২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সৌদির তেল বাণিজ্যে ধস

  • অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখে দেশটি

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ চলতি ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ ঋণপত্র বিক্রি থেকে ২৭ বিলিয়ন ডলারেরও (২ লাখ ১০ হাজার ২২৪ কোটি টাকা) বেশি আয় করতে চায় সৌদি আরব। সমালোচকরা বলছেন, এমন পরিকল্পনা দেশটির অর্থনৈতিক দৈন্যদশার চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে। সৌদি সরকারের উচ্চাভিলাষকেই অর্থনীতির এমন ধসের কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

মধ্যপ্রাচ্য সব সময়ই বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। আর এই অঞ্চলে বর্তমানে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে রয়েছে সৌদি আরব, ইরান ও ইসরায়েল। তবে এতদিন এ প্রতিযোগিতায় বেশ পিছিয়ে ছিল ইরান। কিন্তু পরমাণু চুক্তির ফলে দেশটির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরই মধ্যে তেহরান তার বাৎসরিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দ্বিগুণে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে একদিকে তেলের বাজারে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর আর্বিভাব, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মার্কিন শেল তেলের বাজার সৌদি আরবকে চিন্তিত করে তুলেছে।

এদিকে, সৌদি আরবের অর্থনীতির ৯০ শতাংশের যোগান আসে তেল রফতানির মাধ্যমে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের ভয়ে ও মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্বে শীর্ষে থাকার তাগিদে দেশটি ক্রমাগত সামরিক অস্ত্রের আমদানি করে চলেছে। সেই সঙ্গে বাড়াচ্ছে সামরিক জনবল। ক্ষমতা প্রদর্শনে ইয়েমেনে পরিচালনা করছে অভিযান। তার ওপর নতুন শক্তিরূপে দেখা দেয়া জঙ্গীগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) মোকাবেলায়ও দেশটিকে জাতীয় নিরাপত্তায় ব্যয় বাড়াতে হয়েছে।

সৌদি আরবের অভ্যন্তরের চিত্র আরও ভয়াবহ। দেশের ভেতরে বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা বেকার সমস্যা। এক হিসেবে জানা যায়, দেশটিতে ১৬ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৯ শতাংশ। তাই বলে সেখানে কর্মসংস্থানের অভাব নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) ‘ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক’-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে ৬০ লাখেরও বেশি বিদেশী শ্রমিক বর্তমানে কর্মরত। বিশ্লেষকরা শিক্ষায় অনগ্রসরতা ও পর্যাপ্ত প্রযুক্তিজ্ঞানের অভাবকে দেশটির তরুণ জনগোষ্ঠীর এই পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কায় এই অদক্ষ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে রিয়াদ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সমস্যার মূলে নজর না দিয়ে হঠাৎ এমন উদ্যোগ খুব একটা ভাল ফল বয়ে আনবে না দেশটির জন্য।

এদিকে, সৌদি আরবে কোন আয়কর ব্যবস্থা না থাকায় ও পেট্রোলের দাম অত্যন্ত কম হওয়ায় অভ্যন্তরীণ আয়ও খুব একটা বেশি নয়। তার ওপর এই বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাবে অনেক। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) হিসেবে দেশটি চলতি বছর ২০ শতাংশ বাজেট ঘাটতির মুখে পড়বে।

মার্কিন সস্তা শেল তেল সৌদি আরবের তেল বাণিজ্যকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে দেশটিকে অপরিশোধিত তেলের দাম অবশ্যই কম রাখতে হবে বলে বিশ্লেষকদের মত। কিন্তু বর্তমানে সৌদি আরবের অর্থনীতি এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৬ ডলার (৮,২৫০ টাকা প্রায়) করে হলে তার জিডিপিতে কোন ঘাটতি থাকবে না। কিন্তু বর্তমানে ব্যারেল প্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ৫০ ডলারের (৩,৮০০ টাকা) কিছু কম বা বেশি করে থাকছে। সমালোচকরা বলছেন, বিপদ থেকে বাঁচতেই সৌদি আরব ঋণপত্রের দিকে নজর দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বছরের অবশিষ্ট সময়ে প্রতি মাসে পাঁচ, সাত ও দশ বছর মেয়াদী ৫.৩ বিলিয়ন ডলার (৪১ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা) করে ঋণপত্র ছাড়ার পরিকল্পনা করছে রিয়াদ।

