২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অন্য আলোয় ফারজানা করিম

২০০৩ থেকে সংবাদ পড়া শুরু। শুরু থেকেই চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে রয়েছেন এবং এখনও রয়েছেন। নিয়মিত লেখালেখির অভ্যাস অনেক আগে থেকেই। তবে নিজের লেখালেখি নিয়ে বই বের করার চিন্তাটা খুবই হুট করেই। রয়েছে ব্লগ ‘ফারজানা করিম’স যেখানে ইচ্ছে হলেই ঢুঁ মেরে আসতে পারেন আর দেখে নিতে পারেন তাঁর চমৎকার লেখার ফুলঝুরি। তার অসামান্য লেখাগুলো বইবন্দী করার ইচ্ছে প্রকাশ করে জাতীয় পাবলিশার্স। তারই ফলশ্রতিতে গত বইমেলায় প্রকাশ পায় তাঁর বই’পাখি পৃথিবী’।

ফারজানা করিমের জন্ম চট্টগ্রামে। শৈশব কৈশোওে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বীর চট্টলার পাহাড় ও সাগরের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন। সেই প্রকৃতির রূপ তাঁর লেখায় প্রভাব ফেলেছে অকারণেই। ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেছেন। গণমাধ্যমের প্রতি অকুণ্ঠ ভালবাসার কারণে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ফিল্ম এ্যান্ড মিডিয়া বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতার্কিক হিসেবেও পেয়েছেন নানা সম্মান। ১৯৯২ সাল থেকে শুরু“করেন মঞ্চে অভিনয়। যুক্ত ছিলেন প্রতিনিধি নাট্য সম্প্রদায়ে। ফারজানা করিমের অবশ্য শুরুটা গান দিয়ে। সঙ্গীতে রয়েছে তার বিচরণ। বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাদী মোহাম্মদের কাছে শিখেছেন রবীন্দ্রনাথের গান। গানের জগতেও একটি এ্যালবাম রয়েছে। বাসুদেব ঘোষের সুরে ‘দূর্বা’ নামের প্রথম এ্যালবাম। ‘পাখিপৃথিবী’ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। কাব্যচর্চা শুরু“যৌবনে। লিখেছেন শতাধিক কবিতা।

একজন আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে স্বরচিত কবিতাগুচ্ছ নিয়ে গত সেপ্টেম্বরে কবিতাপ্রেমীদের উপহার দেন ‘পুতল’ নামক তাঁর ২য় এ্যালবাম। তাঁর এই এ্যালবামটি সকলের নিকট প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়। তবে কলকাতায় মিউজিক কম্পোজিশন করা ফারজানা করিমের তৃতীয় এ্যালবাম ’শুধু তোমার জন্য’ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের রোমান্টিক কবিতা সংবলিত এ্যালবাম, যা শ্রোতাসাধারণকে কবিতার জাদুতে বুঁদ করে রাখবে। স্বরচিত কবিতায় কবির কণ্ঠে আবৃত্তি যেন এক অদ্ভুত দ্যোতনা সৃষ্টি করবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়। সংবাদ পাঠ, আবৃত্তি আর লেখালেখি প্রসঙ্গে ফারজানা করিম নিজেকে সংজ্ঞায়িত করেন ভিন্নভাবে। ‘সংবাদ পাঠ আমার প্রফেশন; এটা একটা এক্সট্রা প্রেশারও বলা চলে। মাসে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ দিন সংবাদ পাঠ করতে হয়। কিন্তু লেখালেখি হলো আমার প্যাশন; তীব্র একটা শখ। এজন্য নিজস্ব পরিবেশের প্রয়োজন হয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, মাঝে মাঝে সংবাদ পাঠের বিরতিতে বা অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ফাঁকে আমার লেখালেখির অভ্যাস রয়েছে। কারণ ঐ মুহূর্তে অনেক বিষয় মাথার মধ্যে সবসময় ঘুরপাক খায়। এগুলোই হচ্ছে নিজস্ব ভাললাগার কাজ।’

ফারজানা করিম বিশ্বাস করেন, তাঁর সকল সৃষ্টি ও কর্মের মধ্যে রয়েছে তাঁর মায়ের অবদান। মেয়ের কণ্ঠে সংবাদ পাঠ ছিল মায়ের খুবই প্রিয়। মেয়ে যেন ভালবাসা আর গর্বের সঙ্গে এই প্রফেশনে যুক্ত থাকতে পারে তাই ছিল মায়ের একমাত্র আশা।

ফারজানা করিমের ‘শুধু তোমার জন্য’ রোমান্টিক ঘরনার এ্যালবামে রয়েছে ১২টি কবিতা। প্রেম ও সম্পর্কই তাঁর ‘শুধু তোমার জন্য’ এ্যালবামের বিষয়বস্তু। যার মধ্যে ‘অদ্ভুত অসুখ’ নামের কবিতাটি তাঁর নিকট খুবই প্রিয়। তবে সামনে আরও চমক অপেক্ষা করছে বলে ফারজানা করিম জানিয়েছেন। অচিরেই ‘নীরব শব্দ’ নামে তাঁর প্রেমের কবিতার এ্যালবাম বাজারে আসবে। কলকাতার ছেলে অর্ক আর বাংলাদেশি মেয়ে মেঘের মধ্যে নিরব প্রেমের উপ্যাখ্যান নিয়ে তৈরি এই এ্যালবামটি । যেখানে মেঘ তাঁর লেখা চিঠির উত্তর কখনই পায় না; কিন্তু অর্ক তাঁর লেখা চিঠিতে সকল উত্তর মেঘরুপি ফারজানাকে লিখে পাঠায়। তবে সেই চিঠির উত্তর শুধু হাওয়ায় ভেসে পাড়ি জমায় অজানা গন্তব্যে।

চট্টগ্রামের মেয়ে ফারজানা করিমের লেখালেখি ছোটবেলা থেকেই। চট্টগ্রামের সংবাদপত্রে নিয়মিত লেখা ছাপা হয়ত তার। নিজস্ব ব্লগ আর ফেসবুকে সময় পেলেই লেখালেখি করেন। তবে দিনে দিনে তাঁর লেখা কবিতার পাঠকের সংখ্যা এত বেড়ে গিয়েছিল যে, শেষমেশ তিনি বের করলেন তাঁর বই, এ্যালবাম।

একসময় ‘প্রমা’ আবৃত্তি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আর কাজ করেছেন বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মুস্তাফার সঙ্গেও। কবির কণ্ঠে কবিতা পাঠের অনুভূতি যে আলাদা বৈচিত্র্যতা সৃষ্টি করে তা ফারজানা করিম উপলব্ধি করেন সর্বদা। বহুগুণে গুণান্বিত ফারজানা করিম তাঁর নিজস্ব বলয়কে সাজিয়েছেন ভিন্ন ভাবনায় অনেক যতœ করে। তিনি যেমন সঙ্গীত, উপস্থাপনা বা সংবাদ পাঠকে করেছেন আপন সহচর তেমনি লেখালেখি ও কবিতা পাঠকে বেধেছেন একই কক্ষপথে। প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলছেন সমস্ত অঙ্গনে। তবে কবিতা, গান বা সংবাদ পাঠে কণ্ঠের উঠানামা যে একটা অন্যকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তা তিনি বিশ্বাস করেন মনেপ্রাণে।

কবিতা নিয়ে দেশের বাইরে অর্থাৎ কলকাতার মঞ্চে কাজ করেছেন অনেক আগেই। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে নিজের লেখা কবিতা মঞ্চে পরিবেশন করেছেন ফারজানা। তারপর তাঁর এ্যালবাম ‘নীরব শব্দ’ এর কবিতাগুচ্ছ নিয়ে পুনরায় কলকাতার মঞ্চে উঠেছেন, যা সেখানকার কবিতাবোদ্ধাদের আকুণ্ঠ ভালবাসা কুড়িয়েছে। মিডিয়ায় ১৪ বছর নিজস্ব ভাবনা আর আঙ্গিকে পথচলা ফারজানা করিমের। লেখার ধরন, উপস্থাপনার বৈচিত্র্যতা, আবৃত্তির ঢং কিংবা নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, সবই তাকে করে তুলেছে সকলের থেকে আলাদা। একদিকে সিরিয়াস সংবাদ উপস্থাপক, কবিতা কথায় বেধে রাখা বা আপন পরিমণ্ডলের মানুষগুলোর সঙ্গে অকল্পনীয় সখ্য-সকল ক্ষেত্রেই উজ্জ্বল ফারজানা করিম।

‘শুধু তোমার জন্য’ এ্যালবামটি উৎসর্গ করা হয়েছে তাদের জন্য যারা জীবনে একবার হলেও প্রেমে পরেছে, ভালবেসেছে। তবে তাঁর মতে ভালবাসা হবে সর্বজনীন। এই সার্বজনীন ভালবাসা ধরা পড়েছে তাঁর ‘শুধু তোমার জন্য’ এ্যালবামের মধ্য দিয়ে।

ফারজানা করিম মঞ্চে অভিনয়েও ছিলেন সচল। চট্টগ্রামে ‘প্রতিনিধি থিয়েটার’ এ ‘পাগলা ঘোড়া’, ’দুই বিঘা জমি’, ’রাক্ষস’ মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন। অভিনয়ে যুক্ত রয়েছেন বগুড়ার একটি থিয়েটারে।

তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড় ফারজানা করিম। তিন ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই ‘টুইন’। ২০১২ এ মাতৃবিয়োগ হয় হজ করতে গিয়ে কিন্তু বাবা এখনও ছায়ার মতো সর্বদা তাঁর পাশে রয়েছেন। ভালবাসার মানুষ আমির দাউদ এভ্রিডেনিনশনে রেজিন্যাল সেলস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন সিদ্ধেশ্বরী, আমিনাবাদে। সময় ও সুযোগ হলেই বাংলাদেশের কক্সবাজারে চলে যান সমুদ্র দেখতে কিংবা শ্রীমঙ্গলে যান চায়ের বাগানে সবুজের ঘ্রাণ নিতে। তবে অবসর পেলেই ঘুমিয়ে নিতে কখনই কার্পণ্য করেন না ফারজানা। ফারজানা করিম বহুমাত্রিক শিল্প মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা তার সৃজন কর্মে জয়ী হতে চান মানুষকে জয়ী করতে।