১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই ঘন্টায়    
ADS

চলচ্চিত্র এবং তথ্যচিত্রে বঙ্গবন্ধু

১৯৭১ এর আগে-পরে ছিল না এত টিভি চ্যানেল কিংবা উন্নত প্রযুক্তি। মোটের ওপর আশা ভরসা ছিল বিটিভি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা ভিডিওর মাধ্যমে যতটুকু দেখতে পাই তার সবটাই মূলত সাক্ষাতকারভিত্তিক কিংবা তার প্রাত্যহিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। তবে অল্প কিছু কাজ হয়েছে তাঁকে নিয়ে যেগুলোতে তাঁর আদর্শ, অর্জন, স্বপ্ন ইত্যাদি ফুটে উঠেছে বেশ স্পষ্টভাবে। তেমনি কিছু কাজ তুলে ধরা হলো আমাদের আজকের আয়োজনে

রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল : বঙ্গবন্ধুর ওপর অসাধারণ একটি কাজ প্রামাণ্যচিত্র ‘রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কারণে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি আলোচিত নাম। আর এ সাফল্যের শিরোমণি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের সর্বত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। বিখ্যাত জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা সে সুযোগ ছাড়বেন কেন? সময়কাল ১৯৭৩। চলে এলেন বাংলাদেশে। শুরু“করলেন ডকুমেন্টারি নির্মাণের কাজ। অসাধারণ এ কর্মে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর প্রাত্যহিক কর্মকা-, ভবিষ্যত পরিকল্পনাসহ বিবিধ বিষয়। প্রামাণ্যচিত্রটি মূলত ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রিক, যে সময় আমাদের মহান বিজয় দিবসের প্রথম বর্ষপূর্তি পালিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই দিনটি অন্য একটি কারণে মহিমান্বিত। আর তা হলো এদিন বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর করা হয়। শুরুর দিকে সেই নতুন সংবিধানের আলোকে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের দুর্লভ মুহূর্ত ধারণ করা হয়েছে। এই ডকুমেন্টারিতে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের উপস্থিতি। প্রায় সকল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেই তার উপস্থিতির কারণে সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘আমার ছোট ছেলে জন্মানোর পর থেকেই আমি বেশিরভাগ সময় জেলে কাটিয়েছি। সে আমাকে তেমন একটা কাছে পায়নি। ফলে সে সবসময় আমাকে হারানোর ভয়ে থাকে, তাই আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকার চেষ্টা করে।’ অবশ্য ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের কালো রাত থেকে রাসেলের আর বাবাকে হারানোর ভয় নেই। সে বাবার সঙ্গেই আছে সেই সময় থেকে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সপরিবার নাস্তা শেষ করে অফিসের উদ্দেশে যাত্রা, সংবিধান কার্যকর উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মানে পার্টিতে যোগদান এবং বিকেলে ঐতিহাসিক সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার ফুটেজ সংযোজিত হয়েছে এ প্রামাণ্যচিত্রে। সেইসঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় যেমন ১৯৭১ এ টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর গ্রামের বাড়ি পাকিস্তানী আর্মি কর্তৃক পুড়িয়ে দেয়ার প্রসঙ্গ, নতুন প্রণীত সংবিধানের বৈশিষ্ট্য, ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির জনক’ উপাধি, বাঙালী জাতির গর্বের বিষয় এসব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এ মহান ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধুর বাবার স্বপ্ন ছিল তিনি গ্রামেই থাকবেন তার ছেলে ও নাতি-নাতনী নিয়ে, ঢাকায় আসবেন না। একদম শেষ অংশে ধারাভাষ্যকার সংশয় প্রকাশ করেন, তার বাবার এ স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না। কারণ এই ব্যক্তি তাঁর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন এই দেশের জন্য।

বাংলাদেশ! : ১৯৭২ সালে আরেকটি আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র ‘বাংলাদেশ!’ যেটি প্রযোজনা করেছিলেন এবিসি টিভি। এটি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারিত হয়। এখানে বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ায় দৃঢ় প্রত্যয় ও সংকল্পের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে ঘোষণা দেন তার প্রথম লক্ষ্য এ দেশের মানুষের অন্ন সংস্থান করা, তাদের ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্স্থাপন, এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যুদ্ধকালীন বিজয় লাভের সন্ধিক্ষণে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটো প্রদানকে তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। একইসঙ্গে তিনি অন্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপনের মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, তাঁর লক্ষ্য জোটনিরপেক্ষ, স্বাধীন, পররাষ্ট্রনীতি। মার্কিন সাংবাদিক হাওয়ার্ড টাকনার এবং পিটার জেনিংসের সঙ্গে সাক্ষাতকারে উঠে আসে তার এসব পরিকল্পনার কথা। এ প্রামাণ্যচিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা।

ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ : কিংবদন্তি ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট যুদ্ধের ঠিক পর পর ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন, যা ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এ সাক্ষাতকারে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের মুহূর্ত, পাকিস্তানের কারাগারে বন্দীদশা, বিচার প্রক্রিয়া, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণসহ যাবতীয় বর্বরতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল বেশ ভালভাবেই। একইসঙ্গে তার রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য কারাগারবাস, রাজনৈতিক আদর্শ, বিশ্বনেতাদের প্রসঙ্গ যাদের তিনি অনুপ্রেরণার উৎস মানেন, সেসব বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। এই সাক্ষাতকারেই প্রথম বঙ্গবন্ধু জানান যে, বাংলাদেশে গণহত্যার শিকার মানুষের সংখ্যা ৩০ লাখ। তিনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াতে আহ্বান জানান এই আলাপচারিতায়।

