২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইত্তেহাদুল মুজাহিদীনের তালিকায় নিলয় ছিলেন এক নম্বরে

  • মূল হত্যাকারীদের আড়াল করার কৌশল!

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সদ্য খুন হওয়া ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়সহ শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী, বিশ্ব-বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও ব্লগারসহ ২০ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে ইত্তেহাদুল মুজাহিদীন নামে একটি সংগঠনের তরফ থেকে। এ তালিকায় এক নম্বরে

ছিল ব্লগার নিলয়। এখন তার নামটি কালো কালি দিয়ে কেটে দেয়া হয়েছে তালিকা থেকে।

সদ্য হুমকির ঘটনায় নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে ব্লগার নিলয়কে হত্যার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয়া আনসার আল ইসলামের বিষয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, হত্যাকা-ের ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে এক বা একাধিক বিশেষ গ্রুপ। আর হত্যার দায় স্বীকার করা হচ্ছে অন্য নামে। তবে হত্যাকারী এবং হত্যার দায় স্বীকারকারীদের মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে। মূল হত্যাকারীদের আড়াল করতেই, ভিন্ন নামে হত্যার দায় স্বীকার করা হতে পারে। এটি হত্যাকারীদের কৌশল হতে পারে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তালিকাটি গণমাধ্যমেও পাঠিয়েছে ইত্তেহাদুল মুজাহিদীনের তরফ থেকে। ২০ জনের নামের তালিকাটি একটি খাকি খামে পাঠানো হয়েছে। খামে সিলেট পোস্ট অফিসের সিল রয়েছে। তাতে তারিখ হিসেবে গত ১০ আগস্ট উল্লেখ রয়েছে। কালো কালি দিয়ে নীলাদ্রির নামটি কেটে দিয়ে, নীলাদ্রিকে হত্যা কাজ শেষ হয়েছে বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

নীলাদ্রির পর তালিকায় রয়েছে ব্লগার আরিফ জেবতিক, সুশান্ত দাশ গুপ্ত, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, আব্দুর রহমান, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মকবুল হোসেন, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ব্লগার আরিফুর রহমান, অমি রহমান পিয়াল, উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে দীর্ঘসময় চিকিৎসাধীন থাকার পর জার্মানিতে মৃত্যুবরণ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদের ছেলে অনন্য আজাদ, গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক মাহমুদুল হক মুন্সি, মারুফ রসূল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আরাফাত রহমান, ব্লগার নির্ঝর মজুমদার, ড. আতিক, আশফাক আনুপ ও নূর নবী দুলাল।

নামীয় তালিকার আগে এদের ইসলাম ও মাদ্রাসা শিক্ষার দুশমন, নাস্তিক, সিলেটবিদ্বেষী, সিলেটের কলঙ্ক, স্যাটানিক ব্লগার, হিন্দুস্তানী দালাল ও মুসলিম নামসর্বস্ব মুনাফিক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এরপর লেখা হয়েছে, মরণ একদিন হবেই বন্ধু, আজ নয়তো কাল/খোদার লাগি খোদার দুশমনের লইবো তাহার প্রাণ.../, নবীর অপমানে কাঁদে না তোমার মন!/ কি তোমার পেহচান? মরণ একদিন হবেই বন্ধু.../লও জালিমের জান...’

বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম।

প্রসঙ্গত, চলতি বছর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এর মধ্যে গত ২০ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ ১০ জন, গত ৪ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ৭ জন, গত ১৬ জুন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ ২৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এছাড়া হুমায়ুন আজাদের ছেলে অনন্য আজাদ ও ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। এসব হুমকির ঘটনায় বিভিন্ন থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

গত ৭ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর খিলখাঁও থানাধীন পূর্ব গোড়ানের ৮ নম্বর সড়কের ১৬৭ নম্বর পাঁচতলা বাড়ির পঞ্চম তলার নিজ বাসায় হত্যা করা হয় ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়কে। চার হত্যাকারী বাড়ি ভাড়ার জন্য বাসা দেখার কথা বলে বাসায় ঢুকে নিলয়কে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। হত্যাকা-ের তদন্ত করতে এফবিআই ডিবি পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করে। যদিও বুধবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হত্যাকা-ের জড়িত কেউ গ্রেফতার হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত আলামতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে।

২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদ-ের প্রতিবাদে এবং যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে ব্লগার ও অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টদের সমন্বয়ে গণজাগরণ মঞ্চের সৃষ্টি হয়। মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও ব্লগার ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনকে (৩৭) ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীর পলাশনগরের নিজ বাড়ির সামনে রাত সাড়ে আটটার দিকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। রাজীব হত্যার ঘটনায় বনানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ ছাত্র গ্রেফতার হয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। হত্যাকারীরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য বলে নিশ্চিত হয় তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশ।

এরপর ওই বছরের ৯ এপ্রিল দিনদুপুরে বুয়েটের ছাত্রলীগ নেতা ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ব্লগার আরিফ রায়হান দীপকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে বুয়েট ছাত্র মেজবাহ উদ্দিন। পরে মেজবাহ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। মেজবাহ উদ্দিন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য।

বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক লেখক অভিজিত রায়কে (৪০) দুই হত্যাকারী কুপিয়ে খুন করে। হত্যাকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা (৩০)। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) একটি দল ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশে এসে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে সহায়তা করে। অভিজিত হত্যার পর ফেসবুকে হত্যার দায় স্বীকার করে আনসার বাংলা-৭ নামে স্ট্যাটাস দেয়।

গত ৩০ মার্চ রাজধানীর রমনা মডেল থানাধীন হাতিরঝিল বেগুনবাড়িতে দিনের বেলায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর পালানোর সময় জনতা দুই মাদ্রাসার ছাত্র আরিফুল ইসলাম ও জিরুল্লাহকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। পরে সাইফুল ইসলাম নামে আরেকজন গ্রেফতার হয়। তারাও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য।

গত ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজার এলাকায় চার মুখোশধারী ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। হত্যার দায় স্বীকার করে আনসার বাংলা-৮ নামের একটি সংগঠন।

গত বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিউল ইসলাম লিলন হত্যাকা-ের পর আনসার আল ইসলামের নামে একটি টুইটার এ্যাকাউন্ট থেকে দায় স্বীকার করে বিবৃতি আসে। এর আগে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে টিএসসিতে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে লেখক হুমায়ুন আজাদকে আহত করা হয়। পরবর্তীতে তিনি বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে রাজধানীর ওয়ারী থানাধীন রামকৃষ্ণ (আর কে) মিশন রোডের বাড়িতে জবাই করে ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি ও বিশ্বত্রাণ কর্তা দাবিদার লুৎফোর রহমান ফারুক (৫৫) ও তার ছেলে সানোয়ারুল ইসলাম মনিরসহ (৩০) ৬ জনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাড়িতে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের শান্তির পথে ও ‘কাফেলা’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই করে হত্যা করা হয়। এ দুইটি হত্যাকা-ের ঘটনায় আজও কেউ গ্রেফতার হয়নি। হত্যাকা-ের দায়ও স্বীকার করেনি কোন গোষ্ঠী।

নির্বাচিত সংবাদ