২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শাহজালালে দুই কাস্টমস কর্মকর্তাকে মারধর করে কার্গো থেকে পণ্য লুট

  • যুবলীগ নেতা শ্যামলের নেতৃত্বে সশস্ত্র ক্যাডারদের

স্টাফ রিপোর্টার ॥ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দুই কাস্টমস কর্মকর্তার ওপর হামলা চালিয়ে কার্গো থেকে জোরপূর্বক মাল ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার কাস্টমস বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয়েছে যুবলীগ নেতা বদরুল আলম শ্যামল, প্রিন্স, জসিম এয়াসিন ও মঞ্জু। সোমবার দুপুরে হামলা ও লাঞ্ছনার শিকার হন দুই কাস্টমস কর্মকর্তা- সহকারী কমিশনার শহিদুজ্জামান সরকার, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেন।

এদিকে দিন-দুপুরে আকস্মিক এ হামলার প্রতিবাদে ঢাকা কাস্টমস অফিসার এক্সিকিউটিভ এ্যাসোসিয়েশন ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছে। কাস্টমস এ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রবিউল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জনকণ্ঠকে বলেন, এ বিষয়ে মঙ্গলবার বিকেলে জরুরী বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠক থেকে পাচারকারী ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবিতে ধর্মঘট আহ্বান করা হবে।

এ বিষয়ে রাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, যারা এ ধরনের বেআইনী কর্মকা- করেছে, কর্তব্যরত কাস্টমস কর্তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এটা আইনগত সমাধান করা হবে। তবে এ জন্য ধর্মঘটে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। প্রচলিত আইনেই সব সমস্যার সমাধান করা হবে। দুষ্কৃতকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক, আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে আমদানি শাখার কুরিয়ার শুল্কায়ন গেটের সমস্ত ডেলিভারি মঙ্গলবার বন্ধ থাকে। গেটটি খুলে দেয়ার জন্য ঢাকা কাস্টমস এজেন্টের নেতৃবৃন্দ ঢাকা কাস্টম কমিশনারের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক চলে।

ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার মোঃ লৎফুর রহমান জানান, মূলত সরকারকে লাঞ্ছনার বিষয়টি জানানোর জন্যই কাস্টমস অফিসার সংগঠন ধর্মঘটে যেতে পারে। তবে হামলাকারীরা যত প্রভাবশালীই হোক তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এভাবে চলতে পারে না। দেখি আইনশৃঙ্খলার বাহিনী কী ভূমিকা পালন করে।

উল্লেখ্য, সোমবার দুপুরে বদরুল আলম শ্যামল নামের এক যুবলীগ নেতার নেতৃত্বে ৫০ জনের মতো সশস্ত্র ক্যাডার বিমানবন্দরের দুই কাস্টমস কর্মকর্তাকে বেদম মারধর করে বিমানের কুরিয়ার গোডাউন থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার পণ্য চালান লুটে নিয়েছে। ঘটনাটি ঘটে র‌্যাব সদর দফতর ও বিমানবন্দর থানার ১০০ গজের মধ্যে।

মামলার এজাহারের উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশ জানায়, সোমবার দুপুরে যুবলীগ নেতা বদরুল আলম শ্যামল প্রায় ৫০ জন ক্যাডার নিয়ে বীরদর্পে শাহজালাল বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইড আমদানি শাখার কুরিয়ার শুল্কায়ন গোডাউনে প্রবেশ করেন। তার নেতৃত্বে ‘স্ট্রংরুম’ থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার পণ্য ১০-১৫টি টলিতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ সময় কাস্টমসের সহকারী কমিশনার সহিদুজ্জামান সরকার ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেন তাদের বাধা দেন। সঙ্গে সঙ্গে পণ্য পাচারকারীরা লাঠিসোটা নিয়ে ওই দুই কাস্টমস কর্মকর্তার ওপর হামলে পড়েন। তাদের বেদম মারধর করে ট্রলিভর্তি মালামাল নিয়ে চলে যান তারা। পরে আহত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেন একটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। ঘটনার পর পুুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও পাচারকারীদের কাউকে আটক করতে পারেনি। এ ঘটনায় বিমানবন্দরে কর্মরত কাস্টমস কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। একদিন পর মঙ্গলবার এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় আসামি করা হয় শ্যামল, প্রিন্স, জসিম এয়াসিন ও মঞ্জুকে।