দ্য স্পিচ : বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং এর বিশ্লেষণ নিয়ে আরেকটি তথ্যবহুল প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য ¯িপচ’। পরিচালনায় ছিলেন ফখরুল আরেফিন। এ ভাষণ বাঙালী জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যময় কারণ এর মাধ্যমেই স্বাধীনতাযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই সময়ে সামরিক শাসন জারি ছিল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি জাতির উদ্দেশ্যে এমন বিস্তৃত খোলামেলা ভাষণ দেয়া দুরূহ ব্যাপার। আরও দুঃসাধ্য সেটি ভিডিও করা এবং যুদ্ধদিনে সংরক্ষণ। ‘দ্য ¯িপচ’ প্রামাণ্যচিত্রে সেই ইতিহাসটাই তুলে ধরা হয়েছে। সাক্ষাতকারভিত্তিক এ প্রামাণ্যচিত্রে আমরা জানতে পারি কিভাবে শুরু“হলো ভাষণ ভিডিও করার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং কঠোর গোপনীয়তায় সংরক্ষণ, যা পরবর্তীতে আমাদের ইতিহাসভিত্তিক উপাদানে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ যোগ করেছে। আর এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে ক্যামেরার সামনে হাজির করা হয়েছে তাদের ঐ সময়কার কর্মকা- স¤পর্কে জানতে। যেমন মূল পরিকল্পনাকারী তৎকালীন এমএনএ (মেম্বার অফ ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলি) আবুল খায়ের, ডিএফপি (ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্ম) এর ক্যামেরাম্যান এম এ মোবিন প্রমুখ। এ ছাড়াও তার বক্তব্যের খ--খ- অংশ ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করেছেন ম. হামিদ, নূর এ আলম সিদ্দিকী, আসম আবদুর রব, তৎকালীন আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি কমিটির হুইপ ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম, মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউলাহ; বীর উত্তম, মেজর জেনারেল (অব.) আমিন আহমেদ চৌধুরী; বীরবিক্রমসহ আরও অনেকেই। সেইসঙ্গে দেখানো হচ্ছিল সেই সময়কার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের দুর্লভ সব ফুটেজ ও পত্রিকার কাটিং। সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবনের একটি একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তথা ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে নির্মিত এক তথ্যচিত্রটি আমাদের ঐতিহাসিক উপাদানের এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

পলাশী থেকে ধানম-ি : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যাকা-ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘পলাশী থেকে ধানম-ি’ চলচ্চিত্রটি। আর এটির পরিচালনায় ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় সব চরিত্রকেই তিনি হাজির করেছেন এই চলচ্চিত্রে। ছবিটি স্টুডিওভিত্তিক লোকেশনে নির্মিত হলেও এতে ইতিহাসের মূল্যায়নে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পুরো ঘটনার একটা রূপরেখা পাওয়া যায় যা, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। উল্লেখ্য, এতে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেন পীযুষ বন্দোপাধ্যায়।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ : মুক্তধারা নিউইয়র্ক নিবেদিত বিশ্বজিত সাহার পরিকল্পনায় শ্যামল দত্তের সংকলনে আরেকটি তথ্যচিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়, যেটির শিরোনাম ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’। এ তথ্যচিত্রে তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, রাজনীতিতে প্রবেশ, ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন, ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের সূচনা, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এবং করাচীর মিওয়ালি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও দিল্লী হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন সব কিছুই সংযোজিত হয়েছে। এ তথ্যচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো পাকিস্তানী বাহিনীর বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়েই বঙ্গবন্ধুর পরিবার বিশেষ করে তার সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ভ্রমণ এবং যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে যেয়ে দাঁড়ানোর দুর্লভ ফুটেজ।

মুক্তির গান : প্রখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্রকার লিয়ার লেভিনের ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ থেকে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ শুরু“হয় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দিয়ে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাে র পর থেকে দীর্ঘদিন বাংলাদেশে সামরিক শাসন বহাল থাকে। শুধু তাই নয় এ সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় ছিল, ফলে বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার একটা প্রচেষ্টা সেই সময়ের শাসকদের মাঝে ছিল। অপরদিকে সামরিক অত্যাচার ও নির্যাতনের ভয়ে চলচ্চিত্র তথা গণমাধ্যমেও বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপনের প্রয়াস হারাতে থাকে ক্রমেই। এমনকি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তার দেয়া সাক্ষাতকারগুলোও অগোচরে থেকে যায় দেশবাসীর। আর প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা তো ছিলই। সব মিলিয়ে দীর্ঘ দু’দশক তিনি ছিলেন অন্তরালে। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুর্ভাগা দেশ’ কবিতার ক’টি লাইন তার ক্ষেত্রে বেশ মানিয়ে যায়। ‘অজ্ঞানের অন্ধকারে/আড়ালে ঢাকিছ যারে/তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান’। বাংলাদেশের ইতিহাসের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকুক বঙ্গবন্ধুর নাম আর সে আলোয় আলোকিত হোক আমাদের পথ চলা এটাই আমাদের কামনা।