প্রসঙ্গত, ঋণপত্র হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ে জন্য এক ধরনের বিনিয়োগ ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ঋণদাতাকে কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর করা দলিল হস্তান্তর করা হয়। বিভিন্ন খাতে খরচের অর্থ যোগানে কোন দেশের সরকার বা কোন এলাকার স্থানীয় প্রশাসন এ ঋণপত্র ছেড়ে থাকে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও এটি ছাড়া হয়ে থাকে। বিভিন্ন মেয়াদের হতে পারে এ ঋণপত্র। এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় পর মুনাফাসহ ঋণদাতাকে তার অর্থ ফেরত দেয় কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন ধরেই অপরিশোধিত তেলের বাজারে সৌদি আরবের একচেটিয়া আধিপত্য। রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশ সৌদির সঙ্গে পেরে ওঠেনি এতদিন। তবে বিশ্লেষকরা এবার এ রাজত্বের পতন দেখতে পাচ্ছেন। দেশটির বর্তমান নীতিই এ পতনের মূল কারণ বলে মনে করছেন তারা। এর ফলাফল, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে সৌদি আরব। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৪৪ ডলার (সাড়ে ৩ হাজার টাকা) থেকে ৪৮ ডলারের (৩ হাজার ৮শ’ টাকা) মধ্যে ওঠানামা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের দামে এই মন্দাবস্থার পেছনে সৌদি আরবের রয়েছে প্রধান ভূমিকা। ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, দিনে ১ কোটির বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে সৌদি আরব। প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলতে গত বছর থেকেই তেল উৎপাদন বাড়িয়ে সরবরাহে তারল্য ধরে রেখেছে দেশটি। তবে এ নীতি কোন কাজেই আসেনি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

হাতছাড়া হচ্ছে অপরিশোধিত তেলের বাজার ॥ এশিয়া সব সময়ই সৌদি তেল বাণিজ্যের সবচেয়ে লাভজনক বাজার। তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ বাজার হাতছাড়া হতে আর বেশি দেরি নেই। এরই মধ্যে নাইজেরিয়া, ইরাক, মেক্সিকো ও ভেনিজুয়েলা থেকে তেল আমদানি শুরু করেছে ভারত। অথচ দেশটি এর আগে সৌদি তেলের অন্যতম ক্রেতা ছিল। সৌদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যতটা ভাবা হয়েছিল, ওপেকের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন দেশগুলো তেলের দাম নিম্ন রাখতে ততটা আগ্রহী নয়। অন্তত স্বল্প-মেয়াদে তো নয়ই। নতুন কূপ খননের চেয়ে তেলের সরবরাহ কমিয়ে আনাই বেশি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে।

তেল উৎপাদন ও রফতানিকারক দেশগুলোর জোট ‘ওপেক’ নামে পরিচিত। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১২। এগুলো হলো- ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নাইজেরিয়া, ভেনিজুয়েলা, আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গেলা ও ইকুয়েডর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ প্রতিবেদনেই বোঝা যায়, বাজার থেকে প্রতিযোগীদের, বিশেষ করে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে হটিয়ে দিতে সৌদি আরবের অস্বাভাবিক উচ্চহারে তেল উৎপাদন নীতি কোন কাজেই আসেনি। উল্টো মার্কিন শেল তেলের প্রতিবন্ধকতাগুলো কেটে যেতে শুরু করেছে। মাঝে কিছু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হওয়ার মুখে পড়লেও তা কোন প্রভাবই ফেলতে পারেনি। উল্টো বড় প্রতিযোগীরা ছোট প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিনে নিয়েছে।

পরিশোধিত তেলেও পড়েছে প্রভাব ॥ পরিশোধিত তেলের বাজারের দিকে নজর দিলেও সৌদি আরবের পতন নজরে পড়ে। বাজার ধরে রাখতে এখানেও রাজকীয় সরকার রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেছে। এশীয় তেল পরিশোধন শিল্পের সঙ্গে চলছে এ লড়াই। দেশটি এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে প্রায় ২৮ লাখ ব্যারেল নিম্ন-সালফার সমৃদ্ধ ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলে তেলের দাম চরম মন্দায় পড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এশিয়ায় পরিশোধিত তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় পরিশোধক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলে অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমে যেতে শুরু করেছে। পড়ন্ত এই বাজার ধরে রাখতে সৌদি আরব বাধ্য হচ্ছে মধ্যম ও ভারি অপরিশোধিত তেলের দাম কমাতে।

রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ॥ ইয়েমেনে অভিযান পরিচালনা, মধ্যপ্রাচ্যে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, আইএস আতঙ্কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ বিভিন্ন খাতে সৌদি সরকারের ব্যয় তুলনামূলক হারে বেড়ে গেছে। কিন্তু সে তুলনায় আয় বাড়েনি। উল্টো বাজার ধরে রাখতে তেলের দাম কমানোয় আয় গেছে কমে। ফলে দেশটি এ ঘাটতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে পূরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সৌদি অর্থবাজেট ১৪০ বিলিয়ন ডলারের (১০ লাখ ৮৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা) ঘাটতি দেখতে চলেছে।

জাতীয় অর্থনীতির এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সৌদি আরব এখন ঋণপত্র বিক্রির পাশাপাশি তেলের দাম খানিকটা বাড়ানোর চিন্তা করছে। সর্বশেষ খবর, দেশটির রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ‘সৌদি আরামকো’ অপরিশোধিত তেলের দাম চলতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে ব্যারেল প্রতি ১ ডলার করে বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের দাম বাড়ালে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন বাড়াবে। ফলে দেশটির অপরিশোধত তেল উৎপাদন আরও উৎসাহিত হবে। সেই সঙ্গে সৌদি তেলের ক্রেতাও দ্রুত কমতে শুরু করবে। ফলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ধস ত্বরান্বিত হবে।

নির্বাচিত সংবাদ