২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জালমুদ্রা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ভারত বৈঠক আজ

গাফফার খান চৌধুরী ॥ জালমুদ্রা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বৈঠক শুরু হচ্ছে। আজ সকাল ৯টা থেকে পুলিশের সদর দফতরে দুই দিনব্যাপী ওই বৈঠক শুরু হতে যাচ্ছে। বৈঠকে যোগ দিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উচ্চ পর্যায়ের ভারতীয় প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় পৌঁছে। বৈঠকে জালমুদ্রা নিয়ন্ত্রণের কৌশল ঠিক করা হচ্ছে। এরপরই বাংলাদেশ ও ভারতে নিজ নিজ দেশের তরফ থেকে অপারেশন শুরু করবে। আর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বেশ কয়েকটি চিহ্নিত পয়েন্টে যৌথভাবে চালু করা হবে কম্বিং অপারেশন। আগামী ১৪ আগস্ট ভারতীয় প্রতিনিধি দলটির বৈঠক শেষে দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

চলতি বছরের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসেন। সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে ১৪ নম্বর চুক্তিটি হয় মাদক, চোরাচালান ও জালমুদ্রা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে। মাদক পাচার অনেকাংশে কমে গেছে। জালমুদ্রার কারণে আতঙ্কিত দুই দেশই। জালমুদ্রা নিয়ন্ত্রণে দুই দেশই জিরো ট্রলারেন্স নীতি ঘোষণা করে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, জালমুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলায় দুই দেশেই জালমুদ্রা নিয়ন্ত্রণে করণীয় নির্ধারণ করতে বৈঠকে বসছে। বৈঠকে ৯ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে দিচ্ছেন সে দেশটির জাতীয় তদন্ত সংস্থার (এনআইএ) পুলিশ মহাপরিদর্শক এসকে সিং। এছাড়া বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাসের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ৭ জন ঢাকায় পৌঁছেন। আজ দুই জন ভারত থেকে ঢাকায় পৌঁছার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (অপরাধ) হেলাল উদ্দিন বদরীর বাংলাদেশে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়াও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (ডিজিএফআই), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিজিবিসহ পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকছেন।

বৈঠকে জালমুদ্রা নিয়ন্ত্রণের কৌশল ঠিক করা হবে। এছাড়া জালমুদ্রা তৈরি, পাচার, পাচারকারী চক্র, দেশী ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটসহ সার্বিক বিষয় নিয়েও আলাপ আলোচনা হবে। আলোচনায় সার্বিক বিষয়ে কৌশল নির্ধারণ করা হবে। এরপরই বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই যার যার দেশে অপারেশন শুরু করবে।

কৌশল ঠিক করার পরেই বাংলাদেশ-ভারতের স্থল সীমান্তের জালমুদ্রা পাচারের পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত জায়গাগুলোতে যৌথভাবে কম্বিং অপারেশন শুরু হবে। পয়েন্টগুলোতে যৌথ অভিযান, স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন এবং সীল করে দেয়ার বিষয়াদি সর্ম্পকিত আলোচনা হবে।

ইতোমধ্যেই দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তে জালমুদ্রা তৈরি, পাচার, লেনদেন ও চোরাচালানের পণ্য কেনা-বেচার সঙ্গে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবি ও ভারতীয় মুজাহিদিনদের জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জেএমবির অর্থের অন্যতম উৎস জালমুদ্রা বলে ভারতীয় জাতীয় তদন্ত সংস্থার (এনআইএ) তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে। জেএমবি ও পাকিস্তানের তৈরি জাল রূপী এতটাই নিখুঁত যে, ল্যাবরেটরিতেও সহজেই যা ধরা পড়ে না। পাকিস্তানে তৈরি অধিকাংশ জাল রূপীই বাংলাদেশের স্থল সীমান্ত পথকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে ভারতে প্রবেশ করাচ্ছে জাল রূপীর কারবারীরা। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ছাড়াও অনেক জালরুপী ভারত-পাকিস্তান স্থল সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তান ও ভারতীয় মুজাহিদীনদের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করে। এর সঙ্গে দুই দেশের জঙ্গী সংগঠনগুলো জড়িত। পাকিস্তানের জালমুদ্রার কারবারীরা ভারতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পরিকল্পিতভাবে জালরূপী তৈরি করে তা সীমান্ত পথে ভারতে প্রবেশ করায়। যে সব সীমান্ত দিয়ে জালরূপী ভারতে প্রবেশ করানো হয়, তার মধ্যে ভারতের উত্তর প্রদেশের মুরাদাবাদ ও মালদার ছাছানি অন্যতম।

আর বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, শেরপুর জেলাসহ ৫টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে জালমুদ্রা ভারতে প্রবেশ করানো হয় বলে দেশী-বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। বৈঠকে এ সব পয়েন্টে যৌথভাবে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীসহ (বিজিবি) সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীসহ (বিএসএফ) সেদেশটির সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে চব্বিশ ঘণ্টাই যৌথ টহল ও স্থায়ী চেকপোস্ট বসানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা হয়েছে। প্রয়োজনে এ সব পয়েন্টে আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর স্থাপন করার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

প্রসঙ্গত, গত ৩ আগস্ট থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত ভারতের নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি ও ভারতের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দেশে ফিরে গত ৯ আগস্ট বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান, জালমুদ্রা পাচার, অস্ত্রগোলাবারুদ পাচারসহ নানা বিষয়াদি নিয়ে বিএসএফের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সংঘবদ্ধ অপরাধ (অর্গানাইজড ক্রাইম) নিয়ন্ত্রণ বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকী জনকণ্ঠকে বলেন, জালমুদ্রা নিয়ন্ত্রণে বুধবার থেকে পুলিশ সদর দফতরে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের বৈঠক শুরু হচ্ছে। জালমুদ্রা দুই দেশের অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এজন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরে জালমুদ্রার বিষয়ে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় বৈঠক হচ্ছে। বৈঠকে জালমুদ্রা নিয়ন্ত্রণের কৌশল ঠিক হবে। এরপর শুরু হবে জালমুদ্রা উদ্ধার ও এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে যার যার দেশে এবং সীমান্তে যৌথ কম্বিং অপারেশন।