২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাসের আলোয় প্রিয় পিতার মুখ, বিমূর্ত ভাবনা

ইতিহাসের আলোয় প্রিয় পিতার মুখ, বিমূর্ত ভাবনা
  • রং-তুলিতে শোকগাথা

মোরসালিন মিজান

বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক থাকা যায় না। সব হারানোর ব্যথা বিষণ্নতা যেন গিলে খেতে চায়। বুকের ভেতরে কোথাও হাহাকার করে ওঠে। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের এ বাড়ি স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন। বাঙালীর ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা।’ অথচ আন্দোলন সংগ্রামের উর্বর এই ভূমিতে কী নির্মম নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছিল একদল ভাড়াটে খুনী কাপুরুষ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এখানে সপরিবারে হত্যা করা হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালীকে। সেই ভয়াল ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি। একই বাড়ি বাঙালীর গৌরব আর শৌর্য বীর্যের প্রতীক। এমন তীর্থভূমিতে বসে বঙ্গবন্ধুকে রং তুলিতে আঁকার সুযোগ ক’জনের হয়? বুধবার দুর্লভ সে সুযোগ পেয়েছিলেন শিল্পীরা। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি দিয়ে ঘেরা বাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তাঁদের ইতিহাস চেতনাকে আরও শানিত করেছে। আবেগকে করেছে গাঢ়। তার পর ছবি আঁকা। সঙ্গত কারণেই আর সব আর্ট ক্যাম্প থেকে একটু ভিন্ন ছিল আয়োজনটি। ‘রং তুলিতে শোকগাথা’ শীর্ষক আর্ট ক্যাম্পে যোগ দেন দেশবরেণ্য শিল্পীরা। নবীনরাও কল্পনার রঙে পিতাকে আঁকেন। বিচিত্র ভাব ও বোধ দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত চিত্রকর্ম শোকের হয়ে থাকেনি শুধু। বরং দ্রোহ প্রেম আর স্বপ্নের কথা বলেছে।

সকালে শুরু হয়েছিল ছবি আঁকা। বাড়ির আঙ্গিনায় পা ফেলতেই চোখ জুড়ানো সবুজ। বৃক্ষ শোভিত চত্বর। মাঝখানে বঙ্গবন্ধু ভবন। ভবনের মোটামুটি চারপাশেই ক্যানভাস পেতে বসেছিলেন শিল্পীরা। এমনকি ভবনের নিচতলার মেঝেতে সুযোগ হয়েছিল বসার। ছবি আঁকার। আর মূল ভেন্যু করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ভবনের নিচতলাটিকে। এখানে কিছু টেবিল পেতে রাখা ছিল। পাশে পছন্দের রং। সেখানে তুলি ভিজিয়ে নিয়ে চলছিল ছবি আঁকা। সব ক্যানভাস প্রায় একই মাপের। কেউ পেন্সিলে আউটলাইন টানছিলেন। কেউ তুলির টানে স্পষ্ট করছিলেন প্রিয় পিতার মুখ। ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়।’ সে হৃদয়, আহা, কী ক্ষত বিক্ষত করে দিয়েছিল বেইমান ভাড়াটে খুনীরা! আঁকতে গিয়ে লাল তরলে ভেসে যায় ক্যানভাস। বঙ্গবন্ধুর রক্ত বাংলাদেশ হয়ে ফোটে। একটু একটু করে কথা বলছিল কালো রাত্রি। এ রাত এত কালো যে, আঁকতে গিয়ে শিল্পীর তুলি বার বার কালি শূন্য হয়। শুকিয়ে যায়। তেল রং জল রঙে আঁকা ছবি যত কথা বলে ততই যেন বাকি থেকে যায়। কিছু ছবি ফিগারেটিভ। নানা ভঙ্গিমায় ধরা দেন মুজিবুর। বার বার দেখা ছবি থেকে ছবি করেছেন শিল্পীরা। নতুন উপস্থাপনা দিয়েছেন। বিমূর্ত ভাবনা থেকেও মহান নেতাকে আঁকা হয়েছে। এই ধরনের অব্যক্ত শিল্পভাষা সৃষ্টিতে বেশ সুনাম স্পেন প্রবাসী শিল্পী মনিরুল ইসলামের। অল্প সময়ের মধ্যেই আঁকা শেষ করেন তিনি। বলেন, বঙ্গবন্ধুকে তো সারা জীবন ধরে আঁকছি। এঁকে চলেছি। যতদিন যাচ্ছে নেতা তত বিশাল হচ্ছেন। এই বিশালত্বকে পোট্রেইটে তুলে আনা মুশকিল। তাই বিমূর্ত আঁকি। বিমূর্ত থেকেছেন শিল্পী খালিদ মাহমুদ মিঠুও। তাঁর ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা। স্বপ্নকে আঁকতে শেখ মুজিবের চশমাটিকে আশ্রয় করেছেন শিল্পী। শোকের কালো থেকে বেরিয়ে এসে আঁকা লাল চশমায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নলোক। তাঁর দেখা স্বপ্নরা ছড়িয়ে পড়েছে ৫৬ হাজার বর্গমাইলে। আঁকার ফাঁকে মিঠু বলেন, আমি নিজের স্বপ্নটা দেখি। তবে আঁকছি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের নাম বাংলাদেশ। আর্ট ক্যাম্পে যোগ দিয়েছিলেন বিপাশা হায়াত। হ্যাঁ, অভিনয় শিল্পী হিসেবে সুপরিচিত। চিত্র শিল্পী হিসেবে ততটাই ম্লান। আর্ট ক্যাম্পে যোগ দিলেও অভিনয় শিল্পী পরিচয়টি থেকে বের হতে পারছিলেন না বলে মনে হয়েছে। তাঁকে ক্যানভাসে পরিপূর্ণ বিকশিত হতে দিচ্ছে না টেলিভিশন কেন্দ্রিক খ্যাতি। তবে বিমূর্ত ভাবনা থেকে বঙ্গবন্ধুকে আঁকার চেষ্টা তিনিও করেছেন তিনি। বাকি শিল্পীরাও নিজেদের মতো করে এঁকেছেন। ছবি শেষ হলে তাতে স্বাক্ষর করে দেয়ালের পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। দূর থেকে দেখেছেন। হলো তো সে কথা যা বলতে চেয়েছিলাম! যেন নিজের কাছে নিজেই জানতে চেয়েছেন।

আয়োজনের শেষভাগটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ বেলায় ক্যাম্পে যোগ দেন দেশের প্রখ্যাত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ও শাহাবুদ্দীন। মুস্তাফা মনোয়ার কয়েক মিনিট একটি ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ান। পেন্সিল হাতে নেন। আউট লাইন টানেন। আর রং তুলি ব্রাশ হাতে নিতেই দৃশ্যমান হন সৌম্য শান্ত এক বঙ্গবন্ধু। আঁকা শেষ হলে শিল্পী বলেন, শেখ মুজিব বুকের গভীরে বাস করেন। তাঁকে বুঝে, অনেক বেশি এটেনশান দিয়ে আঁকতে হয়। একটু সময় নিয়ে আঁকতে পারলে ভাল। বঙ্গবন্ধুকে আঁকার বেলায় দু’ একটি রঙের পক্ষপাত সম্পর্কে তিনি বলেন, খুব চেনা রঙের মধ্যে আটকে থাকা মানে শিল্পীর সীমাবদ্ধতা। সৃজনশীল হলে এর থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভব বলে মত দেন তিনি। পরে বঙ্গবন্ধুকে আঁকেন বিখ্যাত শিল্পী শাহাবুদ্দীন। খুব চেনা ভঙ্গি। তুলির টান। ব্রাশ। ওমনি যে বঙ্গবন্ধু মূর্ত হন তাকে দেখে আরও একবার বোঝা হয়, মুজিবকে কতটা রপ্ত করেছেন শিল্পী।

সব মিলিয়ে অনন্য সুন্দর একটি আয়োজন। প্রথম বারের মতো এমন আয়োজন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৫ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দলের পক্ষ থেকে ৪০ দিনের কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়েছিল আর্টক্যাম্পের। এখান থেকে পাওয়া ছবি নিয়ে পরবর্তিতে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে বলে জানান ক্যাম্পের সমন্বয়ক আফজাল হোসেন।