২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অনিয়মই যেখানে নিয়ম-

  • রূপগঞ্জে দুই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

নিজস্ব সংবাদদাতা, রূপগঞ্জ, ১২ আগস্ট ॥ রূপগঞ্জ উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস দু’টি। অনিয়মই যেখানে নিয়ম। ঘুষবাণিজ্য এখানে ওপেন সিক্রেট। পূর্ব ও পশ্চিম দুই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেই ঘুষ ছাড়া কোন কাজ হয় না। দলিল রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে সব জায়গায় দিতে হয় মাত্রাতিরিক্ত ঘুষ। দুই সাব-রেজিস্ট্রারের মাসিক আয় প্রায় কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। দুর্নীতির অভিযোগে গত ৪ মাস আগে পশ্চিম সাব-রেজিস্ট্রার সাবিকুন্নাহার বেগম বরখাস্ত হলেও অজ্ঞাত কারণে এখনও বহাল আছেন রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেই। এছাড়া উভয় সাব-রেজিস্ট্রার ৫ কর্ম দিবসের মধ্যে অধিকাংশ সময়ই অজ্ঞাত কারণে থাকেন অনুপস্থিত। এজলাসে না বসে উভয়ই ঘুষ লেনদেনের সুবিধা নেয়ার জন্য প্রায়ই খাসকামরায় বসে চালান দলিল রেজিস্ট্রির কার্যক্রম। কোন কোন সময় দাতার অনুপস্থিতিতে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অনায়াসেই দলিল সম্পাদন করছেন। বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানির পক্ষ হয়ে জাল দলিল সম্পাদনা এখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে। উভয় সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসে সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে উভয় সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসে দুই শতাধিক দলিল সম্পাদন হচ্ছে। এসব দলিল রেজিস্ট্রি করতে সরকারী ফির বাইরে প্রকাশ্যেই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কেরানি, পিয়ন ও দুর্নীতিবাজ একাধিক দলিল লেখক, দাতা ও গ্রহীতাসহ অন্য দলিল লেখকদের কাছ থেকে সরকারী ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন প্রকাশ্যে। সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ও দলিল লেখকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, কমিশনে দলিল করতে সরকার নির্ধারিত ফি ৭৫০ টাকা অথচ উভয় সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসেই রূপগঞ্জের সীমানার ভেতরে প্রতিটি দলিল থেকেই নেন ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। আর উপজেলার বাইরে দিতে হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। পূর্বাচল উপশহরের প্লট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা। প্লট রেজিস্ট্রি কমিশন দলিল করতে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ প্রদান করতে হয়। সাবকবলা দলিল করতে শতকরা ১২ টাকা ব্যাংক জমা দেয়ার সরকারী নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এ বিধান মানছে না উপজেলার উভয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। সরকারী ফি ব্যাংকে জমা দেয়ার পর প্রতি দলিলে সাব-রেজিস্ট্রারকে প্রতি লাখে দিতে হয় ৩শ’ টাকা আর দলিল লেখক সমিতির নামে প্রতি দলিল থেকে দিতে হয় ৮শ’ টাকা। এভাবে প্রতি দলিলে ঘুষ দিতে হয় ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। হেবা ঘোষণাপত্র দলিল ফিসবিহীন করার বিধান থাকলেও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসকে দিতে হয় ১৬শ’ টাকা। অপরদিকে দলিল করার পর নকল তুলতে গিয়েও দিতে হয় অতিরিক্ত টাকা। একটি নকল উত্তোলন করতে ৫০ টাকার স্ট্যাম্পসহ নকলনবিশকে ১০০ টাকা দেয়ার বিধান থাকলেও সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসের কর্মকর্তার বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে প্রতি দলিল থেকে নিচ্ছেন ৯শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা পর্যন্ত। পাওয়ার দলিলে কোন ফিস দেয়ার বিধান না থাকলেও দলিল করতে গিয়ে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ছেন লোকজন। প্রতিটি পাওয়ার দলিল থেকে উভয় সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সাব-রেজিস্ট্রারের নাম করে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন। বণ্টননামা দলিলে সরকার নির্ধারিত ফি ২৫০ টাকা অথচ সাব-রেজিস্ট্রারের অফিস নিচ্ছেন ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। পশ্চিম সাব-রেজিস্ট্রার সাবিকুন্নাহার বেগম ও পূর্ব সাব-রেজিস্ট্রার জহিরুল ইসলাম ঘুষ ছাড়া কোন কাজই করেন না। তাদের কাছে টাকার বিনিময়ে অনিয়মই হয়ে যায় নিয়ম। এখানে দু’টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসেই প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন হয়। ফলে জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা জিম্মি হয়ে পড়েছে দুই সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে।

এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ পশ্চিম সাব-রেজিস্ট্রার সাবিকুন্নাহার বেগম জানান, বিভিন্ন লোকজনের অভিযোগের পর ওইসব অভিযোগের তদন্ত হয়েছে। সাময়িকভাবে বরখাস্তের কথা স্বীকার করলেও তিনি বলেন অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পুনরায় তাকে যোগদান করার নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি আরও জানান, অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়টি সঠিক নয়। সরকারী নিয়মনীতি মেনেই জমি রেজিস্ট্রেশন করা হয়। অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ঘটনা সত্য নয়।

একই বিষয়ে পূর্বের সাব-রেজিস্ট্রার জহিরুল ইসলাম বলেন, সরকার নির্ধারিত ফি আদায় হচ্ছে জমি রেজিস্ট্রির সময়। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ব্যাপারে তিনি বলেন ঘটনাগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। যারা বলছেন তারা স্বার্থ হাসিল না হওয়ার কারণেই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করছেন। এ সময় ঘটনাস্থলে একাধিক ব্যক্তি অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কথা প্রকাশ্যেই বলেন। তখনও সাব-রেজিস্ট্রার পূর্ব এ কথা অস্বীকার করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখকরা জানান, প্রতিদিনই অফিস চলাকালে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে কোন দলিলই রেজিস্ট্রি হয় না। দলিল লেখকরা জানান, যতক্ষণ দলিল থাকবে ততক্ষণ সাব-রেজিস্ট্রার দলিল সম্পাদন করবেন এমন নিয়ম থাকলেও বিকেল ৩টা বাজলেই বিলম্ব ফি আদায় এখানে নিয়ম অথচ উভয় সাব-রেজিস্ট্রার এসব ঘটনা অস্বীকার করেছেন। এদিকে সাব-রেজিস্ট্রারের নিয়োগকৃত পিয়ন, দালাল ও কতিপয় দলিল লেখক সিন্ডিকেট করে হয়রানি করছে জমি ক্রয় ও বিক্রয় করতে আসা জনগণকে। বিভিন্ন সময় তদন্তে প্রমাণ পেলেও অজ্ঞাত কারণে ওই সব কুচক্রীর বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে না।

নির্বাচিত সংবাদ