২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রূপান্তরে ছাত্র রাজনীতি

প্রবাদ রয়েছে, ‘ছাত্র নং অধ্যয়নং তপঃ।’ পড়াশোনাই ছাত্রের একমাত্র তপস্যা হওয়ার কথা সেকালে বলা হতো। কিন্তু ছাত্ররা শুধু বিদ্যার্জন করবে সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে তা নয়। দেশ, জাতির প্রয়োজনে নিজেকে তৈরি করার জন্য অন্যান্য বিষয়েও তার চর্চা অতীব জরুরী একালে। ছাত্ররাই যেহেতু দেশের ভবিষ্যত, তাই তারাই সঠিকভাবে নিজেদের তৈরি করে দেশ ও জাতিকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে এমনটাই হয়ে আসছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছাত্র রাজনীতি জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে প্রায়শই একীভূত হয়ে যায়। তাই দেখা যায় ক্যাম্পাসে বন্দুক যুদ্ধ, লাশ পড়ে আছে কিংবা অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষাঙ্গন বন্ধ। একাডেমিক ক্যালেন্ডারের দিন নষ্ট হয়ে শিক্ষাজীবন পিছিয়ে যায়। নষ্ট ভ্রষ্ট রাজনীতির এই কদাকার রূপের পেছনে অবশ্য এদেশে পাকিস্তান পর্ব ও বাংলাদেশ পর্বে সামরিক জান্তাদের অবদানই বেশি। ছাত্রসমাজকে কলুষিত করার লক্ষ্যে ছাত্র নেতৃত্বকে নষ্ট পথে পরিচালনায় তারা ছিল তৎপর। কিন্তু সে সব নষ্টামির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের একটি অংশ লড়াই-সংগ্রাম করে দেশনেতায় পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ নেতৃত্ব তৈরির পেছনে ছাত্র রাজনীতির বিশাল ভূমিকা রয়েছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুও ছাত্র রাজনীতির ফসল। কিন্তু বর্তমানে এদেশে ছাত্র রাজনীতির খুবই করুণ দশা। ছাত্র রাজনীতি অনেকের প্রাণনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ছাত্রনেতারা লড়াই করবে শিক্ষার অগ্রগতির জন্য, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে কথা বলবে; কিন্তু তা না করে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে শিক্ষাঙ্গন ও দেশের ক্ষতি ডেকে আনছে। একজন ছাত্র যেখানে নিজের ভাল লাগা ও আদর্শবোধ থেকে রাজনীতি করবে, সেখানে তারা অর্থ ও প্রতিপত্তির মোহে নষ্ট স্রোতে গা ভাসাচ্ছে। তাদের হাতে শোভা পায় অস্ত্র। তারা টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভর্তি বাণিজ্যের মতো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। ছাত্র রাজনীতির এ ধারা কোন আদর্শিক নেতৃত্ব উপহার দিতে পারে না। গত চার দশকে ছাত্র রাজনীতির চরিত্র ও গুণগতমান ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর। সামরিক শাসনামল ছাত্র রাজনীতিকে মোহগ্রস্ত করে তোলে। এই সময় ছাত্র রাজনীতি তার চিরায়ত গণমুখী ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতামুখী দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ়তরভাবে ধারণ করতে শেখে। ছাত্র রাজনীতি এখন তাই আধিপত্য আর সম্পর্কযোজন প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। রাষ্ট্রপতিও বলেছেন, ছাত্র রাজনীতি ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থমুখী হয়ে পড়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আদর্শভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির ভিত্তিতে সামাজিক উন্নয়নের কথা তিনি বলেছেন। এটা তো সত্য, ছাত্রদের নেতিবাচক কর্মকা- দেশের বিশাল অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে। এমনিতেই বাংলাদেশে বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ কথা অবিসংবাদিত সত্য যে, জাতির সঙ্কট ও বিপন্নতায় ছাত্রসমাজ সর্বদাই ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তবে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আজ যা ঘটছে তা কোনভাবেই ছাত্র রাজনীতি নয়। তাই তাদের ঐতিহ্যময় ধারাবাহিকতা রাখতে প্রয়োজন এর মৌলিক সংস্কার। ছাত্র রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকা সঙ্গত। গুটিকয়েক ছাত্রনেতা নামধারী সন্ত্রাসী ও তাদের অনুগামী দলের কাছে হাজার হাজার মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর বন্দী হয়ে থাকার রাজনীতি অবশ্যই সমর্থনযোগ্য নয়। ছাত্র রাজনীতি হতে হবে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীর অধিকার আদায়ের রাজনীতি। চটজলদি ছাত্র রাজনীতির সম্পূর্ণ শুদ্ধিকরণ হয়ত অসম্ভব। কিন্তু এ ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ে করণীয় অনেক কিছুই আছে। আমরা চাই ছাত্র রাজনীতি নিয়ে চলমান দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। সার্বিক কল্যাণে পরিচালিত হোক ছাত্র রাজনীতি।