২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গুপ্তচরবৃত্তির নতুন যুগ

  • মুসান্না সাজ্জিল

আজকের এই ইলেকট্রনিক যুগে গুপ্তচরবৃত্তি দিনকে দিন যেমন সহজ হয়ে উঠছে, তেমনি আবার বিতর্কেরও জন্ম দিচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে গুপ্তচরবৃত্তি সহজে ফাঁসও হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কোন কোন ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তির পুরনো কৌশলও প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা অধিকতর কার্যকর। তাই বলে প্রাক-কম্পিউটার যুগের ধারায় ফিরে যাওয়া আর কখনও সম্ভব হবে না।

পাশ্চাত্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একদা পছন্দের হাতিয়ার ছিল সাইবার কাফে। এর মাধ্যমে কোন আন্তর্জাতিক শীর্ষ বৈঠকের হোক কিংবা ইসলামী চরমপন্থী সংগঠনের হোকÑ গোপন তথ্য সহজেই হাতিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু এখন আর নয়। বর্তমানে মস্কোয় বসবাসরত আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসের প্রাক্তন কন্ট্রাক্টর এডওয়ার্ড স্নোডেন ফাঁস করে দিয়েছেন যে, ২০০৯ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত জি২০ শীর্ষ বৈঠকের ওপর গোয়েন্দাবৃত্তি চালানোর জন্য সাইবার কাফে ব্যবহার করা হয়েছিল। তারপর থেকে সবাই সতর্ক হয়ে গেছে। অনেক দেশে সাইবার কাফে বন্ধও করে দেয়া হয়েছে। ফলে কয়েক ধরনের গোয়েন্দাবৃত্তি পরিচালনা কঠিনতর হয়ে পড়েছে বলে গুপ্তচররা বলে থাকেন।

এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আধুনিক গুপ্তচর বৃত্তির অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক ফুটে ওঠে। ইলেকট্রনিক তথ্য সংগ্রহ মোটামুটিভাবে সহজতর হয়ে উঠছে। ডিজিটাল জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে বাস করা কঠিন। কম্পিউটার ও নেটওয়ার্কের ব্যবহার আছেÑ এমন যে কোন কাজই অন্যের পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করে দেয়। সাধারণ প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন যে কারোর পক্ষে ই-মেইল পাঠ করা সহজ। মোবাইল ফোন আজ কারোর অবস্থান ট্র্যাক করা বা আড়িপাতার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। কম্পিউটার হ্যাক করে বিপুল পরিমাণ তথ্য বাগিয়ে নেয়া কোন ব্যাপারই নয়।

তারপরও বেশকিছু গুপ্তচর বৃত্তির কাজ জটিলতর আকার ধারণ করেছে। কারণ গোপনীয়তা বজায় রাখা ও ভুয়া পরিচয় সৃষ্টি করা হলে গুপ্তচরদের পক্ষে অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যে এ জাতীয় কিছু অস্বাচ্ছন্দ্যকর ব্যাপার বেরিয়ে এসেছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র নাকি জার্মান চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেলের মোবাইল ফোনে আড়ি পেতেছিল। একজন সিআইএর স্টেশন চীফকে বার্লিন থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল।

ইলেকট্রনিক গুপ্তচরবৃত্তির কাজটা বিপুল পরিমাণ তথ্য ছেঁকে তোলা ও স্থানান্তরিত করার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সেসব তথ্যের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ব্যাপারও থাকে, যেগুলোর সঙ্গে অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ বা রাষ্ট্র পরিচালনার কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই ব্যাপারগুলো ফাঁস হয়ে পড়ায় এবং গুপ্তচর বৃত্তির নতুন আইন হওয়ায় অনেক দেশ যেমন আমেরিকা এখন নিজ দেশের নাগরিকদের মধ্যে ইলেকট্রনিক যোগাযোগ সরাসরি ইন্টারসেপ্ট করে মজুদ রাখে না। কোন ক্ষেত্রে দরকার হলে ইন্টারনেট অথবা কোন কোম্পানির অনুমতি নিয়ে সে কাজটা করা হয়ে থাকে।

তবে ইলেকট্রনিক গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে যেমন মানুষের অজান্তে তাদের ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার প্রবেশের দ্বারা সব গোপন তথ্য হাতিয়ে নেয়া হয়, তেমনি আবার সেই গুপ্তচরবৃত্তি এড়ানোর কিছু কিছু উপায়ও আছে। যেমন- ইলেকট্রনিক সাঙ্কেতিক বার্তা। এগুলো পাঠোদ্ধার করা কিংবা এগুলোর সূত্র খুঁজে পাওয়া যথেষ্ট কঠিন। গুপ্তচরদের জন্য আরও বেশি উদ্বেগের ব্যাপার হলো এই যে, অন্যের গোপন তথ্য চুরি করা যেমন সহজ, তেমনি আবার সেগুলো ধরে রাখাও তদ্রƒপ কঠিন। প্রাক-কম্পিউটার যুগে গুপ্তচর সংস্থাগুলো ফাইলপত্র রক্ষা করত কাগজে লিখিত আকারে। এগুলো দেখাদেখি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো। কপি করা তো আরও কঠিন। কেউ ফাইল দেখলে কে কখন কিভাবে দেখেছে জানতে পারা ঝামেলার হলেও সম্ভব ছিল। গুপ্তচর সংস্থার দলিল দস্তাবেজের রেজিস্ট্রি লুট করা আর যাই হোক অসম্ভব ছিল।

কিন্তু সে অবস্থা এখন বদলেছে। কম্পিউটারের অন্তর্নিহিত ব্যবস্থাটাই এমন যে কার্ডবোর্ডে রিবন দিয়ে বেঁধে তালাচাবিতে আটকানো ফাইলপত্রের তুলনায় সেখানকার তথ্যাবলী সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে। ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত যে কোন নেটওয়ার্কে চুপিসারে ঢুকে পড়ার সুযোগ থাকে। মোবাইল ফোন দিয়ে যেমন টার্গেট করা কম্পিউটারে গুপ্তচর বৃত্তির ব্যবস্থা করা যায়, তেমনি আবার উল্টোটিও করা অর্থাৎ কম্পিউটার দিয়েও মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে সে কাজ করা সম্ভব। কফলিংকের সমান সাইজের একটা কম্পিউটার চিপে বিপুল পরিমাণ তথ্য বহন করা যায়। কিন্তু সেগুলো অন্যদের হস্তগত হতে পারে আশঙ্কায় কোন কোন মহলে অতি গোপনীয় দলিলপত্রের জন্য ম্যানুয়াল টাইপরাইটার ও কার্বন পেপারের ধারা আবার ফিরে এসেছে। তবে প্রাক-কম্পিউটার যুগের মানব গোয়েন্দা সার্ভিস এই ডিজিটাল যুগে পুনরায় গড়ে তোলা যথেষ্ট কঠিন। ডিজিটাল যুগের আগে একজন গোয়েন্দা কিংবা গুপ্তচরের নতুন পরিচয় তৈরি করা সহজ ছিল। ভুয়া নাম ধারণ করে পাসপোর্ট, ট্রাভেলার চেক ও ভিজিটিং কার্ড রাখাই যথেষ্ট ছিল। এখন বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া পরিচয় সৃষ্টি করা দস্তুরমতো কঠিন। কয়েক বছর ধরে ব্যবহৃত ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ফোন ও ইউটিলিটি বিল না থাকলে আপনা থেকেই তাদের গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহের তালিকায় ফেলা যায়।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট