্রিন্টারে অংশ নিয়ে তিনি দ্বিতীয় হন। ১০০ মিটার হার্ডলস প্রতিযোগিতায় সুলতানা আহমেদ খুকী আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের কাজী লুৎফুন্নেসা এবং দিনাজপুর জেলা একাদশের শামীমা আরা মিমুকে (বর্তমানে শামীমা সাত্তার) পেছনে ফেলে প্রথম হন। লুৎফুন্নেসা ও মিমু যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হন। এদিকে হাইজাম্পেও শ্রেষ্ঠত্ব দেখান সুলতানা আহমেদ খুকী। দিনাজপুর জেলা একাদশের ফরিদা বেগম লিলি এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সুমিত্রা রায়কে পেছনে ফেলে প্রথম হন। লংজাম্পেও সুলতানা আহমেদ প্রথম হন। তাঁর পেছনে থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হন দিনাজপুর জেলা একাদশের শামীমা আক্তার মিমু এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মিস হামিদা। এই তিন ইভেন্টের বাইরে ১০০ মিটার স্প্রিন্টারে তিনি দ্বিতীয় হন আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের শামীম আরা টলির পেছনে থেকে। এই ইভেন্টে তৃতীয় হন দিনাজপুর জেলা একাদশের শামীমা আরা মিমু।

পরের বছর ’৭৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতাতে ব্রড জাম্পে দিনাজপুর জেলা একাদশের শামীমা আরা মিমু এবং সুফিয়াকে পেছনে ফেলে প্রথম হন সুলতানা আহমেদ। হাইজাম্পে খুলনা জেলা একাদশের মেরিনা খানমের কাছে হেরে গিয়ে দ্বিতীয় হন। এই ইভেন্টে তৃতীয় হন সিলেট জেলা একাদশের আবেদা চৌধুরী। এ বছর ১০০ মিটার হার্ডলসে অপ্রত্যাশিতভাবে শ্রেষ্ঠত্ব হারান সুলতানা কামাল। কুমিল্লা জেলা একাদশের রোকেয়া বেগমের কাছে পরাজিত হন। এই ইভেন্টে তৃতীয় হন বিটিএমসির শামীম আরা টলি। এরপর ’৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় জাতীয় এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা। এই জাতীয় আসরই ছিল সুলতানা কামালের জীবনে শেষ অংশগ্রহণ। এই আসরে সুলতানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে দারুণ পারফর্ম করে নিজের গৌরব ফিরিয়ে আনেন। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ১০০ মিটার হার্ডলসে ১৭.০৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনি নতুন রেকর্ড গড়ে প্রথম হন। তাঁর পেছনে থেকে দ্বিতীয় হন কুমিল্লা জেলা একাদশের রোকেয়া বেগম খুকী এবং চট্টগ্রাম জেলা একাদশের রওশন আরা রেশমি। একইভাবে তিনি ব্রডজাম্পেও নিজের কৃতিত্ব ধরে রাখেন। বিটিএমসির শামীম আরা মিমু এবং কুমিল্লা জেলা একাদশের আনারকলিকে পেছনে ফেলে প্রথম হন।

সুলতানা কামালের জন্ম ১৯৫২ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকার বখশীবাজারে। তাঁর বাবা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীফ ইঞ্জিনিয়ার। ১৯৬৭ সালে তিনি মুসলিম গার্লস স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তৎকালীন গভঃইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে বদরুন্নেসা) ভর্তি হন। ১৯৬৯ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। এরপর অনার্স পাস করে ভর্তি হন এমএ ক্লাসে। এমএতে লিখিত পরীক্ষা দেন। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষা দেয়ার আগেই ঘাতকদের হাতে তিনি নিহত হন। স্কুলবেলা থেকেই সুলতানা খেলাধুলোয় দারুণ পাকা। তারই ধারবাহিকতায় তিনি আন্তঃস্কুল ও কলেজ প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অধিকার করেন। এর মধ্যে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তৎকালীন পাকিস্তান অলিম্পিকে নতুন রেকর্ড স্থাপন করে স্বর্ণপদক জয়লাভ করেছিলেন। শুধু এই নয়, ১৯৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় হার্ডলসে নিজেই নিজের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড স্থাপন করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মূলত তাঁর কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় দল জাতীয় পর্যায়ের লড়াইই একাধিক পদক জয় করতে সক্ষম হয়। সুলতানা কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা ব্লু। ক্রীড়া জগতে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ডাকসু তাকে বিশেষ পদকেও সম্মানিত করে। ১৯৭৩ সালে জাতীয় ক্রীড়ালেখক সমিতি কর্তৃক তিনি সেরা এ্যাথলেটও নির্বাচিত হন। এরকম আরও অনেক সাফল্য রয়েছে সুলতানার।

আসলে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে খেলাধুলায় নিজেকে উৎসর্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশজুড়ে সুলতানা এক অদ্বিতীয়া ক্রীড়াচরিত্র হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। আকর্ষণীয়া চেহারার সঙ্গে এ্যাথলেটিক্স সৌন্দর্য মিলিয়ে নিজেকে এক বর্ণিল রূপ দিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিলেন তিনি। তাঁর চরিত্রে বরাবরই পরিষ্ফুটিত ছিল লড়াই, সাহস আর আজীবন এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প। আর এ কারণেই মৃত্যুর তিন দশক পরেও প্রিয়দর্শিনী এ্যাথলেট হিসেবে এখনও সুরভী ছড়ান তিনি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ যাঁরা নিহত হন তিনি তাঁদেরই একজন।