আহত মোজাম্মেল হোসেন বলেন, যা ঘটেছে তা আমাদের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ জেনেছে। তারা এখন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান জানান, কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম করে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুই কাস্টমস কর্মকর্তাকে মারধর করে পণ্য লুটে নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, এর আগেও একাধিকবার শ্যামল কাস্টমস কর্মকর্তাদের মারধর করে অনুরূপভাবে কোটি কোটি টাকার পণ্য জবরদস্তি কুরিয়ার গোডাউন থেকে বের করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু যুবলীগ নেতা বলে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সোমবারও অনুরূপ ঘটনা ঘটান তিনি। এ ঘটনার পর কুরিয়ার গোডাউনে পণ্য আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৪ সালের ৯ আগস্টও বদরুল আলম শ্যামলকে কার্গো ভবনে মারামারি ও সন্ত্রাসের অভিযোগে বিমানবন্দর থানার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তারপর আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে এসে তৎকালীন ওসি শাহ আলমকেই থানা থেকে বদলি করাতে নেপথ্য ভূমিকা পালন করেন।

পুলিশ জানায়, এর আগেও গত ২৮ জুলাই ঢাকা কাস্টম হাউসে ঢুকে সহকারী কমিশনার কামরুল হাসানের হাত কেটে ফেলার হুমকি দেন বদরুল আলম শ্যামল। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য খালাস করাতে না পেরে যুবলীগ নেতা শ্যামল ও তার ভাই প্রিন্স ১০-১২ ক্যাডার নিয়ে কামরুল হাসানের কক্ষে ঢুকে তাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলাসহ হাত কেটে ফেলার হুমকি দেন। একপর্যায়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষী ও পুলিশ এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর আতঙ্কে ও ক্ষোভে বিমানবন্দরের আমদানি শাখার পণ্য ডেলিভারিসহ সব কার্যক্রম এক ঘণ্টারও বেশি সময় বন্ধ ছিল। এর আগেও একবার কাস্টমস কর্মকর্তা শহিদুজ্জামান সরকারকে লাঞ্ছিত করে একই পাচারকারী চক্র। চোরাচালান আটকাতে গিয়ে শুল্ক পরিদর্শক (এটিও) জয়দেব চন্দ্র মজুমদার লাঞ্ছিত হন।

এ ছাড়া গত বছর ১৭ আগস্ট শ্যামলের সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে দুটি বিলাসবহুল চোরাই প্রাইভেটকার আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। কিন্তু সেখানেও ডিবির উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান শ্যামল। তখন ডিবি পুলিশের এসআই আবদুল আজিজ সাংবাদিকদের বলেন, শ্যামল বলেছেন তিনি দীপু নামে আরেকজনের কাছ থেকে গাড়িটি কিনেছেন। কিন্তু গাড়ির কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

জানতে চাইলে বিমানবন্দর থানার ওসি কামাল উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, কত দুর্ধর্ষ স্মাগলার শ্যামল তা ভাবতেও অবাক লাগে। দিন-দুপুরে কাস্টম কার্গোতে হামলা চালিয়ে কর্তাদের মারধর করে মাল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ১৫ কার্টন মালের মধ্যে ১৩ কার্টনই ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ওই কার্টনে অত্যন্ত মূল্যবান মালামাল ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওসবের মধ্যে সোনাও থাকতে পারে। পুলিশ তৎপর রয়েছে। শ্যামল গা-ঢাকা দিয়েছে।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া