১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জটিল অবস্থানে তুরস্ক, আমেরিকা ও কুর্দীরা

এক বিদঘুটে ও জটিল মৈত্রীর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে তুরস্ক, আমেরিকা ও কর্দীরা। এই ত্রয়ী শক্তির অভিন্ন শত্রু ইসলামিক স্টেট বা আইএস। আইএসকে মোকাবেলা করতে গিয়ে এই তিন পক্ষের মৈত্রী মধ্যপ্রাচ্যের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঘোলাটে করে তুলছে।

আইএসএর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আমেরিকার নেতৃত্বে যখন কোয়ালিশন গঠিত হয়েছিল, সে সময় তুরস্ক তাতে যোগ দিতে চায়নি। এমনকি ন্যাটো মিত্রদের তুরস্কের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতেও রাজি হয়নি। তুরস্কের আশঙ্কা ছিল যে, এতে আইএসের টার্গেটে পরিণত হতে হবে। কিন্তু ২০ জুলাইয়ের ঘটনায় তুরস্ক অবস্থান পাল্টে ফেলে। ওই দিন তার সীমান্ত শহর সুরুকের একটি কুর্দী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আইএসের আত্মঘাতী হামলায় ৩২ জন তরুণ নিহত হয়। এরপরই তুরস্ক আমেরিকার সঙ্গে একটা সমঝোতা চুক্তি করে।

চুক্তির বিস্তারিত বিষয় এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তুরস্ক আমেরিকার দীর্ঘদিনের দুটি দাবি মেনে নিয়েছে। প্রথমটি হলো মার্কিন যুদ্ধবিমানকে আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে তুরস্কের ইনসিরলিকে অবস্থিত ন্যাটোর বৃহৎ বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়া। দ্বিতীয় দাবিটি হলো তুরস্কের এফ-১৬ বিমানবহরকে ন্যাটোর আইএসবিরোধী অভিযানে অংশ নেয়া। এর বিনিময়ে আমেরিকা আলেপ্পো থেকে ইউফ্রেটিসের তীর পর্যন্ত তুর্কী সিরিয়া সীমান্তের উত্তরাংশে ৬৫ মাইল দীর্ঘ আইএসমুক্ত এলাকা গঠনে সাহায্য করবে।

এতে তুরস্ক মুখ রক্ষার সুযোগ পেলেও সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নো-ফ্লাই জোন গঠনের যে দাবি আঙ্কারা করে আসছিল, তা পূরণ হয়নি। আমেরিকার প্রস্তাবিত অঞ্চলটি গঠনের উদ্দেশ্য কেবল আইএসকে ওই এলাকার বাইরে রাখা। এতে সিরিয়ার বাশার বাহিনীর পোয়াবারো হবে। বিশেষ করে সিরীয় বিমান সেখানে চলাচল করতে পারবে। তথাপি তুর্কীরা আশা করে যে, ওই অঞ্চলটি তুরস্কে চলে আসা ১৮ লাখ সিরীয় উদ্বাস্তুর কিছু অংশকে আশ্রয় যোগাবে।

এমন অঞ্চল গঠনের মূল উদ্দেশ্য আইএসকে ওমান থেকে হটিয়ে দেয়া। সেটা করতে গেলে ওমান থেকে তুরস্কে যাওয়ার পথটা বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। কারণ ওই পথ দিয়েই বিদেশী রিক্রুটরা আইএসে আসে। বিমান হামলায় প্রতিমাসে প্রায় এক হাজার আইএস যোদ্ধা মারা পড়ছেন। কিন্তু তুরস্কের এই পথ দিয়ে অতিদ্রুত বিদেশী রিক্রুটরা এসে সেই শূন্যস্থান পুরণ করে দিচ্ছে। সেই সুযোগটা এখন বন্ধ হবে।

তুরস্ক আইএসমুক্ত এমন একটি অঞ্চল থেকে অন্যান্য সুবিধাও আশা করে। যেমন তুরস্ক এটাকে সিরিয়ার কুর্দীমুক্ত অঞ্চলও করতে চায়। সিরিয়ার কুর্দীদের মোটামুটিভাবে ইরাকের কুর্দীস্তানের মতো করে তুরস্কের লাগোয়া ভূখ- দখলে নিয়ে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। সে পরিকল্পনা নস্যাত করতে চায় তুরস্ক। কারণ এমন একটি সম্ভাবনাকে তুরস্ক আইএস হামলার চেয়েও ঢের বেশি বিপজ্জনক হিসেবে দেখে। সে কারণে তুরস্ক বাশার সরকারকে উৎখাতে সিরিয়ার জিহাদীদের যতটুকু যা সমর্থন দিচ্ছে, তার একটা প্রধান উদ্দেশ্য হলো কুর্দীদর নিয়ন্ত্রণে রাখা। সেজন্যই দেখা যায়, সম্প্রতি তুর্কী বিমান সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমে আইএস টার্গেটগুলোর ওপর যত না হামলা চালিয়েছে, তার চেয়ে ঢের ব্যাপক পরিসরে ও প্রচ- আকারে হামলা চালিয়েছে ইরাকের উত্তরাঞ্চলে কুর্দী ওয়াকার্স পার্টি বা পিকেকে অধিকৃত অবস্থানগুলোর ওপর। তুর্কী বিমান সিরিয়ার ইউফ্রেটিস বা ফোরাত অববাহিকায় আইএসের ওপর বোমা ফেলেনি। কারণ ওখানে আইএস লড়ছে সিরীয় কুর্দী সংগঠন ওয়াইপিজির বিরুদ্ধে। ওয়াইপিজি হলো পিকেকের প্রশাখা সিরিয়ার কুর্দী ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের সশস্ত্র সংগঠন।

অথচ এই ওয়াইপিজি হলো সিরয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমেরিকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র। তুরস্ক যদিও বলছে যে, পিকেকে-কে তারা সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বলে মনে করে ও তাদের বিরুদ্ধে লড়ে, তবে ওয়াইপিজির বিরুদ্ধে কিছু করার পরিকল্পনা তাদের নেই। তথাপি খবর আছে যে, ক’দিন আগে জারাবুলুনের কাছে ওয়াইপিজির অবস্থানে তুর্কী ট্যাঙ্ক থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে, এটা স্পষ্টতই মার্কিন তুর্কী চুক্তির বরখেলাপ।

মতপার্থক্যের অন্যান্য ইস্যুতে আছে সেগুলো নিরসন বেশ কঠিন। তার মধ্যে একটি হলো আইএসকে বিতাড়িত করতে কোণ কোণ বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে কাজ করা হবে, তা নিয়ে তুরস্ক ও আমেরিকার মধ্যে গুরুতর মতভেদ বিদ্যমান। তুরস্ক যে গ্রুপটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, সেটি হলো আহরার-আল-শাম। এটি একটি সুসংগঠিত গ্রুপ। এরা তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা ও কাতারের কাছ থেকে অস্ত্র পেয়ে থাকে। আল কায়েদার সঙ্গেও এদের সংশ্রব আছে।

তৃতীয়ত, তুরস্ক চায় মার্কিন বিমান বাশারের বিমানবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হোক। কিন্তু আমেরিকা এ মুহূর্তে সিরিয়ার বিমান শক্তিকে দুর্বল করতে চায় না।

এসব ইস্যুতে তুর্কী-মার্কিন বিরোধ থাকছে এবং এটা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে আরও ঘোলাটে করে তুলবে বলে পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট