২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্লার্কের হতাশার বিদায়

  • মোঃ নুরুজ্জামান

চার মাসের ব্যবধানে মুদ্রার দুই পিঠ দেখা হয়ে গেল মাইকেল ক্লার্কের। ২৯ মার্চ মেলবোর্নের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে যেদিন বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলেন, উল্লাসে মেতেছিল গোটা অস্ট্রেলিয়া। ওয়ানেড বিদায়টা ছিল স্বপ্নের মতো। দেশকে পঞ্চম শিরোপা-উৎসবে ভাসিয়ে রঙিন পোশাকের ক্রিকেটকে স্বপ্নীল বিদায় জানিয়েছিলেন ক্লার্ক। চতুর্থ অধিনায়ক হিসেবে দেশকে পঞ্চম বিশ্বকাপ ট্রফি উপহার দেন নিউসাউথ ওয়েলস হিরো। নাম লেখান এ্যালান বোর্ডার (১৯৮৭), স্টিভ ওয়াহ (১৯৯৯) ও রিকি পন্টিংয়ের (২০০৩, ২০০৭) মতো গ্রেটদের কাতারে। সেই তিনিই আজ নিন্দিত! ইংল্যান্ড সফরে এক ম্যাচ বাকি থাকতে ঐতিহ্যের এ্যাশেজ খোয়ানোর পর অনেকটা বাধ্য হয়েই সাদা পোশাকের টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। ‘আজ যে রাজা, কাল সে ফকির’Ñ ক্রিকেটের সঙ্গে জীবনেরও বুঝি অনেক মিল!

ব্যাট হাতে ও নেতৃত্বের টানা ব্যর্থতায় সমালোচনা চলছিল বেশ কিছুদিন দিন ধরে। এমন কি এজবাস্টনের তৃতীয় টেস্টে হেরে পিছিয়ে পড়ার পরও বলেছিলেন, ‘লিখে রাখুন এ্যাশেজের পরও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলব আমি’। ট্রেন্ট ব্রিজ টেস্টে ইনিংস ও ৭৮ রানের লজ্জাজনক হারের সঙ্গে এক ম্যাচ বাকি থাকতে সিরিজ খোয়ানোয় আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। ম্যাচ শেষের সংবাদ মাধ্যমে ম্যাচের হালচিত্র নিয়ে কথা না বলে তাই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, এ্যাশেজেই শেষ। কিংস্টন ওভালে আনুষ্ঠানিকতার শেষ টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর আগাম ঘোষণাটা দিয়ে দিলেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক। ‘আর একটিমাত্র টেস্ট খেলব, তারপরই শেষ হয়ে যাবে আমার ক্যারিয়ার।’ সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার জানিয়ে দেন ক্লার্ক। এরপর তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি আমার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনের সমাপ্তি টানতে যাচ্ছি। ঝড়ের মাঝে লাফ দিয়ে সতীর্থদের ফেলে রেখে একা পালাতে চাই না, তাই ওভালে এ্যাশেজের শেষ টেস্টটা খেলব এবং সেটিই হবে আমার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।’

বুধবার লন্ডনের কিংস্টন ওভালে শুরু হবে পাঁচ ম্যাচ সিরিজের শেষ টেস্ট। ৩৪ বছর বয়সি ক্লার্ক অস্ট্রেলিয়া তো বটেই, আধুনিক ক্রিকেটেরই অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়টা একদমই ভাল যাচ্ছিল না তার। গত দুই-তিন মৌসুম হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি প্রবলভাবে ভোগাচ্ছিল নিউসাউথ ওয়েলসে জন্ম নেয়া এই ক্রিকেটারকে। বিশ্বকাপে দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন টুর্নামেন্ট শুরু হয়ে যাওয়ার পর। দলীয় ‘টিম এফোর্ডে’র সৌজন্যে অস্ট্রেলিয়াকে ট্রফি উপহার দিয়েছেন অধিনায়ক হিসেবে। কিন্তু ব্যাট হাতে ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে পারননি। এ্যাশেজে দলের ভরাডুবির মাঝে সেটি আরও প্রকট হয়ে ধরা পড়ে। শেষ হওয়া চার টেস্টের আট ইনিংসে তার স্কোরÑ ৩৮, ৪ ৭, ৩২*, ১০, ৩ ও ১০, ১৩! সফরে কার্ডিফের প্রথম টেস্টে ১৬৯ রানের হার দিয়ে শুরু করলেও লর্ডসে ৪০৫ রানের বিশাল জয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল অসিরা। এজবাস্টনে ফের ৮ উইকেটের হারে কোণঠাসা হয়ে পড়েন ক্লার্ক। চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষক হয় অবসর, নয় তো অধিনায়ককে কিছুদিনের জন্য বিশ্রামে থাকার দাবি তোলে।

তখন জোড়ের সঙ্গে সে দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও, শেষ পর্যন্ত বাস্তবতাটা মেনে নেন তিনি। ‘এভাবে চলে যেতে চাইনি, এ্যাশেজে, এমনকি জাতীয় দলের হয়ে ব্যক্তিগতভাবে গত ১২টি মাস ছিল খুবই হতাশার। ড্রেসিং রুমে কাউকে আর কষ্ট দিতে চাই না। দু’দিন অনেক ভেবেছি, মনে হয়েছে বিদায় বলার এটাই সময়।’ যোগ করেন ক্লার্ক। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে অধিনায়কদের বিদায়ের করুণ ইতিহাস পুরনো। অধিনায়কের পদ থেকে ছাঁটাই হওয়ার পরও দলের হয়ে খেলেছেন এমন সৌভাগ্য খুব কম ক্রিকেটারের কপালেই হয়েছে। পন্টিং খেলেছিলেন এই ক্লার্কের নেতৃত্বে। তার আগে সর্বশেষ কিম হিউজ, সেটি ১৯৮৫ সালের ঘটনা। এ্যাশেজে এমন ভরাডুবির পর হয়ত ক্লার্ককেও ছুড়ে ফেলা হতো দল থেকে। সেই সুযোগ না দিয়ে নিজেই সম্মানের সঙ্গে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ক্লার্কের নেতৃত্বে ৪৬ টেস্টের ২৩টিতে জয় পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া, হার ১৬টিতে। আর ৭৪ ওয়ানডের ৫০টিতে জয়, হার ২১। ১৩টি টেস্ট সিরিজে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করে জিতিয়েছেন ৮টিতে।

ক্লার্ক বলেন ‘অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১শর বেশি টেস্ট খেলেছি। এটা বিরাট সৌভাগ্যের। সবসময় বলেছি, ক্রিকেট আমার কাছে ঋণী নয়, আমিই ক্রিকেটের কাছে ঋণী। এতদিন খেলতে পারলাম বলে কৃতজ্ঞ।’ ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখার পর টেস্টে ১১৪ ম্যাচে প্রায় ৫০ গড়ে করেছেন ৮,৬২৮ রান। সেঞ্চুরি ২৮টি। ২৪৫ ওয়ানডেতে সংগ্রহ ৭,৯৮১। সেঞ্চুরি ৮টি। করুণ বিদায়ের অপেক্ষায় এমন এক শৈল্পিক ব্যাটসম্যান। এক যুগ অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের সেবা করার পরও এ্যাশেজ ব্যর্থতায় নিন্দুকদের সমালোচনা মাথায় নিয়ে সরে যেতে হচ্ছে ক্লার্ককে। বিদায় বেলায় সব দোষ নিজে মাথা পেতে নেন মাইকেল ক্লার্ক। অসি সেনাপতি বললেন, ‘অস্ট্রেলিয়া এমন একটি দল, যেখানে আপনাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে, কিন্তু আমি সেটি পারিনি।’ ক্লার্ককে ব্যক্তিগতভাবে যারা চেনেন তারা জানেন, হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়ার মানুষ তিনি নন। সফরসঙ্গী স্ত্রী কাইলির সঙ্গে আলোচনা করেই অবসরের চূড়ান্ত ঘোষণাটা দিয়েছেন।

ওদিকে দেশটির সংবাদ মাধ্যমে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, ব্যতিক্রম কিছু না ঘটলে আসন্ন বাংলাদেশ সফর দিয়েই নতুন অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ-যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট। পাশাপাশি এক ম্যাচ হাতে রেখে ঐতিহ্যের এ্যাশেজ খোয়ানোর কারণ অনুসন্ধান করছেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) নীতি নির্ধারকরা। এ্যাশেজে ভরাডুবির সতীর্থদের ওপর দায় না চাপিয়ে ব্যর্থতা নিজ কাঁধে নিয়ে সরে দাঁড়ানো ক্লার্ক বলেন, ‘আসলে গত বারো মাস ধরে আমার পারফর্মেন্স খুব খারাপ। আমি নিজেই যেটা মানতে পারছি না। সব সময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে খেলতে চেয়েছি। এই পারফর্মেন্স তাই মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে। সবাই বড় টুর্নামেন্ট ধরে নিজেকে প্রস্তুত করে, আমিও করেছি। ওয়ানডে বিশ্বকাপ, টেস্টে এ্যাশেজ সিরিজ, কিন্তু পারিনি। ছেলেরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, কিন্তু দুর্ভাগ্য এক ম্যাচ আগেই সিরিজ খোয়াতে হলো।’ দীর্ঘ এক যুগের ক্যারিয়ারের শেষের ঘোষণা দিতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ক্লার্ক। কয়েকবার হাত দিয়ে চোখ মুছতেও দেখা যায় তাকে।

নির্বাচিত সংবাদ